শরফুন্নেসা
মুর্শিদাবাদের রাজনীতি ও শাসন প্রক্রিয়ায় বেগমদের কারও কারও প্রভাব যে বেশ মঙ্গলদায়ক ও ইতিবাচক হয়েছিল তা আলিবর্দির বেগম শরফুন্নেসার উদাহরণ থেকেই বোঝা যায়। তিনি যে শুধু অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রেও তাঁর স্বামীর পাশে থেকেছেন তা নয়, আলিবর্দি যখন মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকতেন, রাজধানী থেকে স্বামীর অনুপস্থিতিতে তিনি তখন রাজকার্য পরিচালনা করতেন। আলিবর্দি যখন বালেশ্বরে দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন, তখন শরফুন্নেসাও তাঁর সঙ্গে ছিলেন। আবার তিনি যখন ভাস্কর পণ্ডিতের নেতৃত্বে মারাঠা আক্রমণ প্রতিরোধ করতে বর্ধমানের কাছে মারাঠাদের সম্মুখীন হন, তখন বেগম শরফুন্নেসা স্বামীর সহযোগী হন।১৩ ওই যুদ্ধে মারাঠারা লণ্ডা নামের যে হাতির পিঠে বসে বেগম যুদ্ধ করছিলেন, সেটাকে ঘিরে ফেলে এবং তাকে প্রায় ধরে ফেলে। ভাগ্যক্রমে নবাবের সেনাপতি ওমর খানের পুত্র মুসাহিব খানের অসীম বীরত্বে শরফুন্নেসা মারাঠাদের হাতে বন্দি হওয়া থেকে বেঁচে যান।১৪
অনেক সময় দেখা গেছে যে শরফুন্নেসা তাঁর স্বামী নবাব আলিবর্দিকে তাঁর বিপদ ও দুশ্চিন্তার সময় সাহস, ভরসা ও বিজ্ঞজনোচিত পরামর্শ দিয়েছেন। এমন একটি পরিস্থিতির কথা সিয়রের লেখক গোলাম হোসেন লিখে গেছেন। একদিন তিনি যখন বেগমের অন্দরমহলে বসেছিলেন, তখন উদ্বিগ্ন ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নবাব এসে হাজির হন। আলিবর্দির মুখ দেখেই শরফুন্নেসা বুঝতে পারেন যে নবাব বেশ চিন্তাগ্রস্ত। স্বামীর কাছে কী হয়েছে তা তিনি জানতে চান। তাঁর অনুরোধে আলিবর্দি জানান যে তাঁর আফগান সেনাপতিদের, বিশেষ করে শামসের খানের, মতিগতি সুবিধের নয়, তিনি হয়তো বিশ্বাসঘাতকতা করে মারাঠাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন। এ ভাবনায় আলিবর্দি খুবই উদ্বিগ্ন। শরফুন্নেসা তক্ষুনি দু’জন বিশ্বস্ত অনুচরকে মারাঠা বাহিনীর প্রধান রঘুজি ভোঁসলের কাছে পাঠালেন এই বার্তা নিয়ে যে তাঁরা বেগমের কাছ থেকে আসছেন এবং একটা মিটমাট করে মারাঠারা যেন বাংলা ছেড়ে চলে যান। রঘুজির খুব আপত্তি ছিল না। কিন্তু মীর হাবিব তা হতে দিলেন না। মীর হাবিবের প্ররোচনায় তিনি মুর্শিদাবাদ আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন কিন্তু কাটোয়ার যুদ্ধে তিনি আলিবর্দির হাতে পরাজিত হন।১৫
রাজকার্যের ব্যাপারে শরফুন্নেসা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে আলিবর্দিকে সাহায্য করতেন। মারাঠাদের পরাস্ত করার পর তিনি মারাঠাদের সঙ্গে যোগসাজসের অভিযোগে তাঁর আফগান সেনাপতিদের বরখাস্ত করেন। তারা আলিবর্দির জামাতা ও বিহারের ছোট নবাব জৈনুদ্দিন আহমেদকে হত্যা করে এবং আলিবর্দির কন্যা ও জৈনুদ্দিনের পত্নী, আমিনা বেগমকে বন্দি করে রেখে প্রতিশোধ নিল। কিন্তু আলিবর্দি যুদ্ধ করে আফগানদের পরাস্ত করেন ও কন্যা আমিনাকে তাদের হাত থেকে মুক্ত করে আনেন। বিহার শাসন করার জন্য তিনি তাঁর দাদা হাজি আহমেদের পুত্র ও