এটা থেকেই স্পষ্ট যে ইংরেজরা কী পরিমাণ প্রলোভন এবং আশ্বাস দিয়ে মীরজাফরকে দলে টানার চেষ্টা করছিল। ক্লাইভের অস্থিরতাও বিন্দুমাত্র কম ছিল না। তাই তিনি ২২ মে ওয়াটসকে লিখছেন মীরজাফরকে জানাতে যে ‘তিনি যদি সিরাজকে হঠাতে সাহস করে স্থিরসংকল্প হন তা হলে ক্লাইভ শেষ পর্যন্ত তাঁর পাশে থাকবেন।’৭৮ পরের দিনই তিনি আবার ওয়াটসকে লিখছেন যে বর্ষা এগিয়ে আসছে এবং তা শুরু হয়ে গেলে বিপ্লব ঘটাবার এ-সুযোগ বরাবরের মতো হাতছাড়া হয়ে যাবে।৭৯ অর্থাৎ বিপ্লবের পরিকল্পনা যাতে তাড়াতাড়ি রূপায়িত করা যায় তার জন্য ক্লাইভের ছটফটানি।
এদিকে মীরজাফরের সঙ্গে কোনও চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়াতে ওয়াটস প্রায় ক্ষেপে যান। মীরজাফর পলাশি থেকে ফিরে ৩০ মে থেকে মুর্শিদাবাদে ছিলেন। তা সত্ত্বেও ওয়াটস মীরজাফরের সঙ্গে কোনও চুক্তি সম্পাদন করতে পারেননি। অনুমান, তার জন্য মীরজাফরের কিছুটা অনীহা। তাই অত্যন্ত বিরক্ত ও হতাশ হয়ে ওয়াটস ৩ জুন লিখছেন: ‘এসব অস্থিরচিত্ত, মিথ্যাচারী, মেরুদণ্ডহীন বদলোকের ওপর নির্ভর না করে আমরা নিজেরাই সবকিছু করলে পারতাম।’৮০ ব্যাপারটা নিয়ে লোকে বলাবলি করছে দেখে ক্লাইভও চিন্তিত হয়ে পড়েন। অবশেষে ওয়াটস ৫ জুন মীরজাফকে দিয়ে লাল ও সাদা কাগজে দুটি চুক্তি সই করাতে সক্ষম হলেন। লাল কাগজের চুক্তিটি, যাতে নবাবের কোষাগারের পাঁচ শতাংশ উমিচাঁদের প্রাপ্য বলে বলা হল সেটি নিছক প্রবঞ্চনামাত্র। এতে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের সই ক্লাইভের জ্ঞাতসারেই জাল করা হয়েছিল বলে যে সন্দেহ করা হয়, তা খুব অমূলক নয়।৮১ নবাব পদে উমিচাঁদের মনোনীত প্রার্থী ইয়ার লতিফকে বাদ দেওয়ার ফলে উমিচাঁদ নবাবের সম্পত্তির যে ভাগ চেয়েছিলেন, তা ফাঁকি দেওয়ার জন্যই ক্লাইভের এই চাতুরি। এদিকে রায়দুর্লভ সাদা কাগজের চুক্তি সম্বন্ধেও আপত্তি জানালেন এই বলে যে চুক্তির চাহিদা মেটাবার মতো অর্থ নবাবের কোষাগারে নেই। নবাবের সম্পদের পাঁচ শতাংশ তাকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁর মুখ বন্ধ করা হল।
চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পরেও কিন্তু সিলেক্ট কমিটি তাদের বিপ্লবের পরিকল্পনা তাড়াতাড়ি রূপায়ণের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। তাই কমিটি ১১ জুন বিস্তারিত আলোচনা করল, ‘তখনই সোজা মুর্শিদাবাদ অভিযান করা সমচিত হবে, না মীরজাফরের কাছ থেকে আরও বিস্তারিত খবর এবং কার্যোদ্ধারে কী ভাবে অগ্রসর হবে তার একটা খসড়া পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে’। কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব নিল যে ‘মীরজাফরকে মসনদে বসাবার যে পরিকল্পনা সেটা সম্পন্ন করার জন্য এর চেয়ে সুবর্ণ সুযোগ আর আসবে না’। কারণ আর দেরি করলেই সিরাজদ্দৌল্লা ষড়যন্ত্রের ব্যাপারটি জেনে ফেলতে পারেন। তখন মীরজাফরকে একেবারে সরিয়ে দেওয়া হবে এবং ফলে ‘আমাদের পুরো পরিকল্পনাই বানচাল হয়ে যাবে’। ইংরেজদের তখন ‘দেশের সংঘবদ্ধ শক্তির বিরুদ্ধে একাই লড়তে হবে’ আর তা হলে ইংরেজদের পরাজয় অনিবার্য।