পলাশির যুদ্ধক্ষেত্রে মীরজাফর, রায়দুর্লভ রাম ও ইয়ার লতিফ খানের নেতৃত্বে নবাবের সৈন্যবাহিনীর দুই-তৃতীয়াংশ একেবারে পুতুলের মতো নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সিয়রের লেখক গোলাম হোসেন লিখেছেন, মীরজাফর তাঁর অধীনস্থ সৈন্যবাহিনী নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, নিতান্ত দর্শক হয়ে, যেন মজা দেখতেই যুদ্ধে আসা।৯১ আর রিয়াজের লেখক বলছেন, মীরজাফর তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে নবাবের মূল বাহিনীর বাঁদিকে দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন—নবাব তাকে বারবার তাঁর দিকে আসার জন্য অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও তিনি একবিন্দু নড়লেন না।৯২ তা সত্ত্বেও কিন্তু পলাশির তথাকথিত যুদ্ধের হারজিত আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে যায়নি। ২৩ জুন সকালে যখন নবাবের সৈন্যবাহিনী তাঁবু থেকে বেরিয়ে সারিবদ্ধভাবে মাঠে দাঁড়াল তা দেখে স্ক্র্যাফ্টন হতবাক—’they made a most pompous and favourable appearance…. their disposition, as well as their regular manner in which they formed, seemed to speak greater skill in war than we expected from them’.৯৩
পলাশিতে নবাবের শিকারগৃহের ছাদ থেকে ক্লাইভ দৃশ্যটা দেখলেন। সকাল ৮টা নাগাদ (ক্লাইভের ভাষ্য অনুযায়ী ৬টায়) যুদ্ধ শুরু হল। ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও নবাবের সৈন্যবাহিনী তাঁর অনুগত ও দক্ষ সেনাপতি মোহনলাল, মীরমর্দান, খাজা আবদুল হাদি খান, নবসিং হাজারি প্রমুখের নেতৃত্বে ইংরেজদের সঙ্গে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর সাঁ ফ্রে’র অধীনে নবাবের গোলন্দাজ বাহিনীও ইংরেজদের ওপর ক্রমাগত গোলাবর্ষণ করে যাচ্ছিল। ব্যাপারটা ক্লাইভের কাছে খুব আশাপ্রদ মনে হল না। তিনি নাকি ষড়যন্ত্রকারীদের এক প্রতিনিধিকে বলেছিলেন যে, তাঁকে ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে নবাবের সৈন্যরা এবং সেনাপতিরা তাঁর ওপর বীতশ্রদ্ধ, তাই তারা ইংরেজদের বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ করবে না। কিন্তু এখন তো তিনি দেখছেন সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।৯৪ পলাশির যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী জন উড (John Wood) নামে এক ইংরেজ সৈনিক লিখেছেন যে সেদিন সারা সকাল ইংরেজদের অবস্থা ছিল হতাশাজনক এবং রাত হওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করছিল যাতে অন্ধকারে কলকাতা পালিয়ে যাওয়া যায়।৯৫ ইংরেজদের অবস্থা যে অত্যন্ত বিপজ্জনক ও খারাপ তা ওয়াটসের লেখা থেকেও স্পষ্ট ‘নবাব বা তাঁর সেনাপতিদের মধ্যে কেউ যদি ইংরেজদের অবস্থাটা ভাল করে অনুধাবন করতে পারত তা হলে তারা নিশ্চিতভাবে ইংরেজদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং ইংরেজ ফৌজকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করতে পারত। তা হলে ক্লাইভকে [কলকাতা পালাবার জন্য] রাত্রের অন্ধকারের জন্য অপেক্ষা করতে হত। ক্লাইভ আসলে তাই ভেবে রেখেছিলেন।’৯৬
