পাকিস্তান হওয়ার পর পৌনে তিনটা বছর আমাকে কলিকাতা থাকিতে হইয়াছিল অবস্থা-গতিকে। কিন্তু ঐ সময়কার অভিজ্ঞতাটা আমার অনেক কাজে লাগিয়াছে। সে সব অভিজ্ঞতার অত খুটিনাটি বিবরণ দিয়াছি আমি একটা কথা বুঝাইবার জন্য। সেটা এই যে পশ্চিমবাংলা সরকার ও তথাকার ইন্টেলিজেনশিয়ার উল্লেখযোগ্য অংশ গোড়ার দিকে স্পিরিট-অব-পার্টিশন রক্ষা করিয়া চলিয়াছেন অনেক দিন পর্যন্ত। একজন পাকিস্তানী মুসলিম লীগ-কমীর মুখ হইতেই এই সত্য কথাটা বাহির হওয়া উচিৎ বলিয়াই আমি তা বলিতেছি। না বলিলে সত্য গোপনের পাপ হইত।
৫. স্পিরিট-অব-পার্টিশন
তবেই এখানে বলিতে হয় স্পিরিট অব পার্টিশন বলিতে আমি কি বুঝাইতেছি? কথাটা খোলাসা করিয়া বলা দরকার শুধু মুসলিম জনসাধারণ, মুসলিম লীগ কর্মী ও অনেক মুসলিম-লীগ নেতার জন্যই নয়, বড় বড় প্রবীণ হিন্দু-কংগ্রেস নেতার জন্যও। কারণ অত বড় বড় বুদ্ধিমান লোক হইয়াও পার্টিশনের স্পিরিটটা তাঁরাও ধরিতে পারেন নাই। এরা পারেন নাই বলিয়াই মহাত্মাজীকে বারেবারে অনশন ও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করিতে হইয়াছিল। এই কারণেই সর্দার প্যাটেলের মত দায়িত্বশীল নেতা বলিতে পারিয়াছিলেন : ‘মুসলমানেরা পাকিস্তান চাহিয়াছিল, তা তারা পাইয়াছে। এখন তারা সব সেখানে চলিয়া যাক।’ আলীপুরের হিন্দু উকিল বন্ধুরাও আমাকে এই কথাই বলিয়াছিলেন : কিন্তু দুইটি কথার মধ্যে পার্থক্য ছিল মৌলিক। আলীপুরের বন্ধুরা বলিয়াছিলেন রসিকতা করিয়া। সর্দার প্যাটেল বলিয়াছিলেন সিরিয়াসলি। আলীপুরের বন্ধুরা বলিয়াছিলেন প্রাইভেটলি। সর্দারজী বলিয়াছিলেন পাবলিকলি। আলীপুরের বন্ধুদের কথায় কোন রাজনৈতিক তাৎপর্যও ছিল না, ফলাফলও ছিল না। সর্দারজীর কথার রাজনৈতিক তাৎপর্যও ছিল গুরুতর, ফলাফলও ছিল ঘোরতর।
শুধু সর্দারজী নন। পণ্ডিত নেহরুর মত অসাম্প্রদায়িক নেতা পর্যন্ত পার্টিশনের প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় মানসিক ব্যালেন্স হারাইয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন : ‘মাথার বিষ নামাইতে আমরা মাথা কাটিয়া ফেলিয়াছি।‘ এটা তাঁর ভুল। রাগের কথা–আসলে তিনি মাথা কাটেন নাই। মস্তকটিকে দুই হেমিসফেয়ারে ভাগ করিয়া রাখিয়াছিলেন স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই।
এতেই দেখা যাইবে যে উপরের স্তরের নেতাদের মধ্যেও একমাত্র মহাত্মা গান্ধী ও কায়েদে-আযম জিন্না ছাড়া আর কেউ গোড়ার দিকে স্পিরিট-অব-পার্টিশন হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন নাই। ঐ দুই মহান নেতা ছাড়া আরেক জন এই স্পিরিটটা বুঝিয়াছিলেন। তিনি ছিলেন শহীদ সুহরাওয়ার্দী।
