অবশ্য অনেকে বলেন যে লুৎফুন্নেসার প্রতি সিরাজের ভালবাসা এবং আনুগত্যের আরও একটি কারণ ছিল। সিরাজ ফৈজি ফরজান নামে দিল্লির এক অপূর্ব সুন্দরী নর্তকীর মোহে পড়েন এবং তাকে এনে তাঁর মনসুরগঞ্জের প্রাসাদে তোলেন। কিছুদিন পর ফৈজি সিরাজের ভগ্নীপতি সৈয়দ মহম্মদ খানের শারীরিক সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে তাঁর প্রেমে পড়েন এবং লুকিয়ে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করেন। এটা টের পেয়ে সিরাজ ফৈজিকে প্রাসাদের একটি ঘরে বন্দি করে চারদিক থেকে ঘরটি বন্ধ করে দেন। তাতে ফৈজির নির্মম মৃত্যু হয়।৪৩ ফৈজির বিশ্বাসঘাতকতায় সিরাজ খুবই আঘাত পান এবং ফলে লুৎফুন্নেসার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
পলাশির যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সিরাজদ্দৌল্লা যখন মুর্শিদাবাদে পালিয়ে আসেন। তখন তাঁর এত বড় বিপদে তাঁর পাশে দাঁড়াবার জন্য বিশেষ কেউ এগিয়ে আসেনি। এমনকী তাঁর শ্বশুর ইরাজ খানও সাহায্যের হাত বাড়াননি। বাধ্য হয়ে সিরাজ ২৫ জুন রাত্রির অন্ধকারে মুর্শিদাবাদ ত্যাগ করলেন—সঙ্গে লুৎফুন্নেসা, তিন বছরের শিশুকন্যা ও দু’একজন দাসদাসী। সিরাজদ্দৌল্লা নাকি লুৎফুন্নেসাকে এ অবস্থায় তাঁর সঙ্গে যেতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু লুৎফুন্নেসা তাতে কর্ণপাতও করেননি—এ দুর্দিনে তিনি স্বামীকে একা একা যেতে দিতে কিছুতেই রাজি হননি। তিনদিন তিনরাত অনাহারে পথ চলার পর রাজমহলের কাছে নৌকো থেকে নেমে সিরাজ দানশাহ নামে এক ফকিরের কাছে খাবার চাইতে গেলেন। সিরাজকে চিনতে পেরে দানাশাহ তাঁকে মীরজাফরের জামাই মীরকাশিমের হাতে তুলে দেন। এরপর তাকে মুর্শিদাবাদ নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে মীরজাফরের পুত্র মীরণের গুপ্তঘাতক মহম্মদি বেগ সিরাজকে হত্যা করেন। এসব ঘটনা মোটামুটিভাবে সবার জানা। তাই বিস্তারিত বিবরণের প্রয়োজন নেই।৪৪
স্বামীর মৃত্যুর পর লুৎফুন্নেসার জীবন নিদারুণ দুঃখদুর্দশা ও দারিদ্রের মধ্যে কাটে। নতুন নবাব মীরজাফর ও তাঁর পুত্র মীরণ লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা উম্মত জহুরাকে আলিবর্দির বেগম শরফুন্নেসা, দুই কন্যা ঘসেটি ও আমিনা বেগমের সঙ্গে ১৭৫৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় নির্বাসিত করেন। সেখানে কীভাবে মীরণের নির্দেশে ঘসেটি ও আমিনা বেগমকে নৌকো থেকে নদীগর্ভে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয় তা আগেই বলা হয়েছে। শরফুন্নেসা, লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা প্রাণে বেঁচে গেলেও বন্দি অবস্থায় তাদের দুঃখদুর্দশার সীমা ছিল না। তাঁদের জন্য যে সামান্য মাসোহারার ব্যবস্থা ছিল তাও তারা নিয়মিত পেতেন না। পরে মহম্মদ রেজা খান যখন ঢাকার শাসক হয়ে আসেন তখন তাঁদের নিয়মিত মাসোহারা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। আর ভাগ্যের এমনই পরিহাস, যে ক্লাইভ তাঁর স্বামীর ভাগ্য বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ, তাঁরই কৃপায় ঢাকায় সাত বছর বন্দিজীবন যাপন করার পর লুৎফুন্নেসাদের মুর্শিদাবাদে ফেরত পাঠানো হয়।৪৫
