আপনার পক্ষে বিশেষ করে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারেও আপনি খুব একটা গা করছেন না দেখে আমি খুবই উদ্বিগ্ন। এ ক’দিনের মধ্যে আমি যখন ফৌজ নিয়ে অভিযান করছি তখন আমি ঠিক কী করব বা কী ব্যবস্থা নেব সে সম্বন্ধে আপনার কাছ থেকে কোনও ইঙ্গিত বা নির্দেশ পাইনি। আপনার কাছ থেকে কোনও সদুত্তর না পাওয়া পর্যন্ত আমি এখানেই অবস্থান করব, আর এগুবো না। আমার মনে হয় অতি সত্বর আমার ফৌজের সঙ্গে আপনার যোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ক্লাইভ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও অস্থির হয়ে যুদ্ধবিষয়ক কমিটির সভা ডাকলেন ২১ জুন— উদ্দেশ্য, নবাবের ওপর তক্ষুনি ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত, না ইংরেজরা যেখানে আছে সেখানে আরও সুসংহত হয়ে বর্ষা শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষা করে তারপর নবাবের বিরুদ্ধে মারাঠাদের ‘আমাদের সঙ্গে’ যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানানো উচিত, তা জানতে।৮৫ এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে পলাশি যুদ্ধের মাত্র দু’দিন আগেও ক্লাইভ সিরাজদ্দৌল্লাকে গদিচ্যুত করার জন্য মারাঠাদের সঙ্গে হাত মেলাবার কথা চিন্তা করছিলেন। এতে এটাই পরিষ্কার, সিরাজকে হঠাবার যে চক্রান্ত সেটা পুরোপুরি ইংরেজদেরই ‘প্রকল্প’ (project)। এ-প্রকল্পের রূপায়ণের জন্য তারা যে-কোনও শক্তি বা গোষ্ঠীর সাহায্য নিতে প্রস্তুত— মুর্শিদাবাদ দরবারের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর ওপরই শুধুমাত্র তারা নির্ভর করে ছিল না। এদিকে যুদ্ধবিষয়ক কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা তখনই নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করতে চাইল, যদিও ক্লাইভ ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি তাঁর মত পরিবর্তন করলেন এবং পরের দিনই পলাশি অভিমুখে যাত্রা করবেন বলে স্থির করলেন। তখনও পর্যন্ত কিন্তু মীরজাফরের কাছ থেকে কোনও ইতিবাচক নির্দেশ বা সংকেত এসে পৌঁছয়নি।৮৬ এতেই স্পষ্ট যে বিপ্লব সংগঠিত করতে ইংরেজরা শুধু অস্থিরই নয়, খুব উদ্গ্রীব হয়ে পড়েছিল। ২২ জুন ভোরবেলা ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজবাহিনী পলাশি অভিমুখে অভিযান শুরু করল। কিন্তু সেদিনই, সম্ভবত যাত্রা শুরু করার আগে, ক্লাইভ আবার মীরজাফরকে তাঁর সঙ্গে যোগ দিতে ব্যাকুল হয়ে চিঠি লিখলেন:৮৭
যদিও আপনি নিজে কিছুই করছেন না, আপনার জন্য সর্বস্ব বিপন্ন করতে আমি স্থিরপ্রতিজ্ঞ। আজ সন্ধ্যার মধ্যেই আমি নদীর ওপারে পৌঁছে যাব। আপনি যদি পলাশিতে আমার সঙ্গে যোগ দেন তা হলে আমি মাঝপথ পর্যন্ত এগিয়ে আপনাদের সঙ্গে মিলিত হতে পারি…· আমি আপনাকে শুধু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এটার ওপর আপনার সম্মান ও নিরাপত্তা কতখানি নির্ভর করছে। আপনাকে আমি সম্পূর্ণভাবে আশ্বস্ত করছি যে এটা করলে আপনি তিন প্রদেশেরই [বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা] সুবাদার [নবাব] হবেন। কিন্তু আপনি যদি আমাদের সাহায্যার্থে এটুকুও না করেন তা হলে ভগবান আপনার সহায় হোন। আমাদের কিন্তু [পরে] বিন্দুমাত্র দোষ দিতে পারবেন না।
