শরফুন্নেসা অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। হলওয়েল জানাচ্ছেন যে সিরাজদ্দৌল্লা কলকাতা দখল করার পর হলওয়েল ও অন্য কয়েকজন ইংরেজকে বন্দি করে মুর্শিদাবাদ নিয়ে আসেন। শরফুন্নেসার অনুরোধে সিরাজ হলওয়েল ও অন্যান্যদের মুক্তি দেন।১৯ সে যাই হোক, হলওয়েল শরফুন্নেসার গুণমুগ্ধ ছিলেন বলে তাঁর প্রশংসা করতে ভোলেননি :২০
a woman whose wisdom, magnanimity, benevolence and every ami-able quality, reflected high honour on her sex and station. She much influenced the Usurper’s [Alivardi’s] councils, and was ever consult-ed by him in every material movement in the state, except when san-guinary and treacherous measures were judged necessary, which he knew she would oppose as she ever condemned them when perpe-trated, however successful.
শরফুন্নেসার শেষ জীবন কেটেছিল দুঃখদুর্দশা ও যন্ত্রণার মধ্যে। পলাশিতে সিরাজদ্দৌল্লার পরাজয়ের পর মীরজাফর মসনদ দখল করলে তাঁর পুত্র মীরণ শরফুন্নেসা, তাঁর দুই কন্যা ঘসেটি ও আমিনা বেগম এবং সিরাজপত্নী লুৎফুন্নেসা ও তাঁর শিশুকন্যাকে বন্দি করে ঢাকা পাঠিয়ে দেন। ঘসেটি ও আমিনাকে সলিল সমাধি দেওয়া হয়। বাকিরা কোনওরকমে এই মর্মান্তিক মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেলেন এবং শেষ পর্যন্ত ক্লাইভের হস্তক্ষেপে মুর্শিদাবাদে ফিরে আসতে পারলেন। কিন্তু তাদের যে মাসোহারার ব্যবস্থা হল, তাতে জীবন নির্বাহ করা খুব কঠিন হয়ে ওঠে। ১৭৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসে শুরফুন্নেসাকে ইংরেজ গভর্নরের কাছে তাঁর ভাতা বৃদ্ধির জন্য আর্জি পাঠাতে দেখা যায়।২১ বাংলার দোর্দণ্ডপ্রতাপ নবাব আলিবর্দি খানের বেগমের কী নিদারুণ পরিণতি!
ঘসেটি—মোতিঝিলের বেগম
ঘসেটি বেগম নবাব আলিবর্দির জ্যেষ্ঠা কন্যা। প্রথমে তাঁর নাম ছিল মেহেরুন্নিসা। পরে তিনি ঘসেটি বলেই পরিচিত হন। তবে অনেকেই তাঁকে ছোট বেগম হিসেবেই জানত কারণ তাঁর স্বামী নওয়াজিস মহম্মদ ছিলেন ঢাকার ছোট নবাব। মুর্শিদাবাদের জনমানসে তাঁর পরিচয় ছিল মোতিঝিলের বেগম বলে কারণ তাঁর স্বামীর তৈরি মুর্শিদাবাদের অদূরে মোতিঝিল প্রাসাদেই তিনি বসবাস করতেন।২২ আলিবর্দি ঘসেটির বিবাহ দেন তাঁর দাদা হাজি আহমেদের জ্যেষ্ঠ পুত্র নওয়াজিস মহম্মদের সঙ্গে। বাংলার মসনদ দখল করার পর তিনি নওয়াজিসকে ঢাকার ডেপুটি গভর্নর পদে নিযুক্ত করেন। নওয়াজিস প্রথম যৌবনে তাঁর উচ্ছৃঙ্খলতা, নিষ্ঠুরতা ও বদচরিত্রের জন্য কুখ্যাত ছিলেন কিন্তু পরে তাঁর চরিত্রে বিরাট পরিবর্তন আসে। শাসক হিসেবে তিনি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং সুখ্যাতি অর্জন করেন।২৩ তবে কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে ভগ্নস্বাস্থ্য ও নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার অভাবের জন্য তিনি ঢাকার শাসনভার তুলে দিয়েছিলেন পত্নী ঘসেটি বেগম ও তাঁর প্রিয়পাত্র হোসেন কুলি খানের ওপর।২৪
ঘসেটি বেগম ও নওয়াজিস মহম্মদের কোনও সন্তান ছিল না। তাই তাঁরা সিরাজদ্দৌল্লার ছোট ভাই এক্রামুদ্দৌল্লাকে দত্তক নিলেন। এক্ৰাম নওয়াজিসের নয়নের মণি হয়ে ওঠেন এবং তাঁর জীবনের একমাত্র আনন্দের উৎস। এদিকে আলিবর্দি খান ১৭৫২ সালে তাঁর দুই জামাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্র, নওয়াজিস মহম্মদ ও পূর্ণিয়ার নবাব সৈয়দ আহমেদকে বাদ দিয়ে তাঁর প্রিয় দৌহিত্র সিরাজদ্দৌল্লাকে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেন।২৫ এতে মনে হয় নওয়াজিস খুবই ক্ষুব্ধ হন এবং তখন থেকে তিনি তাঁর বেগম ঘসেটিকে নিয়ে প্রধানত মুর্শিদাবাদে তাঁর মোতিঝিলের প্রাসাদে বাস করতে থাকেন। এর কিছুদিন পরেই ১৭৫৪ সালে তাঁর দত্তক পুত্র ও প্রাণাধিক প্রিয় এক্রামুদ্দৌল্লা বসন্তরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। নওয়াজিস এ নিদারুণ শোক সহ্য করতে পারলেন না। ১৭৫৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁর মৃত্যু হয়। মোতিঝিলের প্রাসাদে এক্রামুদ্দৌল্লার পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।২৬
নওয়াজিসের মৃত্যুর পর ঘসেটি বেগম ঢাকার শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি হোসেন কুলির হাতেই দিয়ে দেন। আমরা আগেই বলেছি, ঘসেটির সঙ্গে হোসেন কুলির অবৈধ সম্পর্ক ছিল এবং কথিত আছে যে আলিবর্দির বেগম শরফুন্নেসা কৌশল করে সিরাজদ্দৌলাকে দিয়ে হোসেন কুলিকে হত্যা করান। এরপর ঢাকার শাসনভার চলে যায় নওয়াজিস পত্নী ঘসেটির আরেক প্রিয়পাত্র ও ঘনিষ্ঠ রাজবল্লভের হাতে। নওয়াজিস অত্যন্ত ধনী ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বেগম ঘসেটিই সবকিছুর মালিক হন। ঘসেটি প্রথম থেকেই সিরাজদ্দৌল্লার প্রতি বিরূপ ছিলেন। প্রথমত তাঁর আশঙ্কা ছিল সিরাজ নবাব হয়েই তাঁর সব ধনসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করবেন। তা ছাড়া তিনি সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে নিজের জন্য মসনদ দখল করতে চেয়েছিলেন। আলিবর্দি তাঁর জীবিতাবস্থায় দু’জনের মধ্যে আপস-মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সফল হতে পারেননি। বৃদ্ধ নবাব ৮০ বছর বয়সে ১৭৫৬ সালের ৯/১০ এপ্রিল মারা যান। খোশবাগে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।২৭
নবাব আলিবর্দির মৃত্যুর পর সিরাজদ্দৌল্লা ১০ এপ্রিল ১৭৫৬ সালে মুর্শিদাবাদের মসনদে বসেন। প্রথমেই তিনি মসনদের জন্য তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ঘসেটি বেগমের সঙ্গে মোকাবিলা করতে চাইলেন। স্বামী নওয়াজিসের দৌলতে ঘসেটি প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী হয়েছিলেন। তা ছাড়া হোসেন কুলির মৃত্যুর পর ঢাকার শাসনভার যাঁর হাতে ছিল, সেই রাজবল্লভও ঘসেটি বেগমের দলভুক্ত হয়ে সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে বেশ শক্তিশালী চক্র গড়ে তোলেন। এদিকে সিরাজও সন্দেহ করেছিলেন যে ঘসেটি ও রাজবল্লভ ইংরেজদেরও তাদের দলে সামিল করার চেষ্টা করছিলেন। এ সন্দেহ একেবারে অমূলক নয়।২৮ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির রেকর্ড থেকে এর সত্যতা প্রমাণ করা যায়। বাংলায় ফরাসি কোম্পানির অধ্যক্ষ রেনল্ট (Renault) লিখেছেন যে, ইংরেজদের ধারণা হয়েছিল যে ঘসেটি বেগমের দলকে কেউ রুখতে পারবে না, ঘসেটিই মসনদ দখল করবেন। সিরাজদ্দৌল্লার পতন অনিবার্য। তাই তারা বেগমের সঙ্গে সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়।২৯ আবার কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’ও বলেছেন যে ইংরেজরা ভেবেছিল সিরাজদ্দৌল্লা কখনওই নবাব হতে পারবেন না। এ অভিমত অন্য একটি ফরাসি তথ্যেও পাওয়া যায়।৩০ ইংরেজদের মধ্যে অনেকের লেখা থেকেও এটা স্পষ্ট। হলওয়েলের নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে ঘসেটি বেগমের সাফল্য সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নেই। এমনকী কলকাতার গভর্নর রজার ড্রেকেরও (Roger Drake) ধারণা ছিল ঘসেটি বেগমের বিরুদ্ধে সিরাজের সফল হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই।৩১
