.
সিরাজদ্দৌল্লার চরিত্র
ইতিহাসের গল্পকথায় শুধু নয়, মননশীল লেখকদের ভাষ্যেও সিরাজদ্দৌল্লা দুশ্চরিত্র, নির্মম, নিষ্ঠুর ও লম্পট। সন্দেহ নেই, সমসাময়িক বিদেশি পর্যবেক্ষক ও ফারসি ইতিহাসেও এমন বর্ণনাই আছে। কিন্তু আমাদের বক্তব্য, ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজের সংঘর্ষের কারণ খুঁজতে গিয়ে বা পলাশি চক্রান্তের স্বরূপ উদঘাটনে নবাব হওয়ার আগে সিরাজ চরিত্রের এই ‘অন্ধকার’ দিকটা খুঁটিয়ে দেখার খুব একটা প্রয়োজন নেই। তবু তর্কের খাতিরে ওটা প্রয়োজনীয় বলে যদি ধরেও নেওয়া যায়, তা হলে সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে রাখতে বাংলার প্রায় সব নবাবই একই চরিত্রদোষে দোষী—দুশ্চরিত্র আর নিষ্ঠুর কেউ কম ছিলেন না। তা হলে শুধু সিরাজদ্দৌল্লাকেই ‘দুশ্চরিত্রের’ জন্য দোষী করার প্রচেষ্টা কেন? মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত বাংলার সব নবাবই নিষ্ঠুরতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। সুজাউদ্দিন ও সরফরাজ দু’জনেই দুশ্চরিত্র ছিলেন। সেক্ষেত্রে সিরাজদ্দৌল্লার প্রতিই কেন শুধু এ অপবাদ? এটাকে পলাশির ষড়যন্ত্র ও ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের যথার্থতা প্রমাণ করার জন্য উদ্দেশ্যমূলক প্রচার বলে সন্দেহ করা কি খুবই অমূলক?
আমাদের এ বক্তব্যকে কিন্তু সিরাজ চরিত্রের দোষস্খালনের প্রচেষ্টা হিসেবে ভুল বোঝার অবকাশ নেই। নবাব হওয়ার আগে দুশ্চরিত্রের অপবাদ সিরাজকে দেওয়া যায় না বা নবাব হিসেবে সিরাজ খুব মহান ছিলেন এটা মোটেই আমাদের বক্তব্য নয়। আমাদের যুক্তি অন্যত্র। আমাদের প্রশ্ন— নবাব হওয়ার পরেও কি সিরাজ আগের সেই চরিত্রের লোক ছিলেন? তার মধ্যে কি কোনও পরিবর্তন এসেছিল বা তার কি চৈতন্যোদয় হয়েছিল? নবাব হওয়ার পরেও কি তিনি আগের মতো উদ্ধত, দুশ্চরিত্র, নিষ্ঠুর আর নির্মম ছিলেন? ইতিহাসে এর সোজাসুজি সাক্ষ্যপ্রমাণ তেমন কিছু নেই। তবু এখানে ওখানে ছোটখাট কিছু তথ্য, কিছু ইঙ্গিত থেকে একটা ধারণা আমরা করতে পারি। তা ছাড়া নবাব হিসেবে (যদিও স্বল্প সময়ের জন্য—পনেরো মাসেরও কম) সিরাজদ্দৌল্লার আচরণ ও কাজকর্ম বিশ্লেষণ করেও আমরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারি। এখানে একটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তথ্য আমাদের মনে রাখতে হবে। সিরাজ চরিত্রের যে কদর্য দিকটার দিকে সবাই অঙ্গুলি সংকেত করছেন, তা কিন্তু মুখ্যত সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার আগের চরিত্র (জাঁ ল’ স্পষ্ট বলেছেন ‘Before the death of Alivardi Khan’)। নবাব হওয়ার পরে সিরাজ চরিত্রের এ ‘অন্ধকার’ দিকটার সোজাসুজি কোনও তথ্য বা প্রমাণ কিন্তু অপ্রতুল। এর কারণ সম্ভবত নবাব হওয়ার পরে সিরাজদ্দৌল্লার স্বভাব এবং আচরণের পরিবর্তন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সাম্প্রতিক লেখাতেও সিরাজদ্দৌল্লাকে ‘জেদী’, ‘একরোখা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, তাঁর ‘মেজাজি রাগিস্বভাবের’ ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।১১ লব্ধপ্রতিষ্ঠ এক ঐতিহাসিক আবার সিরাজদ্দৌল্লার ‘নিষ্ঠুরতা, উচ্ছৃঙ্খলতা ও উন্মাদ স্বভাবের’ গল্পকে ‘পরাজিতের মরণোত্তর পুরস্কার’ বলে উল্লেখ করেও সত্য ঘটনা কী তা এড়িয়ে বলছেন ‘সত্য যাই হোক না কেন, সিরাজদ্দৌল্লা মোটেই আলিবর্দির যোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন না।’