এখানে অবশ্য বলা প্রয়োজন যে সিরাজদ্দৌল্লা সম্বন্ধে গোলাম হোসেনের যে বক্তব্য তা আমরা পুরোপুরি মেনে নিতে পারি না—এটা অনেকটাই উদ্দেশ্য প্রণোদিত, যা আমরা অন্যত্র বিশদ তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখাবার চেষ্টা করেছি।৩৮
আমিনা সম্বন্ধে অবশ্য বলা যায় যে তিনি নাকি উদার এবং কোমল বৃত্তিসম্পন্ন মহিলা ছিলেন। কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠি দখল করার পর সিরাজ যখন উইলিয়াম ওয়াটস ও তাঁর স্ত্রী পরিবারকে তাঁর সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে কলকাতা যেতে বাধ্য করেন এবং পরে মুর্শিদাবাদ নিয়ে যান, তখন নাকি আমিনা বেগমের অনুনয়ে সিরাজদ্দৌল্লা তাদের মুক্তি দেন। এটা বোধ হয় সঠিক নয়, কারণ সিরাজ ওয়াটসের পরিবারকে বন্দি করে মুর্শিদাবাদ নিয়ে যান এমন কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য কিন্তু পাওয়া যায় না। বরঞ্চ দেখা যায় যে, কাশিমবাজারের পতনের পর সিরাজ ইংরেজ কুঠির অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ ছাড়া কিছুতে হাত দেননি। ইংরেজ মহিলা, শিশুদের এমনকী ওয়াটস সমেত কোনও কর্মচারীকে বন্দিও করেননি। শুধু ওয়াটস ও বেটসনকে তাঁর সঙ্গে কলকাতা অভিমুখে যাত্রার সঙ্গী করে নেন, খুব সম্ভবত সিরাজের সঙ্গে আপস-মীমাংসা করে নেওয়ার জন্য কলকাতার গভর্নর ও ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য।৩৯
আমিনা বেগমের জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ মুহূর্ত দেখা দেয় পলাশির যুদ্ধের ক’দিন পরে। পলাশির যুদ্ধে পরাজিত নবাব সিরাজদ্দৌল্লাকে নতুন নবাব মীরজাফরের পুত্র মীরণের নির্দেশে হত্যা করা হয়। তারপর সিরাজের ছিন্নভিন্ন দেহ হাতির পিঠে চড়িয়ে মুর্শিদাবাদ শহরে ঘোরানো হয়। মৃতদেহ নিয়ে হাতিটি আমিনার প্রাসাদের কাছে এসে পৌঁছয়। আমিনা খবর পেয়ে তখন বেআব্রু অবস্থায় পাগলের মতো বেরিয়ে আসেন এবং প্রিয়পুত্রের মৃতদেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বিলাপ করতে থাকেন। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে মুর্শিদাবাদের মানুষ অশ্রু সংবরণ করতে পারেনি। এমন অবস্থা দেখে মীরজাফরের ভাগ্নে ও নানা বদ অভ্যেস ও বদকাজে তাঁর সহযোগী খাদিম হোসেন খান তাঁর ভৃত্যদের আমিনা বেগম ও অন্য মহিলাদের জোর করে সেখান থেকে সরিয়ে দিতে নির্দেশ দেন। এরপর যখন সিরাজের মৃতদেহ মুর্শিদাবাদের বাজারে এনে ফেলে দেওয়া হল, এবং কেউ মৃতদেহকে স্নান করিয়ে সমাধিস্থ করতে এগিয়ে এল না, তখন নবাব পরিবারের কাছে ঋণী এক বৃদ্ধ, মীর্জা জয়নাল আবেদিন বাকাওয়াল, সিরাজের মৃতদেহকে স্নান করিয়ে শবাধারে রেখে খোশবাগে আলিবর্দির সমাধির পাশে সমাধিস্থ করেন।৪০ এরপর আমিনার জীবনে যে দুঃসময় নেমে আসে এবং তাঁর যে মর্মান্তিক মৃত্যু হয় তা আমরা আগেই বলেছি।
