ইংরেজদের সঙ্গেও কিন্তু সিরাজদ্দৌল্লা প্রথমে শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেছেন। পরে একদিকে দৌত্যের মাধ্যমে ও অন্যদিকে অস্ত্রধারণ করে একটা মিটমাট করতে চেয়েছিলেন। একুশ বাইশ বছরের তরুণ এক নবাবের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি জ্ঞানবুদ্ধি আর কী আশা করা যেতে পারে? কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির অধ্যক্ষ উইলিয়াম ওয়াটস, যিনি মুর্শিদাবাদ দরবারের হাঁড়ির খবর পর্যন্ত রাখতেন, সিরাজদ্দৌল্লাকে ‘ক্ষমতা এবং ধনসম্পত্তির প্রাচুর্যে কিঞ্চিৎ বেসামাল’, বলে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা হয়তো সত্যের অনেকটা কাছাকাছি। কিন্তু পনেরো মাসের স্বল্প রাজত্বকালে সিরাজ কোনও পাগলামি, অর্বাচীনতা বা নিষ্ঠুরতার পরিচয় যে দেননি, ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজ থেকে তা নিঃসন্দেহে প্রমাণ করা যায়। পাশাপাশি এটাও সত্য যে সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হিসেবে, দেশের শাসক হিসেবে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করেছেন। এদেশে ব্যবসা করতে এসে নবাবের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার মতো কোনও ঔদ্ধত্যকে তিনি সহ্য করতে রাজি ছিলেন না। ওয়াটসের মতে সিরাজদ্দৌল্লা বিদেশি বণিকগোষ্ঠীর কাছে প্রত্যাশা করেছিলেন যে তারা নবাবের আদেশ বিনা দ্বিধায় মেনে নেবে। কিন্তু তা বলে সিরাজ সর্বক্ষণ ‘যুদ্ধং দেহি’ মনোভাব দেখিয়েছেন, এমন কথা ঠিক নয়। যে তরুণ যুবা ‘উগ্র মেজাজ’ এবং ‘নির্মম নিষ্ঠুরতার’ জন্য কুখ্যাত, তিনি কিন্তু নবাব হওয়ার পরে কাশিমবাজারের ইংরেজ কুঠির অবরোধ ও আত্মসমর্পণের পরে পরাজিত ইংরেজদের প্রতি ‘উদার মানবিকতার’ সঙ্গে ব্যবহার করেছেন১৭— এ তথ্য কাশিমবাজার কুঠির এক ইংরেজ কর্মচারীরই। কাশিমবাজারের ইংরেজ বিষয়-সম্পত্তির ওপর সিরাজ হাত পর্যন্ত দেননি, শুধু সেখানকার অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। ইংরেজদের সম্পূর্ণ অসহায় পেয়েও কোন লুঠতরাজ, হত্যা বা নিষ্ঠুরতার আশ্রয় কিন্তু সিরাজ নেননি। সিরাজ চরিত্র সম্বন্ধে ওয়াটসের মন্তব্য: ‘….in his own nature [Siraj was] timid to the last degree.’ স্ত্রী লুৎফুন্নেসার প্রতি সিরাজের গভীর ভালবাসা ও মদ্যপান না করার প্রতিশ্রুতি রক্ষার মধ্যে কিন্তু বদ্ চরিত্রের লক্ষণ কিছু পাওয়া পাওয়া যায় না।
.