৮২ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্লাইভ ১৩ জুন মুর্শিদাবাদ অভিমুখে যাত্রা করলেন।
ক্লাইভ যখন মুর্শিদাবাদ অভিযান শুরু করেন তখনও পর্যন্ত কিন্তু মীরজাফরের কাছ থেকে শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া আর কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নিদর্শন পাওয়া যায়নি। তাঁর সঙ্গে মীরজাফরের সাক্ষাৎ পরিচয় ছিল না। ১৮ জুন তিনি কাটোয়া দখল করলেন। সেখানে ‘দারুণ অস্বস্তির মধ্যে’ দু’দিন কাটান। তিনি সিলেক্ট কমিটিকে জানালেন যে মীরজাফরের কাছ থেকে স্পষ্ট সংকেত না পেয়ে তিনি ‘খুবই উদ্বিগ্ন’। তিনি আরও লিখলেন যে, মীরজাফর ইংরেজদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করলেও যেভাবে তিনি সতর্কতার সঙ্গে এগোতে চাইছেন তাতে পুরো ব্যাপারটা ভেস্তে যাবার আশঙ্কা। এটাও তিনি জানালেন যে, মীরজাফর তাঁর সঙ্গে যোগ না দিলে তিনি নদী পেরোবেন না। বর্ষা পর্যন্ত ওখানে কাটিয়ে প্রয়োজন হলে মারাঠারা বা বীরভূমের রাজা বা এমন কী দিল্লির উজির গাজিউদ্দিন খান, কারও না কারও সঙ্গে সমঝোতা করে কার্যোদ্ধার করা যাবে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ক্লাইভ সিলেক্ট কমিটিকে লিখছেন যে, তাঁর ইচ্ছা খুব সতর্কতার সঙ্গে এগোনো যাতে ইংরেজ সৈন্যবাহিনীর কোনও বড় রকমের ক্ষতি না হয়। কারণ এ ফৌজ অক্ষত থাকলে আমাদের বর্তমান পরিকল্পনা সফল না হলেও ভবিষ্যতে যে কোনও সময় বিপ্লব সংগঠিত করার শক্তি আমাদের বজায় থাকবে।’৮৩
এ থেকে পরিষ্কার, মীরজাফর ও তাঁর সঙ্গীরা সিরাজদ্দৌল্লাকে মসনদ থেকে হঠাতে ইংরেজদের শেষ পর্যন্ত সাহায্য করতে এগিয়ে না এলেও, ইংরেজরা অন্য কারও সহায়তায় এ কাজ সম্পন্ন করতে দ্বিধাগ্রস্ত হত না এবং সেই অন্য কেউ দরবারের বিশিষ্ট অমাত্যরাই যে হবে তার কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না। ইংরেজদের পরিকল্পনা অনুযায়ী যে কেউ হলেই চলত। আসলে তখনও পর্যন্ত ক্লাইভ মীরজাফর সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হতে পারছিলেন না। তাই তিনি সিলেক্ট কমিটির কাছে জানতে চাইলেন, যদি মীরজাফর সাহায্য করতে এগিয়ে না আসেন তা হলে কী করা যাবে? তবে বিপ্লব ঘটাতে তিনি এতই উদ্গ্রীব ছিলেন যে মীরজাফরের ওপর আশা পুরোপুরি ছাড়তে পারেননি এবং তাকে ইংরেজ ফৌজের সঙ্গে যোগ দিতে বারবার প্ররোচিত করতে লাগলেন। কাটোয়া থেকে ১৯ জুনও তিনি মীরজাফরকে লিখলেন:৮৪