তাঁর মধ্যম জামাতা সৈয়দ আহমেদকে ছোট নবাব করে পাটনা পাঠালেন। এই ব্যবস্থা বেগম শরফুন্নেসার একেবারে মনঃপূত হল না। তিনি বুঝতে পারেন যে বিহার সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ ওখান দিয়েই বাইরের শত্রু ও আক্রমণকারীরা বাংলায় ঢুকতে পারে। তাই বিহারের শাসনকর্তার গুরুত্বপূর্ণ পদে সৈয়দ আহমেদ একেবারে অনুপযুক্ত। আলিবর্দিকে তিনি বিষয়টার গুরুত্ব বুঝিয়ে বললেন। তিনি জানতেন নবাব তাঁর কথার ও মতামতের যথেষ্ট দাম দেন। তবু সৈয়দ আহমেদকে বিহারের ছোট নবাবের পদ থেকে হঠাবার জন্য তিনি আরেকটি মোক্ষম অস্ত্র প্রয়োগ করলেন। আলিবর্দির, এবং অবশ্য তাঁর বেগমেরও, ইচ্ছে যে সিরাজউদ্দৌল্লাকে তাঁর উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করবেন। বেগম সিরাজের মাথায় ঢোকালেন যে সৈয়দ আহমেদ বিহারের ছোট নবাব থাকলে সিরাজের পক্ষে আলিবর্দির পর মসনদে বসা সম্ভব হবে না। সিরাজ আলিবর্দির কাছে বায়না ধরলেন, সৈয়দ আহমেদকে বিহার থেকে সরাতে হবে। বৃদ্ধ আলিবর্দি প্রিয় নাতির কথা কোনওদিন ফেলতে পারেননি। এবারও পারলেন না। সৈয়দ আহমেদকে সরিয়ে সিরাজকেই বিহারের ডেপুটি গভর্নর করা হল।১৬ এ ঘটনা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, বেগম শরফুন্নেসা কতটা বিজ্ঞ, বুদ্ধিমতী ও কৌশলী ছিলেন।
মুর্শিদকুলির মতো আলিবর্দিও একমাত্র পত্নীর প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। তাঁর অন্য কোনও পত্নী বা রক্ষিতা ছিল না। বেগম শরফুন্নেসা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণা ও সচ্চরিত্রা। তাঁর নৈতিক মূল্যবোধও ছিল প্রখর। তাই তিনি তাঁর কন্যাদের, ঘসেটি ও আমিনা বেগমের, চারিত্রিক স্খলন কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারেননি। ঘসেটি তাঁর স্বামী ঢাকার ছোট নবাব নওয়াজিস মহম্মদের অধস্তন কর্মচারী ও প্রিয়পাত্র হোসেন কুলি খানের সঙ্গে অবৈধ প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর বদান্যতায় হোসেন কুলি বেশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন এবং তাঁর অনেক কুকর্মও ঢাকা পড়ে যায়।১৭ কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই হোসেন কুলি ঘসেটির বোন, জৈনুদ্দিন আহমদের স্ত্রী ও সিরাজদ্দৌল্লার মা, আমিনা বেগমের প্রেমে পড়েন। এ সব ঘটনায় শরফুন্নেসা খুবই অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হন। তিনি তাঁর দুই কন্যাকে সুপথে আনার যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে তিনি সফল হতে পারলেন না। তখন তিনি স্থির করলেন সব নষ্টের গোড়া হোসেন কুলি খানকে একেবারে সরিয়ে দিতে হবে। এজন্য তিনি আলিবর্দির কাছে দরবার করেন। এর উত্তরে আলিবর্দি জানালেন যে যেহেতু হোসেন কুলি নওয়াজিস মহম্মদের কর্মচারী ও তাঁর বিশেষ ঘনিষ্ঠ, তাঁর অনুমোদন ছাড়া এ কাজ করা ঠিক হবে না। বেগম শুরফুন্নেসা নওয়াজিসের অনুমতি আদায় করলেন এবং সিরাজদ্দৌল্লাকে এ কাজের ভার দিলেন। সিরাজ লোক দিয়ে সেটা সম্পন্ন করেন বলে কথিত আছে।১৮