সিরাজ-ইংরেজ বিরোধ
নবাব সিরাজদ্দৌল্লা ও ইংরেজদের মধ্যে যেসব বিশেষ ঘটনা বা নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে বিরোধ এবং যার ফলে শেষ পর্যন্ত দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে, সেগুলি ভাল করে বিশ্লেষণ করা দরকার, যাতে এ সংঘর্ষের প্রকৃত কারণগুলি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। সিরাজ নবাব হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর ও ইংরেজদের পারস্পরিক স্বার্থের সংঘাতের ফলে দু’পক্ষের মধ্যে বিরোধ অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আসলে আলিবর্দির মৃত্যুর ঠিক আগে সিরাজ ইংরেজ কোম্পানির বেশ কিছু কাজকর্মের প্রতিবাদ করেছিলেন কারণ এগুলির মাধ্যমে নবাবের সার্বভৌম কর্তৃত্বের প্রতি অবজ্ঞা দেখানো হচ্ছিল। ইউরোপে যুদ্ধ বাধার আশঙ্কায় এবং আলিবর্দির মৃত্যুর পর মুর্শিদাবাদের মসনদ নিয়ে বিরোধ অবধারিত ভেবে ইংরেজ ও ফরাসিরা উভয়েই প্রায় প্রকাশ্যে তাদের দুর্গগুলির সংস্কার ও সংহত করার কাজ শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু একদিকে আলিবর্দির গুরুতর অসুস্থতা এবং অন্যদিকে দিল্লি থেকে মুঘল সম্রাটের প্রধানমন্ত্রী বাংলার বকেয়া রাজস্ব আদায়ের জন্য অভিযান করতে পারেন এমন আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় সিরাজ আপাতত ইংরেজ ও ফরাসিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াটা মুলতুবি রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন।১৮
ইংরেজদের প্রতি বিরূপ হওয়ার সিরাজদ্দৌল্লার আরও গভীর কারণ ছিল। তিনি নবাব হওয়ার পর ইংরেজরা তাকে কোন উপঢৌকন বা নজরানা পাঠাননি বলে তাঁর ক্ষোভ হয়েছিল বলে যে বক্তব্য, তা মোটেই ঠিক নয়।১৯ প্রথম থেকেই তিনি সন্দেহ করেছিলেন যে ইংরেজরা তাঁর সিংহাসন প্রাপ্তির বিরোধিতা করতে পারে এবং তারা মসনদের দাবিদার, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মদত দিচ্ছে। এ সন্দেহ কিন্তু একেবারে অমূলক নয়। বস্তুত ইংরেজরা প্রথম থেকে প্রায় ধরেই নিয়েছিল সিরাজের পক্ষে নবাব হওয়া প্রায় অসম্ভব। বাংলায় ফরাসি কোম্পানির অধ্যক্ষ রেনল্ট বা কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’র লেখা এবং অন্যান্য বেশ কিছু ইউরোপীয় তথ্য থেকেও জানা যায় যে ইংরেজরা সিরাজদ্দৌল্লার বিরুদ্ধে একটা মতলব ভাঁজছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সক্রিয় যোগাযোগ ছিল। রেনল্ট স্পষ্ট জানাচ্ছেন: ‘ঘসেটি বেগমের দলকে মসনদ দখলের দৌড়ে কেউ আটকাতে পারবে না এবং সিরাজদ্দৌল্লার পতন অনিবার্য, এই স্থির বিশ্বাসে ইংরেজরা ঘসেটি বেগমের সঙ্গে [সিরাজের বিরুদ্ধে] চক্রান্ত শুরু করে।’২০ জাঁ ল’ও লিখেছেন যে অন্য অনেকের মতো ইংরেজরাও ভেবেছিল, ‘সিরাজদ্দৌল্লা কখনও নবাব হতে পারবেন না এবং তাই তারা কোনও কাজে তাঁর দ্বারস্থ হত না’।২১ তা ছাড়া মসনদের জন্য সিরাজের অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী পূর্ণিয়ার নবাব শওকত জঙ্গের সঙ্গেও ইংরেজদের যোগাযোগ ছিল।২২ এসব দেখেই মনে হয় কোম্পানির কর্মচারী রিচার্ড বেচার বলেছেন যে ইংরেজরা সিরাজদ্দৌল্লাকে তাদের ওপর রেগে যাওয়ার যথেষ্ট ইন্ধন যুগিয়েছিল।২৩