যুদ্ধ চলতে লাগল। নবাবের সৈন্যবাহিনী তাঁর অনুগত সেনাপতিদের নেতৃত্বে অসম সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে পলাশির আম্রকুঞ্জে অবস্থানকারী ইংরেজ ফৌজের দিকে এগুতে লাগল। বেলা তখন প্রায় তিনটে। ফারসি ঐতিহাসিকদের ভাষ্য অনুযায়ী নবাবের জয় প্রায় সুনিশ্চিত হয়ে এসেছিল।৯৭ ঠিক এসময় দুর্ভাগ্যবশত হঠাৎ একটি গোলার আঘাতে মীরমর্দান গুরুতর আহত হয়ে পড়েন, তাঁকে নবাবের তাঁবুতে নিয়ে আসার পর তাঁর মৃত্যু হয়। এতেই যুদ্ধের মোড় একেবারে ঘুরে যায়। স্ক্র্যাফ্টন লিখেছেন: ‘আমাদের জয়ের একটি বিরাট কারণ যে আমাদের সৌভাগ্যক্রমে মীরমর্দান নিহত হন’।৯৮ মীরমর্দানের এই আকস্মিক মৃত্যুতে সিরাজদ্দৌল্লা দিক্বিদিক্ জ্ঞানশূন্য হয়ে মীরজাফরকে ডেকে পাঠান এবং তাঁর রাজকীয় মুকুট মীরজাফরের পায়ে রেখে তাঁর কাছে নিজের প্রাণ ও সম্মান বাঁচাবার জন্য ব্যাকুল আকুতি জানান। মীরজাফর নবাবকে পরামর্শ দিলেন ওইদিনের মতো যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে এবং পরের দিন সকালে তা শুরু করতে। খবরটা তিনি সঙ্গে সঙ্গে ক্লাইভকে জানিয়ে দিলেন। সিরাজদ্দৌল্লা দিশেহারা হয়ে রায়দুর্লভকে ডেকে পাঠালেন। তিনিও একই পরামর্শ দিলেন। সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত ও দিশেহারা হয়ে তরুণ নবাব মোহনলাল এবং অন্যান্য অনুগত সেনাপতিদের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসার নির্দেশ দিলেন। মীরমর্দানের মৃত্যুর পর মোহনলাল মূল সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সেনাপতিদের সকলেই প্রথমে নবাবের নির্দেশ মানতে অস্বীকার করলেন— এই যুক্তিতে যে ওই সময় পিছু হঠে আসা অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে। কিন্তু সিরাজের বারংবার ব্যাকুল অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে তাঁরা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন।৯৯ ইউসুফ আলি লিখেছেন, ওই সময় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাঁদের ওভাবে চলে আসার নির্দেশ দেওয়ার জন্য নবাবের অন্যতম সেনাপতি মীর মহম্মদ কাজিম বেশ রূঢ় ভাষায় নবাবকে ভর্ৎসনা করতেও দ্বিধা করেননি।১০০
সিরাজদ্দৌল্লার সৈন্যরা পেছন ফিরতেই ইংরেজরা তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তাতে নবাবের সৈন্যবাহিনী ছত্রখান হয়ে যায়। বিকেল ৫টার মধ্যেই পলাশির তথাকথিত যুদ্ধ শেষ। পলাশি যুদ্ধের সাক্ষী ইংরেজ সৈনিক জন উড যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে কোনওরকমের মুখোমুখি যুদ্ধ বা আক্রমণ ছাড়াই এমন একটি ‘great and decisive’ যুদ্ধের নিষ্পত্তি এবং তাঁর সঙ্গে একটি রাজ্যজয়ও হয়ে গেল।১০১ সন্ধ্যা ৬টায় ক্লাইভ মীরজাফরের অভিনন্দনসূচক বার্তা পেলেন— ‘আপনার পরিকল্পনা সফল হওয়ায় অভিনন্দন গ্রহণ করুন’।১০২ এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে মীরজাফর তখনও কিন্তু বলছেন ‘আপনার [অর্থাৎ ইংরেজদের] পরিকল্পনা।’ ক্লাইভ পরের দিনই (২৪ জুন) স্ক্র্যাফ্টন মারফত দাউদপুর থেকে মীরজাফরকে চিঠি পাঠালেন: ‘এ জয় আপনার। আমার নয়। অতি সত্বর আমার সঙ্গে মিলিত হলে খুশি হব। আপনাকে নিয়ে কালই মুর্শিদাবাদ যাত্রা করব। আশা করি আপনাকে নবাব বলে ঘোষণা করার সম্মান আমি পাব।’১০৩ ক্লাইভই মুর্শিদাবাদে মীরজাফরকে মসনদে বসিয়ে তাঁর মাথায় নবাবের মুকুট পরিয়ে দেন।
