কাঁচা রেশম(Raw Silk)
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে বিভিন্ন এশীয়/ভারতীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও ইউরোপীয় কোম্পানিরা বাংলা থেকে যে-সব পণ্য রফতানি করত, তার অন্যতম প্রধান ছিল কাঁচা রেশম। পণ্য রফতানির মোট যে মূল্য, সেদিক থেকে বস্ত্র রফতানির পরেই রেশমের স্থান। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা বহু দিন ধরেই বাংলা থেকে রেশম রফতানি করছিল, ইউরোপীয়রা এ ব্যবসা শুরু করে সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে। তার আগে ইংরেজ ও ডাচরা পারস্যদেশ ও চিন থেকে ইউরোপে রেশম রফতানি করত।১ কিন্তু যখন তারা দেখল যে বাংলা থেকে রেশম রফতানি করতে পারলে অনেক লাভজনক হবে, তখন তারা এদিকে নজর দিল। ইংরেজ কোম্পানি ১৬৫৮ সালে কাশিমবাজারে কুঠি স্থাপন করে বাংলা থেকে ইউরোপে রেশম রফতানি করার ওপর জোর দিল।২ ১৬৭০-র দশকের মাঝামাঝি থেকে ইংরেজদের রেশম বাণিজ্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে এবং মাঝেমধ্যে কিছুটা ওঠানামা করলেও এ বাণিজ্য ১৭৩০-এর দশক পর্যন্ত ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এই দশকেই সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছয়। তার পরের দুই দশকে— ১৭৪০ ও ১৭৫০— অবশ্য তাতে ভাঁটা পড়ে যায়। ডাচ কোম্পানিও সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে রেশম রফতানি শুরু করে। তবে ইংরেজদের সঙ্গে তফাত, ডাচরা বাংলার রেশম শুধু ইউরোপে নয়, জাপানেও তারা তা রফতানি করত। বস্তুতপক্ষে জাপানে রেশম রফতানি তাদের আন্তঃএশীয় বাণিজ্যের একটি প্রধান অঙ্গ ছিল। ১৬৭০-র দশক পর্যন্ত ডাচরা হল্যান্ডে বেশির ভাগ পারস্যদেশের রেশমই রফতানি করত, আর বাংলা ও চিনদেশের রেশম প্রধানত জাপানে। কিন্তু ওই শতকের শেষ দুই দশকে এই প্যাটার্ন সম্পূর্ণ পালটে যায়। একদিকে জাপানের বাণিজ্যে এ সময় ভাটা পড়ে এবং অন্যদিকে বাংলার রেশম চিন বা পারস্যদেশের রেশমের চাইতে একটু নিম্নমানের হলেও, অনেক সস্তা তাই তারা এখন শুধু বাংলার রেশম হল্যান্ডে রফতানি করতে শুরু করল।৩
ইউরোপের রেশমশিল্পে সাধারণত ইতালির রেশমই ব্যবহার করা হত। কিন্তু ওই রেশমের মূল্য ছিল অত্যধিক। কিন্তু যখন দেখা গেল যে বাংলার রেশম ইতালির রেশমের বদলে ইউরোপের রেশমশিল্পে সহজেই ব্যবহার করা যেতে পারে এবং তাতে খরচ অনেক কম পড়বে, তখন ইউরোপে বাংলার রেশমের চাহিদা বেশ বেড়ে গেল এবং কোম্পানিগুলিও বাংলা থেকে রেশম রফতানি করে প্রচুর মুনাফা করতে লাগল। দু’-একটি উদাহরণ থেকে এই লাভের পরিমাণ আন্দাজ করা যেতে পারে। ১৬৫৩-৫৪ সালে ডাচরা বাংলা থেকে রেশম রফতানি করে শতকরা প্রায় দু’শো শতাংশ লাভ করে। ইংরেজ কোম্পানির ক্ষেত্রেও লাভের পরিমাণ ছিল ওরকমই। ১৬৯৫-৯৬ সালে মার্থা নামের জাহাজ বাংলা থেকে যে রেশম ইংল্যান্ডে রফতানি করে, তাতে কোম্পানির মোট মুনাফা হয় শতকরা আড়াইশো ভাগ। তবে এই লাভের পরিমাণ সব সময় এক রকম হত না, কখনও বেশি, কখনও কম হত।৪ সে জন্য অন্যান্য দেশের রেশমের তুলনায় কিছুটা নিম্নমানের হলেও, বাংলার রেশমের ইউরোপে বেশ চাহিদা ছিল। এ প্রসঙ্গে ফরাসি পর্যটক বার্ণিয়ে’র মন্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে:৫
The (Bengal) silks are not certainly so fine as those of Persia, Syria, Sayd and Barut, but they are of a much lower price; and I know from indisputable authority that, if they were well selected and wrought with care, they might be manufactured into most beautiful stuffs.
