ওপরের সব তথ্য বিচার করে এ সিদ্ধান্ত করা ভুল হবে না যে পলাশির প্রাক্কালে বাংলার সমাজ হিন্দু-মুসলমান এই সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে সোজাসুজি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েনি।
.
পলাশি কার চক্রান্ত?
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, পলাশি চক্রান্তের মূল নায়ক কে বা কারা? মীরজাফরই শুধু বিশ্বাসঘাতক বলে জনমানসে এখনও যে ধারণা বহুল প্রচারিত, তা ঐতিহাসিকভাবে কতটা সত্য? পলাশি কি শুধু ভারতীয়দেরই ষড়যন্ত্র, এতে ইংরেজদের কি কোনও ভূমিকা ছিল না? এখানে অবশ্য বলে নেওয়া প্রয়োজন যে মীরজাফর, জগৎশেঠ প্রমুখ শেষ পর্যন্ত পলাশির ষড়যন্ত্রে সামিল হয়েছিলেন এবং নবাবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। কিন্তু আমাদের হাতে এমন তথ্যপ্রমাণ আছে যা থেকে স্বচ্ছন্দে বলা যায় যে পলাশি চক্রান্তের মূল নায়ক ইংরেজরাই, সিরাজদ্দৌল্লাকে সরিয়ে অন্য কাউকে মসনদে বসাবার পরিকল্পনায় তারাই সবচেয়ে বেশি উদ্যোগ নিয়েছিল এবং তারাই দরবারের চক্রান্তকারীদের উৎসাহ জুগিয়েছিল। শুধু তাই নয়, পলাশি যুদ্ধের আগের দিন পর্যন্ত তারা স্থানীয় ষড়যন্ত্রীদের নানা প্রলোভন ও প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে যাতে দরবারের ওইসব অভিজাতবর্গ শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকে। আমাদের এ-বক্তব্যকে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের দোষস্খালনের প্রচেষ্টা হিসেবে ধরে নেওয়া ভুল হবে। মুর্শিদাবাদ দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ তরুণ নবাব সিরাজদ্দৌল্লার প্রতি বিরূপ হয়ে একটা চক্রান্ত করছিল, এটা আমরা অস্বীকার করছি না। কিন্তু যে বক্তব্যে আমরা জোর দিচ্ছি তা হল, ইংরেজদের নেতৃত্বেই পলাশি চক্রান্ত পূর্ণ অবয়ব পেয়েছিল এবং খুব সম্ভবত, ইংরেজদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এ ষড়যন্ত্র পূর্ণ রূপ নিয়ে নবাবের পতন ঘটাতে পারত না। ইংরেজ কোম্পানির নথিপত্র ও কোম্পানির কর্মচারীদের লেখা থেকেই আমরা সেটা পরে দেখাব— তা থেকে স্পষ্ট হবে কী ভাবে ইংরেজরা পরিকল্পিতভাবে সমস্ত ব্যাপারটা সংগঠিত করেছিল।
পলাশির ষড়যন্ত্রে মুর্শিদাবাদ দরবারের অভিজাতবর্গের মধ্যে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন মীরজাফর ও জগৎশেঠ, যদিও উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ প্রমুখও এতে জড়িত ছিলেন। তাই মীরজাফরই একমাত্র ‘বিশ্বাসঘাতক’, এটা সত্য নয়। জগৎশেঠের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজরা প্রথমে সিরাজদ্দৌল্লার জায়গায় নবাব হিসেবে ইয়ার লতিফ খানকে বসাবার মতলব করেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জগৎশেঠদের মনোনীত প্রার্থী মীরজাফরের দিকে ঝুঁকল কারণ তারা জানত জগৎশেঠদের সাহায্য ছাড়া বাংলায় কোনও রাজনৈতিক পালাবদল সম্ভব নয়। কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’ (Jean Law), যিনি দরবারের নাড়ি-নক্ষত্রের খবর রাখতেন, পরিষ্কার লিখেছেন যে ‘ইংরেজরা যা করেছে [পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব] তা জগৎশেঠদের সমর্থন ছাড়া তারা করতে কখনও ভরসা পেত না’।৫৫ সুতরাং দেখা যাচ্ছে বিশ্বাসঘাতকার দায় শুধু মীরজাফরের নয়— জগৎশেঠদের দায় মীরজাফরের চাইতে বেশি বই কম নয়।
