এর পরের ঘটনাবলী জিন্নতউন্নেসার পক্ষে খুবই নিদারুণ হয়েছিল। আলিবর্দি সুজাউদ্দিনের সময়কার শক্তিশালী ত্রয়ীর (triumverate)—হাজি আহমেদ, আলমচাঁদ ও জগৎশেঠ, যাঁরা সুজাউদ্দিনের বকলমে বাংলা শাসন করতেন—সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর বেগম জিন্নতউন্নেসার পুত্র নবাব সরফরাজের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। গিরিয়ার যুদ্ধে (১৭৪০) সরফরাজ আলিবর্দির বাহিনীর মুখোমুখি হন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে করতেই তিনি প্রাণ বিসর্জন দেন।৬ এভাবে একমাত্র পুত্রের মৃত্যু জিন্নতউন্নেসার কাছে কতটা মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক হয়েছিল তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে।
যুদ্ধ জেতার দু’দিন পরে আলিবর্দি মুর্শিদাবাদ শহরে পদার্পণ করলেন এবং মসনদে বসার আগেই জিন্নতউন্নেসার কাছে তাঁর কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। বেগমকে তিনি জানালেন যে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেবেন এবং যথাসাধ্য তাঁর আজ্ঞা বহন করে চলবেন। জিন্নতউন্নেসা পুত্রশোকে এতই কাতর ছিলেন যে তিনি উত্তরে আলিবর্দিকে কোনও কথাই বললেন না।৭ নবাব হয়ে আলিবর্দি তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যার স্বামী নওয়াজিস মহম্মদকে ঢাকার ছোট নবাব পদে নিযুক্ত করেন। নওয়াজিস জিন্নতউন্নেসাকে তাঁর প্রাসাদ ছেড়ে ঢাকায় তাঁর কাছে তাঁর পালিতা মা হিসেবে এসে থাকতে রাজি করালেন। শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর ঘরসংসারের সব দায়িত্বও জিন্নতউন্নেসার হাতে দিয়েছিলেন এবং এ ব্যাপারে তাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিলেন। বেগম নওয়াজিসকে জিজ্ঞেস না করে বা তাঁর অনুমতি না নিয়েও নিজের পছন্দমতো সব কাজ করার অধিকারও পেলেন। তবে নিজের সম্মান ও আভিজাত্য বজায় রেখে তিনি সবসময় পর্দার অন্তরাল থেকেই নওয়াজিসের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন।৮
বেগম জিন্নতউন্নেসার উদারতা ও মহানুভবতার পরিচয় পাওয়া যায় আরও একটি ঘটনা থেকে। তিনি সরফরাজের এক রক্ষিতার গর্ভজাত পুত্র আগা বা আকা বাবাকে দত্তক নেন। সরফরাজ যেদিন গিরিয়ার যুদ্ধে নিহত হন, সেদিনই আগা বাবার জন্ম হয়। হয়তো এজন্যই শোকাতুরা বেগমের আগার প্রতি করুণার উদ্রেক হয় এবং তিনি তাঁকে দত্তকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। আগা বেগমের নয়নের মণি হয়ে ওঠেন, বেগমের বার্ধক্যে একমাত্র সান্ত্বনা। আগার সঙ্গে তিনি নওয়াজিস মহম্মদের ভাই সৈয়দ আহমেদের এক কন্যার বিবাহ দিতে উৎসুক হয়ে ওঠেন। সৈয়দ আহমেদ প্রথমে এ প্রস্তাবে রাজি হননি কিন্তু শেষ পর্যন্ত নওয়াজিস মহম্মদ ও তাঁর স্ত্রী ঘসেটি বেগমের পীড়াপীড়িতে রাজি হলেন, কিন্তু নবাব পরিবারের নানা দুর্ঘটনার জন্য এই বিবাহ সম্পন্ন হয়নি বলেই মনে হয়।৯
ঘসেটি ও নওয়াজিস দু’জনেই জিন্নতউন্নেসাকে খুবই সম্মান ও শ্রদ্ধা করতেন। মুর্শিদকুলির খাসতালুক ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি তিনি একাই ভোগ করেছেন। নওয়াজিস মহম্মদ বা আলিবর্দি কখনও তাতে হাত দেননি। শুধু তাই নয়, আলিবর্দি এবং নওয়াজিস তাকে এতই সমীহ এবং সম্মান করতেন যে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলে তাঁর সামনে তারা নতজানু হয়ে অভিবাদন জানাতেন এবং তিনি বলার পরই শুধু তারা তাঁর সামনে আসন গ্রহণ করতেন।১০
জিন্নতউন্নেসা কতদিন জীবিত ছিলেন, কবে তাঁর মৃত্যু হয়, সে সম্বন্ধে কিছু জানা যায় না। তবে মুর্শিদাবাদ প্রাসাদের আধ মাইলের মতো উত্তরে আজিমনগরে তিনি যে মসজিদ নির্মাণ করেন, তাঁর ধ্বংসাবশেষ অনেক দিন দেখা গেছে। কথিত আছে, এ ধ্বংসাবশেষের পাশেই তাঁর মৃত্যুর পর তাকে সমাধিস্থ করা হয়।১১
দুরদানা বেগম
মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবারের মহিলাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন যে ব্যক্তিত্বসম্পন্না, সাহসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ দুরদানা বেগম। তিনি ছিলেন নবাব সরফরাজ খানের সহোদরা এবং উড়িষ্যার ছোট নবাব (ডেপুটি গভর্নর) দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খানের পত্নী। কথিত আছে যে উড়িষ্যাতে তাঁর স্বামীর চাইতেও তাঁর সম্মান ও মর্যাদা ছিল অনেক বেশি। আলিবর্দি খান সরফরাজ খানকে গিরিয়ার যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করে বাংলার মসনদে বসার পর সরফরাজের ভগ্নীপতি উড়িষ্যার ছোট নবাব দ্বিতীয় মুর্শিদকুলির বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। আলিবর্দির বিশাল সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনওরকমের সহায়সম্বল তাঁর ছিল না। সে রকম মনোবলও নয়। তাই তিনি আলিবর্দির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে একেবারে ভরসা পাচ্ছিলেন না। কিন্তু তাঁর পত্নী দুরদানা বেগম তাকে আলিবর্দির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্য উত্তেজিত করতে থাকেন কারণ তিনি এভাবে তাঁর সহোদর সরফরাজের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। তাতে বিশেষ কোনও ফল না হওয়ায় এবং যুদ্ধ করতে দ্বিতীয় মুর্শিদকুলির প্রচণ্ড অনীহা দেখে দুরদানা বেগম শেষ পর্যন্ত তাঁর স্বামীকে এই বলে ভয় দেখালেন যে আলিবর্দির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে না গেলে তিনি তাকে পরিত্যাগ করবেন। তাঁর সব বিষয়সম্পত্তি ও উড়িষ্যার ছোট নবাবের পদ সব কিছু তাঁর জামাই মীরজা বকীর খানকে দিয়ে দেবেন। এতেই কাজ হল এবং মুর্শিদকুলি আলিবর্দির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। বালেশ্বরের এই যুদ্ধে তিনি আলিবর্দির কাছে পরাজিত হন। এরপর মুর্শিদকুলি ও দুরদানা বেগম দাক্ষিণাত্যে নিজাম-উল-মুলক আসফ ঝা’র দরবারে আশ্রয় নেন।১২