লুৎফুন্নেসা—সিরাজ-বেগম
লুৎফুন্নেসার নামে বাঙালির হৃদয়তন্ত্রীতে এখনও বিষাদের সুর বেজে ওঠে। সত্য-মিথ্যা কল্পনা মিশে লুৎফুন্নেসা এখনও বাঙালির জনমানসে প্রেম, ভালবাসা, ত্যাগ, তিতিক্ষার মূর্ত প্রতীক। আর বলা বাহুল্য, মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের সঙ্গে লুৎফুন্নেসার নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তাঁর শৈশবের পরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কথিত আছে যে তিনি জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন। নাম ছিল রাজ কনওয়ার। তিনি সিরাজ-জননীর ক্রীতদাসী ছিলেন এবং সিরাজের তাঁকে খুব পছন্দ হওয়ায় তিনি তাকে সিরাজের হাতে তুলে দেন। সিরাজ তাঁর রূপ ও গুণে এতই মুগ্ধ হন যে তিনি তাকে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে হারেমে রাখেন এবং তাঁর নতুন নামকরণ করেন লুৎফুন্নেসা। তাদের একটি কন্যা সন্তানও জন্মায়।৪১ প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে ১৭৪৬ সালে আলিবর্দি তাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে মহম্মদ ইরাজ খানের কন্যা উমদাতুন্নেসা ওরফে বানু বেগমের খুব ধুমধাম করে বিবাহ দেন। কিন্তু লুৎফুন্নেসা তাঁর ভক্তি, ভালবাসা, সেবাযত্ন ও গভীর অনুরাগে তাঁর স্বামীকে এমনই আপন করে নিলেন যে সিরাজ তাঁর বিবাহিতা স্ত্রী বানু বেগমের চেয়েও লুৎফুন্নেসার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং কার্যত তাকেই প্রধান বেগমের মর্যাদা দেন।
লুৎফুন্নেসাও অবশ্য এই মর্যাদার যথাযোগ্য সম্মান রেখেছিলেন। মুর্শিদাবাদের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক নিখিলনাথ রায় এক শতাব্দীরও আগে লুৎফুন্নেসা সম্বন্ধে যা লিখেছিলেন তা যদিও খুবই ভাবাবেগপূর্ণ, তবুও অনেকাংশে সত্য।৪২
লুৎফ উন্নেসা মানবী হয়েও দেবী। তাঁর এই পবিত্র দেবভাবে হতভাগ্য সিরাজ নিজের অপদগ্ধ জীবনে কিছুটা শান্তি লাভ করতে পেরেছিলেন। লুৎফ উন্নেসা ছায়ার মতো সিরাজের সঙ্গ দিতেন। কি বিপদে, কি সম্পদে, লুৎফ উন্নেসা কখনও সিরাজকে পরিত্যাগ করেননি। যখন সিরাজ বাঙ্গালা, বিহার, উড়িষ্যার যুবরাজ হয়ে আমোদ তরঙ্গে গা ঢেলে দিতেন, তখনও লুৎফু উন্নেসা তাঁর সহচরী। আবার যখন রাজ্যভ্রষ্ট হয়ে তেজোহীন—আভাহীন—কক্ষচ্যুত গ্রহের মতো পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন, তখনও লুৎফ উন্নেসা তাঁরই অনুবর্তিনী। যখন… [পলাশি যুদ্ধের পর] তাঁর আকুল আহ্বানে ও মর্মভেদী অনুনয়ে কেউই তাঁর অনুসরণ করতে ইচ্ছে করেনি, কেবল লুৎফ উন্নেসা নিজের জীবনকে অকিঞ্চিৎকর মনে করে শত বিপদ মাথায় নিয়ে সিরাজের পেছনে পেছনে চলেছেন। স্বামীর দেহত্যাগের পরও তাঁর জীবন তাঁরই পরকালের কল্যাণের উদ্দেশ্যে সমর্পিত হয়।
