স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকে শুধু নয়, এস. সি. হিল (১৯০৫) থেকে শুরু করে অধুনা পিটার মার্শাল (১৯৮৭), ক্রিস বেইলি (১৯৮৭), রজতকান্ত রায় (১৯৯৪) প্রমুখের গ্রন্থেও১ সিরাজদ্দৌল্লা এবং পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব সম্বন্ধে কতগুলি বক্তব্য স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে দেখা যায়। সাধারণভাবে এ বক্তব্যগুলি হল—পলাশির ষড়যন্ত্রে ইংরেজদের বিশেষ কোনও ভূমিকা ছিল না; সিরাজদ্দৌল্লা এতই দুশ্চরিত্র, দুর্বিনীত ও নিষ্ঠুর ছিলেন যে তাতে রাজ্যের অমাত্যবর্গ শুধু নয়, সাধারণ মানুষও নবাবের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই তাঁকে অপসারণ করতে মুর্শিদাবাদ দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বদ্ধপরিকর হয় এবং এ কাজ সম্পন্ন করতে তারা ইংরেজদের সামরিক শক্তির সাহায্য পাওয়ার প্রত্যাশায় তাদের ডেকে আনে। তাই ইংরেজদের বাংলা বিজয় একটি ‘আকস্মিক’ ঘটনামাত্র, এর পেছনে তাদের কোনও ‘পূর্ব-পরিকল্পনা’ (মার্শালের ভাষায় ‘no calculated plottings’) ছিল না। মুর্শিদাবাদ দরবারে ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে তারা মাঠে নেমে পড়ে এবং নবাবের অমাত্যদের সঙ্গে সিরাজকে হঠিয়ে মীরজাফরকে নবাব করার পরিকল্পনায় সামিল হয়।
সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলা হয় হয় যে সিরাজদ্দৌল্লার সঙ্গে ইংরেজদের যে বিবাদ ও সংঘর্ষের পরিণতি হিসেবে তিনি শেষ পর্যন্ত বাংলার মসনদও হারালেন, তার জন্য মূলত দায়ী তিনিই। আবার পলাশির ব্যাখ্যা হিসেবে যুক্তি দেখান হয়ে থাকে যে সিরাজদ্দৌল্লা নবাব হয়ে তাঁর আচরণ ও ব্যবহারে প্রভাবশালী অমাত্যবর্গকে তাঁর প্রতি বিরূপ করে তোলার ফলে বাংলায় যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ‘সংকট’ দেখা দেয়, তার পরিণতিই পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লব। ইদানীং এটাও প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে যে প্রাক্-পলাশি বাংলায় রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক ‘সংকটও’ [বিশেষ করে কে. এন. চৌধুরী (১৯৭৮), পিটার মার্শাল (১৯৮০, ’৮৭)] দেখা দিয়েছিল এবং এই ‘উভয় সংকট’ থেকে বাংলাকে উদ্ধার করার জন্যই যেন ইংরেজরা ‘অনিচ্ছা সত্ত্বেও’ বাংলা জয় করে। কোনও কোনও ঐতিহাসিক আবার ইংরেজদের বাংলা বিজয়ের যাথার্থ্য প্রমাণ করতে গিয়ে প্রাক-পলাশি বাঙালি সমাজের একটি দ্বিধাবিভক্ত চিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টায় যত্নবান। এঁদের বক্তব্য, পলাশির প্রাক্কালে বাংলার সমাজ সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে সম্পূর্ণ বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। মুসলিম শাসনের নিপীড়নে নির্যাতিত সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায় মুসলিম নবাবের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য ইংরেজদের সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিল।
উপরোক্ত বক্তব্যগুলি কতটা সঠিক এবং তথ্য ও যুক্তিনির্ভর, তার সূক্ষ্ম এবং নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। গত দু’দশকেরও বেশি ইউরোপের বিভিন্ন আর্কাইভসে, বিশেষ করে ব্রিটিশ লাইব্রেরির ইন্ডিয়া অফিস রেকর্ডসে (India Office Records, British Library, London) রক্ষিত ইংরেজ কোম্পানির নথিপত্র ও ‘প্রাইভেট পেপারস’ এবং হল্যান্ডের রাজকীয় আর্কাইভসে (Algemeen Rijksarchief, The Hague) সংরক্ষিত ডাচ কোম্পানির দলিল দস্তাবেজ ও কাগজপত্রে (যেগুলি এর আগে পলাশির প্রেক্ষিতে কেউ দেখেননি বা ব্যবহার করেননি) যেসব নতুন তথ্যের সন্ধান পেয়েছি এবং তার পাশাপাশি আগের নানা তথ্য ও সমসাময়িক ফারসি ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্যের পুনর্বিচার করে আমরা ওপরের বক্তব্যগুলি খণ্ডন করেছি।
