ঈশ্বরের দোহাই, একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের এগুতে হবে…· মি. ওয়াটসকে এ-ব্যাপারে একটু ইঙ্গিত ও কিঞ্চিৎ উৎসাহ দিলেই তিনি একটি দল তৈরি করতে লেগে যাবেন…·. এমন ব্যবস্থা নেওয়া দরকার যাতে আমার প্রিয় পুরনো পরিকল্পনাটি [my old favourite scheme] সফল হতে পারে।
স্ক্র্যাফ্টন আবার ১৮ এপ্রিল ওয়ালসকে লিখছেন, ইয়ার লতিফ খানকে নতুন নবাব হিসেবে বসাবার প্রস্তাব দিয়ে, যেটা ওয়াটস ও উমিচাঁদ মিলে চেষ্টা করছিলেন।৬৯ ক্লাইভ ওয়াটসকে লেখা ২৬ এপ্রিলের চিঠিতে এ পরিকল্পনা সমর্থন করলেন। এদিকে ২৩ এপ্রিল ফোর্ট উইলিয়ামের সিলেক্ট কমিটিতে সিরাজদ্দৌল্লাকে সরিয়ে অন্য কাউকে নবাব করার প্রস্তাব সরকারিভাবে গৃহীত হল। আবার ওই একই দিনে ক্লাইভ সিলেক্ট কমিটিকে অনুরোধ জানালেন, স্ক্র্যাফ্টন যাতে মুর্শিদাবাদে থাকতে পারেন তাঁর অনুমতি দেবার জন্য কারণ ওখানে স্ক্র্যাফ্টনের ওপর কিছু জরুরি কাজের ভার দিতে হবে।৭০ এ কাজটা ‘যে দরবারের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাজিয়ে দেখা’ তা অনুমান করে সিলেক্ট কমিটি ক্লাইভের অনুরোধে রাজি হয়ে গেল। কমিটি ২৮ এপ্রিল সিদ্ধান্ত নিল, ক্লাইভ যেন ‘দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নবাবের প্রতি মনোভাব এবং এ নবাবকে সরিয়ে অন্য কাউকে মসনদে বসাবার পরিকল্পনায় তাদের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য উপযুক্ত লোককে নিয়োগ করেন’।৭১ সে অনুযায়ী ওয়াটস ও স্ক্রাফ্টন ‘ইংরেজদের পরিকল্পনায়’ দরবারের বিশিষ্ট অমাত্যবর্গের সমর্থন লাভের কাজে উঠে পড়ে লেগে গেলেন।
ইংরেজ কোম্পানির ঐতিহাসিক রবার্ট ওরম লিখেছেন যে নবাবের দরবারে অভিজাতবর্গের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষের পরিমাপ করতে ওয়াটস ও স্ক্র্যাফ্টন উমিচাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এর পরই উমিচাঁদ নবাবের উচ্চপদস্থ অমাত্যদের মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করে দেন।৭২ ফলে ২৩ এপ্রিল ইয়ার লতিফ খান ওয়াটসের সঙ্গে গোপন আলোচনায় বসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ওয়াটস তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে উমিচাঁদকে নবাবের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেনাপতির সঙ্গে কথা বলতে পাঠান। ইয়ার লতিফ উমিচাঁদের কাছে তাঁর নবাব হওয়ার বাসনা ব্যক্ত করেন এবং জানান যে রায়দুর্লভ ও জগৎশেঠরা তাঁকে সমর্থন করবেন। ওয়াটস এই প্রস্তাব সঙ্গে সঙ্গে লুফে নেন এবং ক্লাইভকে জানিয়ে দেন। ক্লাইভও তাঁর সম্মতি জানিয়ে দিলেন। এটা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে লতিফ সম্বন্ধে ক্লাইভের কোনও ধারণাই ছিল না। তাঁর সম্বন্ধে তিনি কিছুই জানতেন না, ইয়ার লতিফ হিন্দু না মুসলমান তা পর্যন্ত নয়। তাই এর ঠিক দু’দিন পরে (২৮ এপ্রিল) তিনি ওয়াটসকে লিখলেন: ‘লতিফ কেমন লোক আপনি ভাল করে খোঁজ নিন। উনি কি মুসলমান? ওঁকে মসনদে বসাবার যে পরিকল্পনা, আফগানরা এলে তা ভেস্তে যাবে না তো? লতির সঙ্গে আফগানদের যোগাযোগ আছে?’