রেশমের মোট বার্ষিক উৎপাদন সম্বন্ধে সঠিক কোনও তথ্য পাওয়া দুষ্কর। ফরাসি পর্যটক টাভার্নিয়ে জানিয়েছেন যে ১৬৬০ ও ১৬৭০-এর দশকে বাংলার রেশম উৎপাদনের মোট পরিমাণ ছিল ২২,০০০ গাঁট, প্রত্যেক গাঁটরিতে ১০০ পাউন্ড করে রেশম। এ পরিসংখ্যান নিয়ে অবশ্য ইদানীং সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ টাভার্নিয়ে বলছেন, এ সময় ডাচরা বাংলা থেকে বছরে ৬০০০-৭০০০ গাঁটরি রেশম রফতানি করত। তা ঠিক নয়। আসলে তারা বছরে এর চেয়ে অনেক কম পরিমাণ রেশম রফতানি করেছে। ডাচ কোম্পানির রেকর্ডস থেকে এটা সুস্পষ্ট।৯ কিন্তু আমরা যদি বাংলা থেকে এশীয়/ভারতীয় বণিকদের রেশম রফতানির হিসেব দেখি, তা হলে টাভার্নিয়ের দেওয়া বাংলায় রেশম উৎপাদনের পরিমাণে কিছুটা অত্যুক্তি থাকলেও তা সম্পূর্ণ অবাস্তব নয়। ১৭৫১ সালে যখন মারাঠা আক্রমণে বাংলার রেশমশিল্পের উৎপাদন বেশ কিছুটা ব্যাহত হয়, তখনও এশীয়/ভারতীয় বণিকদের বাংলা থেকে রেশম রফতানির পরিমাণ ছিল ২৪,০০০ মণের মতো।১০ সুতরাং এটা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে মধ্য-অষ্টাদশ শতকেও বাংলায়, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে, বিপুল পরিমাণ রেশমের উৎপাদন হত।
রেশম শিল্পকে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে—কাঁচা রেশমের উৎপাদনের জন্য তুঁতের চাষ এবং তারপর রেশম তৈরির প্রণালী। তাই এ শিল্প আংশিক কৃষিভিত্তিক, আংশিকভাবে পারিবারিক কুটিরশিল্প। কৃষকরা অন্যান্য শস্যের সঙ্গে তুঁতের চাষও করত। এই তুঁতগাছের গাছের পাতা খাইয়ে চাষির বাড়িতে গুটিপোকার লালনপালন করা হত। সাধারণত চাষিবাড়ির পুরুষরা মাঠে তুঁতগাছের চাষ করত আর বাড়ির মেয়েরা রেশম গুটিপোকার লালনপালন করত। এ গুটিপোকার লালনপালনের জন্য আলাদা ও বিশেষ রকমের ঘর তৈরি করতে হত। এরকম ঘরের দৈর্ঘ্য হত ২৪ ফুট, প্রস্থ ১০ ফুট, উচ্চতা ৯ ফুট, এবং তাতে ৩ ফুট উঁচু একটি মাচা থাকত। মাটির মোটা দেয়াল করতে হত আর দেয়ালের ওপরের দিকে দুটো জানলা, খড়ের পুরু ছাদ। ওরকম ঘরে ২০০ কাহন বা মোট ২,৫৬,০০০ গুটিপোকা গোবর দিয়ে ভাল করে লেপা ডালাতে করে মাচার ওপরে রাখা যেত। পোকামাকড় যাতে ডালায় আসতে না পারে তার জন্য মাটির রেকাবিতে জল দিয়ে তাঁর ওপর বাঁশের খুঁটির ওপর মাচাটা রাখা হত। অন্যান্য জিনিসের মধ্যে দরকার হত সুতো কাটার জন্য মাদুর, ছুরি, তুঁতের পাতা নিয়ে আসার জন্য ঝুড়ি, গুটিপোকা রোদে দেওয়ার জন্য কয়েকটি চটের ব্যাগ আর মাটির রেকাবিগুলি মাঝেমাঝেই জলভরতি করে রাখার জন্য কয়েকটি কলসি। এই সবগুলি জিনিস করতে উনবিংশ শতকের প্রথমদিকে খরচ পড়ত ৫০ থেকে ৬০ টাকার মতো।১১ মধ্য অষ্টাদশ শতকে মনে হয় আরও কম খরচে সবটাই হয়ে যেত।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে রেশম উৎপাদন সম্বন্ধে বিস্তৃত তথ্য পাওয়া যায় ঊনবিংশ শতকের প্রথমদিকে, তাঁর আগে নয়। তবে অষ্টাদশ শতকের ক্ষেত্রেও এসব তথ্য প্রযোজ্য কারণ তাঁর মধ্যে উৎপাদন পদ্ধতিতে বিশেষ হেরফের হয়নি। উৎপাদনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে গুটিগুলিকে দিনে দু’বার তুতের পাতা খেতে দিতে হত এবং পরের দু’পর্যায়ে ৬ বা ৮ ঘণ্টা অন্তর এটা করতে হত। গুটিপোকা থেকে যখন রেশমের সুতো কাটার সময় হত তখন ‘they turn from a greenish-cream to a mellow light orange colour… with a transparent streak down the back, passing, as it is observed, the emission from tail to head, which forms the silk’.