১২ নবাব হওয়ার পরে সিরাজের চরিত্রে যে একটা বিরাট পরিবর্তন হয়েছিল তা আমরা ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারী লিউক স্ক্র্যাফ্টনের (Luke Scrafton) লেখা থেকে জানতে পারি। তিনি লিখেছেন, ‘আলিবর্দির মৃত্যুশয্যায় সিরাজ কোরান ছুঁয়ে শপথ করেন যে তিনি জীবনে আর কোনওদিন মদ্যস্পর্শ করবেন না, সে শপথ তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন।’১৩ অথচ এই স্ক্র্যাফ্টনই আগে সিরাজকে ‘অতিরিক্ত পানাসক্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন। সিরাজ-চরিত্রে এ পরিবর্তন খুবই অর্থবহ কারণ যে যুবক অত্যধিক মদ্যপানে অভ্যস্ত তিনি যে এত সহজে দীর্ঘদিনের বদভ্যাস পরিত্যাগ করতে পারলেন এবং মৃত্যুপথযাত্রী মাতামহকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আজীবন রক্ষা করেছেন, তাঁর পক্ষে ইচ্ছে করলে নিজের স্বভাবচরিত্র সংশোধন ও পরিবর্তন করতে পারা অত্যাশ্চর্য কিছু নয়। ওই কারণে মনে হয় নবাব হওয়ার আগে সিরাজের চরিত্র যেমনই থাকুক না কেন, রাজ্যভার গ্রহণ করার পর তাঁর চরিত্রে পরিবর্তন একেবারে অসম্ভব কিছু নয়।
এমন পরিবর্তন যে অসম্ভব নয় (যদিও নাটকীয় হতে পারে) এবং তার যে সম্ভাবনাও ছিল সেটা আমাদের জানাচ্ছেন জাঁ ল’, যিনি-ই প্রধানত সিরাজচরিত্রের কদর্য রূপটি তুলে ধরেছেন। তাঁর নিম্নোক্ত বক্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ: ‘People have flattered themselves that when he (Siraj] became Nawab he would be more humane.’ তিনি নিজেও অবশ্য আশা করেছিলেন যে হয়তো “সিরাজ একদিন [নবাব হওয়ার পরে?] সজ্জনে পরিণত হতে পারেন।’ তাঁর ওরকম বিশ্বাসের কারণও ছিল যার জন্য তিনি লিখেছেন, ‘[ঢাকার] তরুণ নবাব নওয়াজিস মহম্মদ খান১৪ সিরাজের চেয়ে কম দুশ্চরিত্র ও উচ্ছৃঙ্খল ছিলেন না কিন্তু পরে তিনি সর্বজনপ্রিয় হয়ে ওঠেন’।১৫
এবার নবাব হওয়ার পর সিরাজদ্দৌল্লার আচরণ বিশ্লেষণ করা যাক। জাঁ ল’র লেখা থেকেই স্পষ্ট যে তিনি ফরাসিদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্নই ছিলেন। ফরাসিদের প্রতি কোনও নিষ্ঠুরতা বা উদগ্র রাগ তিনি দেখাননি। তাঁর দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং মসনদের দাবিদার, ঘসেটি বেগম ও শওকত জঙ্গের প্রতি তিনি কেমন আচরণ করেছিলেন? নবাব হওয়ার আগে তাঁর যে চরিত্র আমরা দেখেছি, তার সঙ্গে মিলে যায় এমন হঠকারিতা বা অবিবেচনাপ্রসূত কিছু কি তিনি করেছিলেন? এর উত্তর কিন্তু একদম ‘না’। তিনি তাঁর প্রথম শত্রু ঘসেটি বেগমকে (যিনি সিরাজকে নবাব হিসেবে একেবারে চাননি এবং সিরাজ যাতে নবাব হতে না পারেন তাঁর জন্য যথাসাধ্য চক্রান্ত করছিলেন) যেভাবে ‘বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্তির সঙ্গে বাগ মানিয়েছিলেন’ তা তারিখ-ই-বংগালা-ই-মবহতজঙ্গীর লেখক ইউসুফ আলি খানও তারিফ না করে পারেননি। তিনি লিখছেন যে বহুলোক, যারা আগে ঘসেটি বেগমকে সমর্থন করছিল, তারা সিরাজের ‘আপোষমূলক নীতি ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটাবার প্রচেষ্টায়’ সন্তুষ্ট হয়ে বেগমের দল ছেড়ে সিরাজের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। শওকত জঙ্গ অবশ্য আরও অনেক শক্তিশালী ও বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বী। তাই নিজের তখ্ত বজায় রাখতে সিরাজ তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে বাধ্য হন ও তাঁকে পর্যুদস্ত করেন।
