১৭৫০-র দশকের প্রথমদিকে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা যে নিদারুণ সংকটে পড়ে তা কোম্পানির ঐতিহাসিক রবার্ট ওরম৬০, কলকাতার এক ইংরেজ বাসিন্দা ক্যাপ্টেন ফেনউকের৬১ লেখা ও ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের আলাপ আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তা ছাড়াও ডাচ কোম্পানির নথিপত্রে বাংলায় আসা-যাওয়া করা জাহাজের যে তালিকা পাওয়া যায় তা থেকে আমাদের বক্তব্যের পরিসংখ্যানগত সাক্ষ্য মেলে। ১৭৫৪ সালে যেসব ইংরেজ জাহাজ বাংলার বন্দরে এসেছিল তাঁর মোট সংখ্যা ২০। এর মধ্যে ১২টি কোম্পানির নিজস্ব জাহাজ আর মাত্র ৮টি যারা ব্যক্তিগত ব্যবসা করত তাদের। অন্যদিকে ওই বছরই বাংলায় ফরাসি জাহাজ এসেছিল ২৭টি— তাঁর মধ্যে ২২টিই ব্যক্তিগত ব্যবসাতে লিপ্ত, আর মাত্র ৫টি ফরাসি কোম্পানির নিজস্ব জাহাজ। আবার টানেজের (tonnage) হিসেবে দেখা যাচ্ছে যে ১৭৫১ সালে ইংরেজ জাহাজের মোট টানেজ ছিল ৭৪২০ টন, তার মধ্যে ৫০২০ টন ছিল ব্যক্তিগত ব্যবসার আর ১৭৫৪-তে ফরাসি জাহাজের টানেজের পরিমাণ ছিল ১০,৪৫০ টন, এর মধ্যে ব্যক্তিগত ব্যবসায়ে লিপ্ত জাহাজের টানেজের পরিমাণ ৭৪৫০ টন।৬২ এই পরিসংখ্যান থেকেও এটা সুস্পষ্ট যে পঞ্চাশের দশকের প্রথমার্ধে ফরাসিদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের যে শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিল তার ফলে ইংরেজদের ব্যক্তিগত ব্যবসার যথেষ্ট ক্ষতি হয়।
সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার পরে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা আরও বেশি সংকটের মুখে পড়ে কারণ এই প্রথম তরুণ নবাব ইংরেজদের দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়ে দেন যে তিনি এই বেআইনি ব্যবসা বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর। কিন্তু কর্মচারীরা তাদের এই লাভজনক ব্যবসা ছাড়তে একেবারেই নারাজ ছিল। তাই তারা তাদের সংকটাপন্ন ব্যক্তিগত বাণিজ্য-স্বার্থকে পুনরুদ্ধার ও তার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য একদিকে বাংলা থেকে ফরাসিদের বিতাড়ন ও অন্যদিকে নবাব সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে অন্য কাউকে মসনদে বসাবার পরিকল্পনা করে। এজন্য রাজ্য জয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রয়োজন হয়েছিল এবং সেজন্যই পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব। তাতে কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যের সংকট দূর করা সম্ভব হবে তা শুধু নয়— উৎপাদনক্ষেত্র থেকে সরবরাহ, বাজার-হাট, ব্যবসায়ী-সওদাগর, তাঁতি ও অন্যান্য কারিগরদের ওপর সার্বিক নিয়ন্ত্রণও নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধি পাবে। একথা শুধু যে পশ্চাৎ-সমীক্ষাতে (hindsight) ধরা পড়েছে তা নয়। কোম্পানির লেখা ও কাজকর্মের মধ্যে তা প্রকাশ পেয়েছে। কর্নেল স্কটের (Colonel Scott) বাংলা বিজয়ের পরিকল্পনা (১৭৫২), ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ও ম্যানিংহামের (Frankland and Manningham) ক্লাইভকে লেখা চিঠি (১৭৫৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর, যাতে কর্মচারীদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের ক্রমাবনতির কথা করুণভাবে প্রকাশ পেয়েছে), কোম্পানির পণ্য সরবরাহে দাদনি থেকে গোমস্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন (১৭৫৩), নবাবের প্রতি ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল ও গভর্নর ড্রেকের অনমনীয় ও মারমুখো মনোভাব—এসবই ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের যে অভিপ্রায় তার নির্দেশক। মীরজাফরের সঙ্গে চুক্তির শর্তাবলী কী হবে তা কলকাতার সিলেক্ট কমিটির বৈঠকে আলোচনার সময় রিচার্ড বেচার (Richard Becher) জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা চুক্তির শর্তাবলিতে রাখতেই হবে কারণ ‘তারাই পুরো ব্যাপারটা [নবাব সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে মীরজাফরকে মসনদে বসানোর পরিকল্পনা] চালু করেছিল’।৬৩ এসব থেকে ইংরেজদের অভিপ্রায় সম্বন্ধে সন্দেহের কোনও অবকাশ থাকে না।
.
