তৃতীয়ত, অধিকাংশ ঐতিহাসিকের বক্তব্য, পলাশি ভারতীয়দেরই ষড়যন্ত্র (ক্রিস বেইলির ভাষায় ‘Indian-born conspiracy’)। এর পেছনে ইংরেজদের কোনও ‘পূর্ব-পরিকল্পনা’ ছিল না। প্রথমদিকে ইংরেজদের লক্ষ্য ছিল ‘খুবই সীমিত’ কিন্তু তারা যখন উপলব্ধি করল যে মুর্শিদাবাদ দরবারে একটি বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠাতে উৎসুক, তখন তাদের লক্ষ্য আস্তে আস্তে প্রসারিত হল।৪ সাধারণভাবে পলাশির ষড়যন্ত্রের জন্য প্রধানত মীরজাফরকেই দায়ী করা হয়। মীরজাফরই বিশ্বাসঘাতক—নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে বাংলার মসনদ অধিকার করার মতলবে তিনি ইংরেজদের সঙ্গে পলাশি চক্রান্তে যোগ দেন— এ মত বহুল প্রচারিত। বাংলায় মীরজাফর নামটাই বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক। এখনও ওই নাম বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক শব্দ।
চতুর্থত, প্রাক্-পলাশি বাংলায় অভ্যন্তরীণ ‘সংকটের’ কথাও বলা হয়ে থাকে। আগে এই ‘সংকটকে’ শুধু রাজনৈতিক ‘সংকট’ হিসেবে দেখা হত। কিন্তু ইদানীং এর সঙ্গে অন্য একটি মাত্রাও যোগ করার চেষ্টা হয়েছে—বলা হচ্ছে এটা অর্থনৈতিক ‘সংকট’ও বটে। রাজনৈতিক সংকটের ব্যাখ্যা হিসেবে বলা হয় যে অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলার বাণিজ্যিক-ব্যাঙ্কিং শ্রেণি, জমিদার ও অভিজাতবর্গের সঙ্গে নবাবের যে শ্রেণিগত জোটবদ্ধতা গড়ে উঠেছিল এবং যা মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত বাংলার নিজামতকে স্থায়িত্ব দিয়েছিল, সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হওয়ার পর তা ভেঙে পড়ে। আর অর্থনৈতিক সংকটের লক্ষণ হিসেবে নির্দেশ করা হচ্ছে— অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি, শিল্পবাণিজ্যের অধোগতি, ব্যবসায়ী/মহাজন শ্রেণির আর্থিক দুরবস্থা, জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম এবং ইংরেজ কোম্পানির রফতানি বাণিজ্যের পরিমাণে ঘাটতি, ইত্যাদি। এ সবগুলিকে ১৭৪০-র দশকে যে ক্রমাগত মারাঠা আক্রমণ হয়েছিল তাঁর ফলশ্রুতি হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।৫
আবার অধুনা বলা হচ্ছে, অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত যে হিন্দু-জৈন মহাজন-ব্যাঙ্কিং ও ব্যবসায়ী শ্রেণির শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে, তার প্রেক্ষিতেই পলাশি বিপ্লবের ব্যাখ্যা করা সমুচিত। হিল সাহেব অবশ্য অনেকদিন আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ইউরোপীয় বাণিজ্যের ফলে তাদের সঙ্গে উপরোক্ত শ্রেণির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।৬ কিছুদিন আগে ব্রিজেন গুপ্ত দেখাবার চেষ্টা করেছেন, বাংলার সঙ্গে ইউরোপীয় সমদ্র বাণিজ্যের ফলে হিন্দু ব্যবসায়ী শ্রেণির স্বার্থ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে পড়েছিল। এই বিশেষ শ্রেণিই বাংলায় ইংরেজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রধান সহায়কের (‘catalytic agent’) কাজ করেছিল।’৭ আর এখন পিটার মার্শাল, ক্রিস বেইলি প্রমুখ ইউরোপীয় বাণিজ্যের ফলে ইউরোপীয়দের সঙ্গে বাংলার হিন্দু-জৈন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ওপর জোর দিচ্ছেন— বলছেন, তাঁর ফলে উভয়ের স্বার্থ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েছিল এবং সে কারণেই হিন্দু-জৈন মহাজন-ব্যবসায়ী গোষ্ঠী পলাশির ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের সঙ্গে হাত মেলায়।৮ অর্থাৎ সেই ‘কোলাবোরেশন থিসিসের’ ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই থিসিসের মূল প্রতিপাদ্য, ইউরোপীয় বাণিজ্যের ফলে বাংলায় হিন্দু-জৈন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের, বিশেষ করে ইংরেজদের, স্বার্থ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায় এবং সেজন্যই এরা ইংরেজদের সঙ্গে পলাশির ষড়যন্ত্রে সামিল হয়। বিশদভাবে বলতে গেলে এ বক্তব্য মোটামুটি এরকম: অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপীয় বাণিজ্যেরই বাংলার বাণিজ্যিক অর্থনীতিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা, ইউরোপীয়রাই বাংলা থেকে সবচেয়ে বেশি রফতানি বাণিজ্য করছিল এবং ফলে তারাই বাংলায় সবচেয়ে বেশি ধনসম্পদ (রুপো, টাকাকড়ি) আমদানি করত। আর এই বাণিজ্যের ফলে হিন্দু-জৈন ব্যবসায়ী সম্প্রদায় বেশ লাভবান হতে থাকে এবং সে কারণেই তাদের সঙ্গে ইংরেজদের একটা অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ক্রিস বেইলি এমন কথাও বলছেন যে বাংলায় ‘ব্যবসায়ী-ভূস্বামীদের স্বার্থ ইউরোপীয়দের ভাগ্যের সঙ্গে এমন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছিল যে কলকাতা থেকে ইংরেজদের তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা তারা সহ্য করতে পারছিল না এবং সেজন্যই পলাশির ঘটনা ঘটল’।৯
সবশেষে এবং একদিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, প্রাক-পলাশি বাঙালি সমাজের দ্বিধাবিভক্ত চিত্র। কোনও কোনও ঐতিহাসিকের বক্তব্য, পলাশি যুদ্ধের প্রাক্কলে বাংলার সমাজ হিন্দু এবং মুসলমান এই সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত ছিল। মুসলমান নবাবের অত্যাচারে জর্জরিত সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা মুসলমান শাসন থেকে মুক্তি চাইছিল, তাই তারা ইংরেজদের স্বাগত জানাতে উৎসুক ছিল। এ মতবাদের প্রধান প্রবক্তাও এস. সি. হিল। ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজদ্দৌল্লার যে সংঘর্ষ বাধে, হিলের মতে তাঁর অন্যতম ‘সাধারণ’ কারণ মুসলমান শাসকদের প্রতি হিন্দুদের অসন্তোষ। স্যার যদুনাথ সরকার সোজাসুজি এ ধরনের কথা না বললেও উদ্ধৃতি দিয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, মূলত হিন্দুরাই মুসলমান শাসনের অবসান চাইছিল। ব্রিজেন গুপ্ত বাংলার দ্বিধাবিভক্ত এই সমাজের কথা বলতে গিয়ে প্রায় হুবহু হিলের বক্তব্যকে তুলে ধরেছেন।১০
