এই পরিপ্রেক্ষিতে ঘসেটি বেগমকে শায়েস্তা করা ছাড়া সিরাজদ্দৌল্লার কোনও গত্যন্তর ছিল না। সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ অবশ্য বলেছেন যে ঘসেটি বেগমের ধনসম্পদ হস্তগত করাই ছিল সিরাজের প্রধান উদ্দেশ্য। এটা মনে হয় সর্বাংশে সত্য নয়। তবে সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলা প্রয়োজন যে সিরাজ ভাবতেই পারেন যে ঘসেটি বেগমের হাতে যে প্রভূত অর্থ আছে, তা তিনি সিরাজের বিরুদ্ধে চক্রান্তে নানাভাবে কাজে লাগাতে পারেন। সেজন্য তাঁর কাছ থেকে ওই সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা অত্যন্ত জরুরি। ঘসেটি বেগম যে তাঁর ঐশ্বর্য ছড়িয়ে নানা শ্রেণীর লোককে তাঁর দলে টানছিলেন তা ফারসি ইতিহাসেও আছে।
তবে নবাব সিরাজদ্দৌল্লা ঘসেটি বেগমের বিরুদ্ধে প্রথমে কোনও জোরজবরদস্তি করেননি। তিনি আপস-মীমাংসার চেষ্টাই করেছিলেন। এজন্য তিনি আলিবর্দির বেগম শরফুন্নেসা ও বণিকরাজা জগৎশেঠকে ঘসেটি বেগমের কাছে পাঠান যাতে বেগম মোতিঝিলের প্রাসাদ ছেড়ে চলে যান। ঘসেটি বেগমের সঙ্গে সমঝোতা করতে সিরাজ যে এই কুটনৈতিক চালের আশ্রয় নিয়েছিলেন, তারিখ-ই-বংগালা-ই মহবৎজঙ্গীর লেখক ইউসুফ আলিও তাঁর তারিফ না করে পারেননি। উক্ত লেখক এই মর্মে লিখেছেন যে, বহুলোক যারা আগে বেগমকে সমর্থন করত, তারা সিরাজের আপসমূলক নীতি ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটাবার প্রচেষ্টায় সন্তুষ্ট হয়ে বেগমের দল ছেড়ে সিরাজের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।৩২ এদিকে হোসেন কুলির মৃত্যুর পর ঘসেটি বেগমের আরেক প্রণয়ী, মীরজা নজর আলি, মোতিঝিলের রক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। কোনও কোনও ফারসি ঐতিহাসিকের মতে সিরাজদ্দৌল্লা মোতিঝিল আক্রমণ করেন। নজর আলি পালিয়ে যান এবং সিরাজ বেগমকে বন্দি করে তাঁর সমস্ত ধনসম্পদ তাঁর মনসুরগঞ্জের প্রাসাদে নিয়ে আসেন। মুজাফ্ফরনামার লেখক করম আলির তথ্য অনুযায়ী এই সম্পদের মধ্যে হিরে, জহরত ছাড়াই নগদ চার কোটি টাকা, চল্লিশ লক্ষ মোহর এবং এক কোটি টাকা মূল্যের সোনা, রুপোর বাসন ছিল।৩৩ এটা অত্যুক্তি বলেই মনে হয়।
ঘসেটি বেগমের জীবন করুণ পরিণতির মধ্যেই শেষ হয়। আমরা আগেই দেখেছি, পলাশি যুদ্ধের পরে মীরজাফরের পুত্র মীরণের নির্দেশে আলিবর্দির বেগম শরফুন্নেসা, তাঁর দুই কন্যা ঘসেটি ও আমিনা বেগম, সিরাজ-পত্নী লুৎফুন্নেসা ও তাঁর শিশুকন্যাকে বন্দি করা হয় এবং কিছুদিন পরে তাদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়, আগস্ট ১৭৫৮-তে। মীরণ এঁদের সবাইকে মসনদের দাবিদার ভেবে তাঁর শত্রু মনে করতেন। তিনি ঢাকার ডেপুটি গভর্নর যশরত খানকে এঁদের সবাইকে মেরে ফেলতে নির্দেশ পাঠান। যশরত তাতে রাজি না হওয়ায় মীরণ এ কাজ সম্পন্ন করতে তাঁর এক অনুচরকে পাঠান। সে অনুচরের কাছ থেকে ব্যাপারটা জানতে পেরে ঘসেটি বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন। কথিত আছে যে, এসময় আমিনা ও ঘসেটি বেগম এই বলে সান্ত্বনা পাওয়ার চেষ্টা করেন যে তাঁরা নিজেরাই অনেক পাপ করেছেন, তাই মর্মান্তিক মৃত্যুই তাদের প্রাপ্য। তবে তাঁরা ভাগ্যবান যে এভাবে মৃত্যু হলে তাঁদের পাপের ভার মীরণের ওপর পড়বে। তাদের দু’জনকে একটি নৌকো করে ঢাকার অদূরে বুড়িগঙ্গায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেই নৌকো মাঝনদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে দুই বোন ঘসেটি ও আমিনা বেগমের সলিল সমাধি হয়। জনশ্রুতি আছে যে দুই বোন মীরণকে এই বলে অভিশাপ দেন যে বজ্রাঘাতে যেন তাঁর মৃত্যু হয়। তাই নাকি হয়েছিল, যদিও এর সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ আছে।৩৪
আমিনা বেগম
আমিনা বেগম নবাব আলিবর্দির কনিষ্ঠা কন্যা ও সিরাজদ্দৌল্লার জননী। তাঁর বিয়ে হয় আলিবর্দির ভ্রাতুষ্পুত্র জৈনুদ্দিন আহমেদ খানের সঙ্গে। পরে আলিবর্দি জৈনুদ্দিনকে বিহারের ডেপুটি গভর্নর করে পাঠান। আমিনাও তাঁর সঙ্গে পাটনা যান। কিন্তু আমিনা বেগমের কপালে খুব বেশিদিন সুখভোগ করা ছিল না। বিহারের বিদ্রোহী আফগানরা আলিবর্দির ওপর প্রতিশোধ নিতে জৈনুদ্দিন ও তাঁর বৃদ্ধ পিতাকে হত্যা করে। আমিনা কোনওরকমে বেঁচে যান। আফগানরা তাঁকে বন্দি করে রাখে। শোনা যায় যে আফগানরা বেআব্রু করে খোলা গাড়িতে আমিনাকে পাটনায় প্রদক্ষিণ করায় এবং এতে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত অত্যন্ত ব্যথা পায়। পরে আলিবর্দি পাটনা অভিযান করে আফগানদের শায়েস্তা করেন এবং আমিনাকে উদ্ধার করতে সমর্থ হন। এরপর আমিনা বেগম মুর্শিদাবাদে এসে আশ্রয় নেন।৩৫ সেখানে তিনি দিদি ঘসেটি বেগমের মতো অবৈধ প্রণয়ে লিপ্ত হয়ে পড়েন। সেটা ভেবেই হয়তো সিয়রের অনুবাদক নোটা মানুস (Nota Manus) ওরফে হাজি মুস্তাফা মন্তব্য করেন যে ‘She [Amina] became famous in Murshidabad by her amours and gallantry’.৩৬ দিদির প্রণয়ী হোসেন কুলির সঙ্গে তাঁর অবৈধ সম্পর্ক হয় এবং আমরা দেখেছি বেগম শরফুন্নেসার উদ্যোগে কীভাবে হোসেন কুলিকে হত্যা করা হয়। এই ত্রিকোণ প্রেম মুর্শিদাবাদের জনমানসে যে কতটা প্রভাব ফেলেছিল তা সিয়রের লেখক ও আলিবর্দির আত্মীয় গোলাম হোসেনের লেখা থেকে স্পষ্ট।৩৭
In the zenith of the conqueror’s (Alivardi’s) power, such infamies and lewdness came to be practised by some females and other persons of his family, as cannot be mentioned with decency, but effectually dishonoured his family for ever. All his daughters as well as his beloved Siraj-ud-daulla, lapsed into such a flagitious conduct, and they were guilty of such a variety of shameful excesses, as would have disgraced totally any person whatever, still more, persons of their elevated rank and sublime station.