১২ তারপর গুটি পোকাগুলিকে মাদুরে রেখে রোদে ও হাওয়ায় দেওয়া হয় আর রাত্রে ঢাকা দিয়ে রাখা হত। গুটিপোকাগুলি প্রায় ৫৬ ঘণ্টা ধরে রেশমের সুতো বার করতে থাকত। চার পাঁচদিন পর পোকাগুলি তাঁর থেকে কাটিম দিয়ে সুতো বার করার জন্য উপযোগী হত। তখন গৃহস্থ চাষি সেগুলিকে পাইকার বা অন্যান্য ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিত কিংবা নিজের বাড়িতে পোকাগুলি সেদ্ধ করে রেশমের সুতো তৈরি করত।১৩
রেশমসুতোর কাটনিরা গুটিপোকা থেকে যে সুতো তৈরি করত তার নাম পাটানি (pattaney) বা পাটনি (putney)। এতে মিহি এবং মোটা দু’রকমের সুতোই মেশানো থাকত। সুতো কাটার ব্যাপারে মেয়েরাই অগ্রবর্তী ভূমিকা নিত এবং এ ব্যাপারে তাদের দক্ষতা ছিল অসাধারণ। ১৭৫০-র দশকে রবার্ট ওরম মন্তব্য করেছেন যে:১৪
The women wind off raw silk from the pod of the worm. A single pod of raw silk is divided into twenty different degrecs of fineness, and so exquisite is the feeling of these women, that whilst thread is running through their fingers so swiftly that their eyes can be of no assistance, they will break it off exactly as the assortments change, at once from the first to the twentieth, from nineteenth to the second.
১৮০৭ সাল নাগাদ বুকাননও (Buchanan) রেশমের সুতো কাটার ব্যাপারে মেয়েদের দক্ষতা ও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।১৫
রেশমের বাজার
অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে, বাংলার রেশমের বাজারে ক্রেতাদের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলত। এর কারণ, শুধু ভারতবর্ষ নয়, এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে ব্যবসায়ীরা রেশম কিনতে বাংলায়, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলে আসত। তা ছাড়াও ক্রেতাদের মধ্যে ছিল ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি। তবে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, ভারতীয়/এশীয় ব্যবসায়ীরাই বাংলার রেশমের বাজার নিয়ন্ত্রণ করত, ইউরোপীয়রা নয়। আবার দেশীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে গুজরাটিরাই ছিল সবচেয়ে বড় ক্রেতা। উৎকৃষ্ট মানের রেশম হলে দামের তোয়াক্কা না করেই তারা সেই রেশম কিনে নিত। বাংলার রেশমের বাজারে তাদের এমনই প্রভাব এবং প্রতিপত্তি ছিল যে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজারের সর্বোৎকৃষ্ট এবং সবচেয়ে দামি যে রেশম তাঁর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘গুজরাটি সিল্ক’।১৬ উত্তর ভারতের অর্থনীতির সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলের সিল্কের বাজার। এটা ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারী জন কেনের (John Kenn) লেখা থেকে স্পষ্ট। ১৬৬১ সালে তিনি জানাচ্ছেন:১৭