৭৩ এ থেকে স্পষ্ট যে ইংরেজরা বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটানোর জন্য এতই ব্যগ্র হয়ে পড়েছিল যে হাতের কাছে যাকে পাওয়া যায় তাকেই সিরাজের জায়গায় নবাব করতে চেয়েছিল। তিনি কেমন ব্যক্তি, ভাল কি মন্দ, তা নিয়ে তারা বিন্দুমাত্র মাথা ঘামায়নি।
এমনি সময় মসনদের জন্য আরেকজন প্রার্থী, মীরজাফর, রঙ্গমঞ্চে উপস্থিত হন। যদিও রবার্ট ওর ম বলছেন যে মীরজাফর কলকাতার আর্মানি বণিক খোজা পেক্রসের মাধ্যমে তাঁর প্রস্তাব ইংরেজদের কাছে পাঠান, ওয়াটস নিজে তাঁর পিতাকে পরে লিখেছিলেন যে তিনি ‘নিজেই মীরজাফরের সঙ্গে যোগাযোগ’ করেন। তিনি এটাও জানান যে মীরজাফর ‘খুব আগ্রহভরে আমার প্রস্তাবে সায় দেন এবং আমাদের সহায়তায় নবাব হওয়ার বিনিময়ে যে কোনও যুক্তিসঙ্গত শর্তাবলিতে স্বাক্ষর করতে রাজি হন’।৭৪ খুব সম্ভবত ইংরেজরা হয়তো বুঝতে পেরেছিল, শুধু ইয়ার লতিফের নাম দিয়ে তারা তাদের ‘কঠিন কার্যোদ্ধার’ করতে পারবে না। তাই তারা ইয়ার লতিফকে নবাব করার পূর্ব পরিকল্পনা বাতিল করে মীরজাফরকে মসনদে বসাবার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ মীরজাফর শুধু সবচেয়ে ক্ষমতাশালী সৈন্যাধ্যক্ষই নন, তাঁর পেছনে রয়েছে জগৎশেঠদের সক্রিয় সমর্থন।৭৫ কলকাতায় সিলেক্ট কমিটিও মীরজাফরকে নতুন নবাব করার সিদ্ধান্ত নিল এবং ওয়াটসকে মীরজাফরের সঙ্গে চুক্তির শর্তাবলি চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দিল।
কিন্তু ষড়যন্ত্রের তখনও অঙ্গুরাবস্থা এবং ইংরেজরা মীরজাফরের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারছিল না। মীরজাফরও তখন পর্যন্ত যড়যন্ত্রে পুরোপুরি সামিল হননি। তাই ক্লাইভ ২ মে ওয়াটসকে লিখছেন: ‘মীরজাফরকে যেন আশ্বস্ত করা হয় যে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, ইংরেজরা সিরাজদ্দৌল্লাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার মতো যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী এবং ক্লাইভ নিজে তাঁর একজন সৈন্যও জীবিত থাকতে মীরজাফরকে পরিত্যাগ করবেন না।’৭৬ এদিকে সিলেক্ট কমিটিও অস্থির হয়ে পড়েছিল এবং ১৭ মে স্ক্র্যাফ্টনকে নির্দেশ দেয় মীরজাফরের সঙ্গে একটি গোপন বৈঠক করে:
আমাদের পরিকল্পনাকে কী ভাবে রূপায়িত করা যায় তার একটা ছক তৈরি করতে, আমাদের দাবিগুলো যে এমন কিছু বেশি নয় তা তাকে ভাল করে বোঝাতে… এবং আমাদের কথার যে নড়চড় হয় না ও তাঁকে নবাব করতে যে আমরা বদ্ধপরিকর সে সম্বন্ধে তাকে নিশ্চিন্ত করতে।৭৭
