পরিশেষে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বাংলার দ্বিধাবিভক্ত সমাজ। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে অনেক ইউরোপীয়ই বাংলা বিজয়ের স্বপ্ন দেখছিল এবং এ জয় অনায়াসলভ্য বলে মনে করত।৪৮ সুতরাং বাংলা বিজয় যেখানে মুখ্য উদ্দেশ্য, তখন সে অবাধ বিজয়ের যাথার্থ্য প্রমাণে যদি তারা বাংলার দ্বিধাবিভক্ত সমাজের চেহারা খুঁজে বার করতে ব্যগ্র হয়, তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এ প্রেক্ষিতে প্রাক-পলাশি সময়ে সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে বাংলার সমাজ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল বলে যে বক্তব্য তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে হয়। এ প্রসঙ্গে যেটা মনে রাখা প্রয়োজন তা হল, পলাশি শুধু হিন্দুদের দ্বারা সংগঠিত বিপ্লব নয়— হিন্দুরাই শুধু মুসলমান নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেনি। হিন্দু-মুসলমান-জৈন-আর্মানি সব সম্প্রদায়ের লোকই এতে লিপ্ত হয়েছিল। তবে পলাশি বিপ্লব মূলত ইংরেজদের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফল, যাতে তারা শাসকশ্রেণির একটি শক্তিশালী অংশকে— যার মধ্যে হিন্দু যেমন ছিল, তেমনি মুসলমানও— সামিল করতে পেরেছিল। বস্তুতপক্ষে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলায় আরও দুটি বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল— ১৭২৭ এবং ১৭৩৯/৪০ সালে, যখন শাসকগোষ্ঠীর দুই সম্প্রদায়েরই অভিজাতবর্গ নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থানুযায়ী ও অভিপ্রায় অনুসারে নবাবের পক্ষে বা বিপক্ষে অংশগ্রহণ করেছিল, সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে নয়। সুতরাং এ দুটি বিপ্লবের সময় যদি সমাজের দ্বিধাবিভক্ত রূপের কোনও প্রশ্ন না উঠে থাকে, তা হলে ১৭৫৬/৫৭ সালেও সে প্রশ্নের অবতারণা অবান্তর।
পলাশির প্রাক্কালে বাংলার সমাজ যদি সত্যিই দ্বিধাবিভক্ত হত, তা হলে সমসাময়িক সাহিত্য ও ফারসি ইতিহাস গ্রন্থে তা অবশ্যই প্রতিফলিত হত। কিন্তু সেরকম কোনও নির্দিষ্ট ইঙ্গিত তখনকার সাহিত্য বা ইতিহাসবেত্তার লেখায় দেখা যায় না। সমাজের উঁচুতলায় কিছুটা টানাপোড়েন নিশ্চয় থাকতে পারে, শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা দখলের লড়াই চলতেই পারে কিন্তু সেগুলি হিন্দু-মুসলমান এই বিভেদমূলক চেতনা থেকে উদ্ভূত নয়। তার মূল শ্রেণিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের সংঘাত। বাংলায় এই দুই সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষ বহুদিন ধরে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মধ্যে পাশাপাশি বাস করে এসেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই দুই ধর্ম ও সংস্কৃতির সমন্বয়ের যে প্রক্রিয়া অনেকদিন ধরে চলে আসছিল, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে তার পরিপূর্ণ রূপ দেখা যায়। এ সময় মুসলমানরা হিন্দু মন্দিরে পুজো দিচ্ছে আর হিন্দুরা মুসলমানদের দরগাতে ‘সিন্নি’ দিচ্ছে— এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। এই দুই ধর্ম সংস্কৃতির সমন্বয় প্রচেষ্টা থেকেই সত্যপীরের মতো নতুন ‘দেবতা’র সৃষ্টি- যে ‘দেবতা’ দুই সম্প্রদায়ের মানুষেরই পূজ্য। কবি ভারতচন্দ্রের ‘সত্যপীর’ কবিতা এ মিলন প্রক্রিয়ার প্রকৃষ্ট প্রতিফলন।৪৯ এডওয়ার্ড সি ডিমক (Edward C. Dimmock, Jr) একটি সুচিন্তিত প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে মধ্যযুগের (পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত) বাংলা সাহিত্য পড়ে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পরের প্রতি কোনওরকম ‘গভীর বিদ্বেষের’ পরিচয় পাওয়া দুষ্কর।৫০ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহিষ্ণুতা ও বোঝাপড়ার চমৎকার নিদর্শন অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে কবি ফৈজুল্লার ‘সত্যপীর’ কবিতা, যেখানে ‘যে রাম সেই রহিম’ এমন অভিব্যক্তি সোচ্চার।৫১ সুতরাং দেখা যাচ্ছে বাংলা সাহিত্য থেকে যেসব তথ্য পাওয়া যায়, তাতে বাঙালি সমাজের দ্বিধাবিভক্ত রূপের কোনও পরিচয় মেলে না।
তা ছাড়া এটা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে আলিবর্দি তথা সিরাজদ্দৌল্লার সময় অধিকাংশ উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও জমিদার হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও প্রাক্-পলাশি বাঙালি সমাজের দ্বিধাবিভক্ত রূপের কথা বলা হয়। লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরি ও হল্যান্ডের হেগ শহরের রাজকীয় মহাফেজখানায় (Algemeen Rijksarchief) ঠিক পলাশির আগে বাংলার উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও জমিদারদের দুটি তালিকা আমি পেয়েছি। প্রথমটিতে (রবার্ট ওরম-এর তালিকা) দেখা যাচ্ছে আলিবর্দির সময় (১৭৫৪-তে) দেওয়ান, ‘তান-দেওয়ান’, ‘সাব দেওয়ান’, বক্সি প্রভৃতি সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পদের মধ্যে ছয়টিই হিন্দুদের দখলে, একমাত্র মুসলমান বক্সি হল মীরজাফর। আবার ১৯ জন জমিদার ও রাজার মধ্যে ১৮ জনই হিন্দু।৫২ দ্বিতীয় তালিকাটি বাংলায় ওলন্দাজ কোম্পানির প্রধান ইয়ান কারসেবুমের (Jan Kerseboom)। সেই তালিকাতেও নায়েব দেওয়ান রায় রায়ান উমিদ রায়ের নেতৃত্বে হিন্দুদের একচ্ছত্র প্রাধান্য।৫৩ ১৭৫৪/৫৫ সালের এই যে চিত্র, সিরাজদ্দৌল্লার সময় তা আরও স্পষ্ট হয়। তরুণ নবাবের ডানহাত ও সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসভাজন ছিলেন মোহনলাল। বস্তুতপক্ষে, অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি রাজ্যের প্রশাসনিক শাসনযন্ত্রে হিন্দুপ্রাধান্য এত বেশি ছিল যে তা দেখে রবার্ট ওরম মন্তব্য করেন:৫৪
The Gentoo (Hindu) connection became the most opulent influence in his [Alivardi’s] government of which it pervaded every department with such efficacy that nothing of moment could move without their participation or knowledge.