আসলে ইতিহাস পরিক্রমায় একটু পেছিয়ে গেলেই দেখা যাবে যে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার সব কটা রাজনৈতিক পালাবদলে জগৎশেঠরাই মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। ওই সময়কার রাজনীতিতে পটপরিবর্তনের চাবিকাঠি ছিল জগৎশেঠদেরই হাতে। জাঁ ল’ লিখেছেন: ‘অনেকদিন ধরে বাংলায় যেসব রাজনৈতিক বিপ্লব হয়েছে তার প্রধান হোতা ছিলেন তাঁরাই [জগৎশেঠরা]।’৫৬ ক্লাইভের লেখা চিঠিপত্র পড়েও সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে পলাশি চক্রান্তের পেছনে ইংরেজরা সবচেয়ে বেশি মদত পেয়েছিল জগৎশেঠদের কাছ থেকে।৫৭ তবে এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, জাঁ ল’ মন্তব্য করেছেন যে ‘মোহনলাল যদি সুস্থ থাকতেন এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা-রহিত না হতেন, তা হলে জগৎশেঠদের চক্রান্ত অত সহজে সফল হত না। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, মোহনলাল কিছুদিন ধরে এবং বিশেষ করে চরম বিপদের এই মুহূর্তে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন’। ল’ মনে করতেন যে মোহনলাল জগৎশেঠদের পরম শত্রু এবং তাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারার মতো একমাত্র ব্যক্তি।৫৮ মুজাফ্ফরনামার লেখক করম আলির সন্দেহ, মোহনলালকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল।৫৯
.
কেন এই চক্রান্ত?
যদিও ইংরেজরা পলাশি চক্রান্ত ও বিপ্লবে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল, যে প্রশ্ন আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন এবং যা এখনও পর্যন্ত কেউ করেননি৬০ তা হল এ চক্রান্ত ও বিপ্লব ইংরেজদের পক্ষে এত জরুরি হয়ে পড়েছিল কেন? তার প্রধান কারণ কোম্পানির কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করা। সমসাময়িক নথিপত্র ও দলিলদস্তাবেজ পরীক্ষা করে দেখলে বাংলা বিজয় সম্বন্ধে কোম্পানির কর্মচারীদের মধ্যে একটা স্পষ্ট মতলব ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেখা যাবে। এসব কর্মচারীরা সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে এদেশে আসত একটি মাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে— ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে রাতারাতি প্রচুর ধনোপার্জন করে দেশে ফিরে সুখস্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে বাকি জীবন অতিবাহিত করা। বাংলায় কর্মচারীদের এই ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যের রমরমা ছিল ১৭৩০-র দশক ও ’৪০-র দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। তারপরে ৪০-র দশকের শেষদিক থেকে ৫০-র দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এ ব্যবসা-বাণিজ্য চরম সংকটের মধ্যে পড়ে। এর কারণ একদিকে ফরাসিদের ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যে এসময় অভাবনীয় উন্নতি এবং অন্যদিকে হুগলির আর্মানি বণিক খোজা ওয়াজিদের সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিস্তার। ফরাসিদের সঙ্গে আবার ওয়াজিদের বোঝাপড়া থাকার ফলে ইংরেজরা খুব অসুবিধের মধ্যে পড়ে যায় এবং তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্য বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীরা তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থেই বাংলা বিজয় করতে চেয়েছিল এবং সেজন্যই পলাশির চক্রান্ত ও বিপ্লব ইংরেজদের পক্ষে জরুরি হয়ে পড়েছিল।