পলাশি চক্রান্তে ইংরেজদের ভূমিকা
পলাশি-প্রাক্কালের ঘটনাবলি এবং আমাদের কাছে এখন যেসব নতুন তথ্যপ্রমাণ আছে তার সূক্ষ্ম ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করে দেখানো যাবে যে ইংরেজরাই পলাশির মূল ষড়যন্ত্রকারী। সিরাজদ্দৌল্লা কলকাতা দখল করে (জুন ১৭৫৬) ইংরেজদের তাড়িয়ে দেবার পর ফোর্ট সেন্ট জর্জ (মাদ্রাজ) কাউন্সিল ক্লাইভ ও ওয়াটসনের নেতৃত্বে অভিযাত্রী সৈন্যদলকে বাংলায় পাঠায়। কাউন্সিল তাঁদের যে নির্দেশ দেয় (১৩ অক্টোবর ১৭৫৬) তার মধ্যেই পলাশি চক্রান্তের বীজ নিহিত ছিল বললে খুব একটা অত্যুক্তি হবে না। এ নির্দেশে বলা হয়েছে, ‘কলকাতা পুনরুদ্ধার এবং নবাবের কাছ থেকে যথেষ্ট পরিমাণ ক্ষতিপূরণ আদায়ই’ শুধু অভিযাত্রী দলের উদ্দিষ্ট হবে না। তাদের চেষ্টা করতে হবে ‘to effect a junction with any powers in the province of Bengal that might be dissatisfied with the violence of the nawab’s gov-ernment or that might have pretensions to the nawabship’.৬৪ শেষদিকের অংশটুকুর তাৎপর্য বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। বলা বাহুল্য, এতেই ষড়যন্ত্রের সদর দরজা উন্মুক্ত হয়ে যায়। আর দরবারের মধ্যে যে অসন্তোষ ছিল তা দিয়েই, ক্লাইভের ভাষায়, ‘ইংরেজরা রাজনীতির দাবাখেলায় বাজিমাৎ’ করেছিল৬৫ এবং এভাবেই তারা ষড়যন্ত্র পাকা করে পলাশিতে সিরাজদ্দৌল্লার পতন ঘটিয়েছিল।
নবাবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বা অসন্তোষ ষড়যন্ত্রের উপযুক্ত পরিমণ্ডল তৈরি করতে পারে ঠিকই কিন্তু ষড়যন্ত্র দানা বাঁধার পক্ষে এবং তা সফল করতে আরও পর্যাপ্ত কারণের প্রয়োজন ছিল। সেজন্যই দরবারের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী সম্বন্ধে সঠিক ধারণা করা ইংরেজদের পক্ষে জরুরি হয়ে পড়েছিল। অংশত তার জন্যই ইংরেজরা হুগলি আক্রমণ করে (৯ জানুয়ারি ১৭৫৭)। ফোর্ট উইলিয়ামের চিঠি (৩১ জানুয়ারি) থেকে তা সুস্পষ্ট।৬৬ ১৭৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে যখন ইংরেজরা চন্দননগর অবরোধ নিয়ে ব্যস্ত, তখনও ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিলের সিলেক্ট কমিটি কাশিমবাজারে উইলিয়াম ওয়াটসকে নির্দেশ দিচ্ছে, ‘জগৎশেঠ পরিবার আমাদের পক্ষ যাতে সমর্থন করে তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা’ চালিয়ে যেতে।৬৭ ইংরেজরা যে দরবারের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর সাহায্য নিয়ে বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটাতে শুধু আগ্রহী নয়, ব্যস্ত হয়েও পড়েছিল তা ক্লাইভের বিশ্বস্ত অনুচর জন ওয়ালসকে (John Walsh) লেখা স্ক্র্যাফ্টনের ৯ এপ্রিলের চিঠিতে সুস্পষ্ট। তিনি লিখছেন:৬৮