আমাদের মূল বক্তব্য, পলাশির ষড়যন্ত্র ও বিপ্লবে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিল ইংরেজরাই, ভারতীয়রা নয়। ইংরেজরা বেশ পরিকল্পিতভাবেই একাজ সম্পন্ন করে এবং নানা প্রলোভন ও প্রচ্ছন্ন ভয় দেখিয়ে তারা মুর্শিদাবাদ দরবারের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে তাদের পরিকল্পনায় সামিল করে। শুধু তাই নয়, পলাশির যুদ্ধের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তারা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছে যাতে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা সিরাজদ্দৌল্লাকে হঠিয়ে অন্য কাউকে মসনদে বসাবার পরিকল্পনায় যুক্ত থাকে। তবে এটাকে দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের দোষ স্খালনের প্রচেষ্টা হিসেবে ধরে নেওয়া ভুল হবে। নবাবের দরবারের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একটা অংশ সিরাজদ্দৌল্লার ওপর বিরূপ হয়ে একটা চক্রান্ত করার চেষ্টা করছিল, একথা আমরা অস্বীকার করছি না। কিন্তু আমরা যে বক্তব্যের ওপর জোর দিচ্ছি তা হল, ইংরেজদের নেতৃত্বেই পলাশি চক্রান্ত পূর্ণ অবয়ব পেয়েছিল এবং খুব সম্ভবত তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই চক্রান্ত পরিপূর্ণ রূপ নিয়ে নবাবের পতন ঘটাতে পারত না।
বিচার্য বিষয়
আলোচনার সুবিধের জন্য বিষয়গুলি আর একটু বিশদভাবে বলা প্রয়োজন। প্রথম, ঐতিহাসিকরা (এবং বেশিরভাগ সমসাময়িক লেখকরাও বটে) সহমত যে নবাব হওয়ার আগে সিরাজদ্দৌল্লা এতই নির্মম, নিষ্ঠুর এবং দুশ্চরিত্র ছিলেন যে সবাই আলিবর্দির পরে সিরাজের নবাব হওয়ার সম্ভাবনায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। সিরাজের এই ‘কদর্য’ চরিত্র অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রায় সবাইকে শুধু নয়, সাধারণ মানুষকেও তাঁর প্রতি বিরূপ করে তুলেছিল। কাশিমবাজারের তদানীন্তন ফরাসি কুঠির প্রধান জাঁ ল’ লিখেছেন: ‘Before the death of Alivardi Khan, the character of Siraj- uddaula was reputed to be worst ever known. In fact he had distinguished himself not only by all sorts of debaucheries but by a revolting cruelty’২. দ্বিতীয়ত, অধিকাংশ ঐতিহাসিকের বক্তব্য, ইংরেজ কোম্পানির সঙ্গে সিরাজের যে বিবাদ ও সংঘর্ষ হয়েছিল তার জন্য সিরাজদ্দৌল্লাই সম্পূর্ণভাবে দায়ী। এ সংঘর্ষের কারণ আলোচনা করতে গিয়ে এস. সি. হিল নবাবের উদ্দেশ্য বা কারণ এবং নবাবের ‘মিথ্যা ওজর’ এই দু’ভাগে ভাগ করেছেন। হিলের মতে এ সংঘর্ষের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম কারণ হল সিরাজদ্দৌল্লার ‘দম্ভ’ এবং ‘অর্থলিপ্সা’। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সিরাজের যেসব অভিযোগ— ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লার সংস্কার ও দুর্ভেদ্যকরণের প্রচেষ্টা, দস্তক বা বিনাশুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতিপত্রের যথেচ্ছ ও বেআইনি অপব্যবহার এবং নবাবের অপরাধী প্রজাদের কলকাতায় আশ্রয়দান— সেগুলিকে হিল সাহেব ইংরেজদের আক্রমণ করার জন্য নবাবের ‘মিথ্যা ওজর’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন।৩