এখন বিচার করা যাক স্পিরিট-অব-পার্টিশন কি? একদিকে যাঁরা বলেন, আদম-এওয়াজ ছাড়া দেশ বিভাগ মানিয়া লইয়া মুসলিম লীগ দ্বিজাতিতত্ত্বই বর্জন করিয়াছিল, তাঁরাও স্পিরিট-অব-পার্টিশন বুঝেন নাই। অপরদিকে যাঁরা বলেন, শরিয়ত-শাসিত ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবেই পাকিস্তান হাসিল হইয়াছে, তাঁরাও স্পিরিট অব-পার্টিশন বুঝেন নাই। এই না বুঝার দরুন কত রকমে কি কি অনিষ্ট হইয়াছে, সে সব কথা যথাস্থানে বলা যাইবে। মোট কথা, ইসলাম রক্ষার জন্য পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দরকার ছিল না। ভারতীয় মুসলমানদের রক্ষার জন্যই এর দরকার ছিল। এখানে ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম জাতির স্বার্থের পার্থক্য বুঝিতে হইবে।
ইসলাম ধর্মকে দুনিয়ায় টিকাইয়া রাখিতে রাষ্ট্র শক্তির দরকার, একথা যাঁরা বলেন, তারা ইসলামকে ধর্ম হিসাবে হোট করিয়া দেখেন। ইসলাম ধর্ম হিসাবে নিজের জোরেই বিশ্ব-জগতে প্রচারিত হইয়াছে এবং আজও হইতেছে। নিজের জোরেই চিরকাল বাঁচিয়াও থাকিবে। অতএব ইসলাম ধর্ম নয়, ভারতীয় মুসলমানদের রক্ষার জন্যই পাকিস্তানের সৃষ্টি। একাজ করিতে গিয়া আসলে মুসলিম লীগ দ্বিজাতি তত্ত্বও বিসর্জন দেয় নাই, পাকিস্তানও শরিয়তী শাসনের ইসলামী রাষ্ট্ররূপে সৃষ্ট হয় নাই। দুই জাতি’র ভিত্তিতে এই উপমহাদেশ দুইটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিভক্ত হইয়াছে মাত্র। তার একটি হিন্দু-প্রধান, অপরটি মুসলিম প্রধান। এই যা পার্থক্য।
স্পিরিট-অব পার্টিশন এই দুই রাষ্ট্র সৃষ্টির বুনিয়াদী মূলকথা। সেটা বুঝিতে হইলে আগে বুঝিতে হইবে : এই দুই রাষ্ট্র সৃষ্টি হিন্দু-মুসলিমে আপোসের ব্যর্থতার পরিণাম নয়, তাদের আপোসের ফল। হিন্দু-মুসলিম একতাবদ্ধ হইতে পারে নাই বলিয়া দেশ ভাগ হইয়াছে, এটা সত্য নয়। সত্য কথা এই যে, দুই জাতি ঐক্যবদ্ধ হইয়াই আপোসে দুই রাষ্ট্র সৃষ্ট করিয়াছে। এও বুঝিতে হইবে যে হিন্দু-মুসলিম যুদ্ধ করিয়া দেশ ভাগ করে নাই। বিজেতা কোনও বিদেশী শক্তিও দেশ দুই টুকরা করে নাই। জার্মানি, পোল্যাণ্ড, তুরস্ক, কোরিয়া, ভিয়েতনাম ইত্যাদি বহু দেশকে আমরা দুই টুকরা হইতে দেখিয়াছি। কিন্তু ও-সবই করিয়াছে বিজয়ী বিদেশীরা। আমাদের দেশ ভাগ করিয়াছেন স্বয়ং আমাদের নেতারা, আলোচনার টেবিলে বসিয়া, একই রেডিওতে তা ঘোষণা করিয়া।
মহাত্মাগান্ধী ও কায়েদে-আযম জিন্না উভয়েই, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যকেই ভারতের রাষ্ট্রীয় আযাদির অপরিহার্য শর্তরূপে, ‘সাইন কোয়া নন’ হিসাবে পেশ করিয়াছিলেন। শেষ পর্যন্ত ঐক্যের বলেই তাঁরা সে আযাদি হাসিল করিয়াছেন। পার্থক্য শুধু এই যে গোড়াতে উভয়ে এক খাম্বার রাষ্ট্রীয় সৌধের স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন। নানা কারণে সেটা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁরা দুই ভাষার সৌধ করিয়া গিয়াছেন।