এখানে বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, শুধু ইউরোপীয় কোম্পানিগুলি নয়, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ভারতবর্ষ ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সওদাগর ব্যবসায়ীরা বাংলার রেশমের উৎপাদন কেন্দ্র ও বাজারগুলিতে ভিড় জমাত। বস্তুত কোম্পানিগুলি ভারতবর্ষে আসার অনেক আগে থেকেই এসব ব্যবসায়ীরা বাংলা থেকে স্থলপথে ভারতবর্ষের ও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে রেশম রফতানি করত। এদের মধ্যে গুজরাটিরাই ছিল সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গোষ্ঠী। তা ছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে ছিল মধ্য এশিয়া, মুলতান, লাহোর, আগ্রা, বেনারস, হায়দরাবাদ, গোরখপুর প্রভৃতি অঞ্চলের সওদাগর গোষ্ঠী। এরা অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত বাংলা থেকে বিপুল পরিমাণ রেশম রফতানি করেছে, পলাশির আগে পর্যন্ত বাংলার রেশমের বাজারে এদেরই অনেক বেশি প্রাধান্য ছিল, ইউরোপীয়দের নয়। পলাশির পরে চিত্রটা সম্পূর্ণ পালটে যায়। ইংরেজ কোম্পানি ও তাদের কর্মচারীদের দৌরাত্ম্যে এশীয়/ভারতীয় বণিকরা বাংলার রেশমের বাজার থেকে প্রায় উৎখাত হয়ে যায়। তাদের রেশম রফতানির পরিমাণও প্রায় তলানিতে এসে ঠেকে।৬
রেশমের উৎপাদন ও রেশমশিল্পের সংগঠন
এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই যে বাংলায় রেশম উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চল। ১৬৭৬ সালে বাংলায় ইংরেজ কোম্পানির অধ্যক্ষ স্ট্রেনশ্যাম মাস্টার (Streynsham Master) লিখেছেন যে ওই অঞ্চলের প্রায় পুরোটাতেই তুঁত গাছের চাষ হত। এই তুঁতের পাতাই রেশম পোকার প্রধান খাদ্য।৭ তুঁত গাছের চাষই ছিল তখন মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত চিত্র। এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক জীবনে রেশমের উৎপাদন ও বাণিজ্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বোঝা যায় এখানকার একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদবাক্যে— ‘তুঁতের চাষ নিজের পুত্রসন্তানের চাইতেও অনেক বেশি সম্পদ ও সুখের আকর’।৮ বলা বাহুল্য, রেশম উৎপাদন, রেশমশিল্পের সংগঠন ও বাণিজ্য এ অঞ্চলের বহু মানুষেরই রুজি রোজগারের উপায় করে দিয়েছিল। এখানে অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন যে অন্য কিছু কিছু অঞ্চলেও, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের রংপুরে, নদীয়ার কুমারখালি ইত্যাদি জায়গায় রেশমের উৎপাদন হত। তবে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে মুর্শিদাবাদ-কাশিমবাজার অঞ্চলই ছিল রেশমের সর্বপ্রধান উৎপাদন কেন্দ্র। শুধু তাই নয়, গুণগত মানের দিক থেকেও ওই অঞ্চলের রেশমই ছিল সর্বোৎকৃষ্ট।