মুর্শিদাবাদে আসার পর শরফুন্নেসা, লুৎফুন্নেসা ও তাঁর কন্যা কোম্পানি সরকারের কাছে তাঁদের জীবিকার জন্য মাসোহারার ব্যবস্থা করতে আবেদন করেন। আবেদনপত্রে তিনজনেরই স্বাক্ষর ছিল।৪৬ লুৎফুন্নেসাকে খোশবাগে আলিবর্দি ও সিরাজদ্দৌল্লার সমাধির তত্ত্বাবধান করার ভার দেওয়া হয়। এজন্য তিনি মাসে ৩০৫ টাকা করে পেতেন। তা ছাড়া মাসে ১০০ টাকা করে তিনি মাসোহারা পেতেন। কিছুদিন পর তাঁর একমাত্র কন্যা উম্মত জহুরার স্বামী মারা যাওয়ায় তিনি খুবই শোকগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ১৭৭৪ সালে উম্মত জহুরার মৃত্যু হয়। জহুরার চারটি অল্প বয়স্কা কন্যা ছিল—শরফুন্নেসা, আসমতুন্নেসা, সাকিনা, আমাতুলমাদি। কোম্পানি এঁদের ভরণপোষণের জন্য মাসে ৫০০ টাকা বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করে।৪৭ কিন্তু তারা যখন বড় হয়ে উঠল, তখন ওই টাকায় তাদের খরচপত্র চালানো লুৎফুন্নেসার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তিনি ১৭৮৭ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিসকে তাঁর অবস্থার কথা জানিয়ে এবং তাঁদের মাসোহারা বাড়াবার অনুরোধ জানিয়ে একটি চিঠি দেন। তাতে তিনি এটা জানান যে জহুরার দুটি মেয়ের তিনি বিয়ে দিয়েছেন, এতে তাঁর প্রচুর খরচ হয়েছে। আরও দুটি মেয়ের বিয়ে দিতে হবে, যা ব্যয় সাপেক্ষ এসব যেন বিবেচনা করা হয়।৪৮ কিন্তু কর্নওয়ালিসের কাছ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। লুৎফুন্নেসা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সিরাজদ্দৌল্লার সমাধির দেখাশোনা করেছেন এবং রোজই সমাধিতে সন্ধ্যাপ্রদীপ দিয়েছেন। ১৭৯৫ সালের নভেম্বরে তাঁর মৃত্যু হয়।
সিরাজদ্দৌল্লার মৃত্যুর পর অনেকেই লুৎফুন্নেসাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি কারও প্রস্তাবে রাজি হননি। মুজাফ্ফরনামার লেখক করম আলি লিখেছেন যে এরকম এক ব্যক্তি লুৎফুন্নেসাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে লুৎফুন্নেসা উত্তর দিয়েছিলেন যে ‘আমি হাতির পিঠে চড়তে অভ্যস্ত ছিলাম, এখন গদর্ভের পিঠে চড়ব কী করে’?৪৯ এটা থেকে লুৎফুন্নেসার চরিত্রের দৃঢ়তা ও তেজস্বিতার প্রমাণ পাওয়া যায়।
মুন্নি বেগম
যদিও এ গ্রন্থে স্বাধীন নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদের ইতিবৃত্ত আমাদের আলোচ্য বিষয়, তাই মীরজাফর বা তাঁর বেগম মুন্নি আমাদের আওতায় ঠিক পড়ে না। তবু মুর্শিদাবাদের বেগম বৃত্তান্ত আলোচনা করতে গিয়ে মুন্নি বেগমকে বাদ দিলে তাতে কিছুটা অসম্পূর্ণতা থেকে যায়। কারণ মুর্শিদাবাদের বেগমদের মধ্যে মুন্নি বেগমের জীবনই বোধ হয় সবচেয়ে বর্ণময় ও রোমাঞ্চকর। মুর্শিদাবাদের বেগমদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বেশি চতুর, কৌশলী, বুদ্ধিমতী, স্বার্থান্বেষী ও দূরদৃষ্টি সম্পন্না ছিলেন। তাই তিনি মীরজাফরের বিবাহিতা স্ত্রী না হয়েও তাঁর বিবাহিতা স্ত্রী শা’ খানমকে ম্লান করে দিয়ে মীরজাফরের প্রধানা বেগম হয়ে ওঠেন।৫০