মীরজাফর যাতে ইংরেজদের সঙ্গে যোগ দেন তার জন্য একদিকে কী ধরনের প্রলোভন এবং অন্যদিকে যে প্রচ্ছন্ন ভীতিপ্রদর্শন করা হয়েছিল, তাঁর উৎকৃষ্ট নিদর্শন ওপরের চিঠিটি। শেষ পর্যন্ত ২২ জুন দুপুরের দিকে ক্লাইভের কাছে মীরজাফরের চিঠি এসে পৌছল এবং বিকেলেই ক্লাইভ পলাশি অভিমুখে অভিযান করার সিদ্ধান্ত মীরজাফরকে জানিয়ে দিলেন।
এদিকে নবাব সিরাজদ্দৌল্লার অবস্থা বেশ কাহিল। অস্থিরচিত্ত ও বিপদের সময় বিহ্বল হয়ে পড়াটা তাঁর স্বভাবের অন্তর্গত, তাঁর অন্যতম দুর্বলতা। অবশ্য এটা মনে না রাখলে তাঁর প্রতি অবিচারই করা হবে যে তখন কতগুলি ঘটনা তাঁকে বিভ্রান্ত করেছিল। এসময় তাঁর দৃঢ় সংকল্পের অভাব ও দোদুল্যমান মনোভাবের কতগুলি কারণও ছিল। ১৭৫৭ সালের প্রথম দিক থেকেই আহমদ শাহ আবদালির নেতৃত্বে বাংলায় আফগান আক্রমণের আশঙ্কা তাঁর কাছে এক বিরাট দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঠিক করে হোক বা ভুল করে হোক, তিনি ভেবেছিলেন ইংরেজদের চাইতে আফগানরাই তখন বড় বিপদ। তাই তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনীর সবচেয়ে দক্ষ অংশকে সম্ভাব্য আফগান আক্রমণ প্রতিহত করতে রাজা রামনারায়ণের নেতৃত্বে বিহার সীমান্তে পাঠিয়ে দেন। অন্যদিকে তাঁর দরবারে ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে ও ইংরেজদের সম্ভাব্য আক্রমণের আশঙ্কায় তিনি বিচলিত ও দিশেহারা হয়ে পড়েন। তাই সম্ভবত তিনি যারা তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে বলে সন্দেহ করছিলেন তাদের সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে ভয় পাচ্ছিলেন। হয়তো তখনও তাঁর আশা ছিল যে ইংরেজরা আক্রমণ করলে সঙঘবদ্ধভাবে তার মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
তবে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে সিরাজদ্দৌল্লা মীরজাফর ও তাঁর সঙ্গী অন্যান্য চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে কোনও চরম ব্যবস্থা না নিয়ে বিরাট ভুল করেছিলেন। এটা লিউক স্ক্র্যাফ্টন৮৮ এবং জাঁ ল’ও৮৯ স্পষ্ট ভাষাতে জানিয়েছেন। অথচ সিরাজের অনুগত সেনাপতিরা, বিশেষ করে মীরমর্দান, আব্দুল হাদি খান প্রমুখ তাঁকে বারংবার অনুরোধ ও সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে মীরজাফর ও তাঁর সঙ্গী ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে চরম ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে এবং তা নিলে ইংরেজরা আক্রমণ করতে কোনওমতেই সাহস করবে না।৯০ কিন্তু নবাব তাতে কর্ণপাতও করলেন না, তিনি সৈন্যবাহিনী নিয়ে পলাশিতে ইংরেজদের মুখোমুখি হলেন ২৩ জুন।
