এইসব বিবরণ হইতে স্পষ্ট বুঝা যাইবে যে পূর্ব পাকিস্তানের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক এই ‘কাটা-ছেঁড়া পোকায় খাওয়া’ অবস্থার জন্য রেডক্লিফের চেয়ে আমাদের নিজের প্রতিনিধি নেতাদের দায়িত্বও কম ছিল না। সুহরাওয়ার্দী সাহেব প্রধানমন্ত্রী ও বেংগল পার্টিশন কাউন্সিলের মেম্বর থাকাকালে এবং তার পরবর্তীকালের পার্থক্য হইতেই এটা বুঝা যাইবে। সুহরাওয়ার্দী সাহেব গভর্নর ক্যাসি সাহেবের মত ও সিদ্ধান্ত বলিয়া আমাদেরে যা জানাইয়াছিলেন, পাঠকগণের দৃষ্টি সেদিকে আকর্ষণ করিতেছি। সার নাযিমের হাতে তাঁর পরাজয় ঘটাইয়াছিলেন কারা? সুহরাওয়ার্দী-হীন পার্টিশন কাউন্সিল শুধু কলিকাতা ছাড়িলেন না; কলিকাতার দামে লাহোর কিনিয়া মূখের হাসি হাসিয়া বাড়ি ফিরিলেন। আর কোথায় বারাকপুর বারাসত ভাংগর বশিরহাট? কোথায় গেল দার্জিলিং? যেখানে যাইবার সেখানেই গিয়াছে। কারণ পূর্ব বাংলার স্বার্থ দেখার কেউ ছিল না। যাঁরা তৎকালে আমাদের নেতা ছিলেন তাঁরা পশ্চিমা নেতৃবৃন্দের বিশেষতঃ স্বয়ং কায়েদে আযমের মুখাপেক্ষী পদমর্যাদা-লোভ ভিখারী মাত্র। পূর্ব-বাংলার স্বার্থের কথা বলিয়া পাকিস্তানী নেতৃত্বের বিরাগভাজন হইতে কেউ প্রস্তুত ছিলেন না। হক সাহেব ও সুহরাওয়ার্দী সাহেবকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হাতে নাস্তানাবু হইতে দেখিয়া এদের কেউ আর টু শব্দটি করিতে সাহস করেন নাই বলিয়াই মনে হয়। এই সুযোগে পাকিস্তানের গোড়ার দিকে পূর্ববাংলার সীমা সরহদ্দ সম্বন্ধে বাউণ্ডারি কমিশনের সামনে সওয়াল জবাব করিবার জন্য হক সাহেব ও সুহরাওয়ার্দী সাহেবের মত দেশবিখ্যাত প্রতিভাবান দেশী উকিল-ব্যারিস্টার বাদ দিয়া যুক্ত প্রদেশ হইতে অখ্যাতনামা মিঃ ওয়াসিমকে আমাদের উকিল নিযুক্ত করা হইয়াছিল। এ ধরনের ব্যবস্থার ফল যে আমাদের স্বার্থের প্রতিকূল হইবে, এটা একরূপ জানাই ছিল।
পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি এই ঔদাসীন্য শুধু জায়গা-জমি টাকা-পয়সার ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনৈতিক মর্যাদাদানে কৃপণতাতেও তা প্রসারিত হইয়াছিল। তাই জাতির পিতা, স্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রপতি কায়েদে-আযম মোহাম্মদ আলী জিন্না পাকিস্তান সৃষ্টির দিন হইতে আটমাস পরে দেশের বৃহত্তর অংশ পূর্ব-বাংলায় ভরিফ আনিবার সময় পাইয়াছিলেন। স্বয়ং জাতির পিতাই যখন এই ভাব পোষণ করিতেন, তখন আর নীচের স্তরের নেতা ও সরকারী কর্মচারিদের কথা বলিয়া লাত কি?
৪. কেন্দ্রের ঔদাসীন্য
পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এই নিদারুণ ঔদাসীন্য ও উপেক্ষার মৌলিক কারণ ছিল এই যে, পূর্ব-বাংলাটা ছিল তাঁদের ‘ফাউ’-এর প্রাপ্তি। বাংলা তাঁদের বিবেচনা ও প্ল্যানের মধ্যে ছিল না। পাকিস্তান কথাটা সৃষ্টি হইয়াছিল বাংলাকে বাদ দিয়া। ওটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তান অঞ্চলের মুসলিম-প্রদেশসমূহের নামের হরফের-সমষ্টি, একথা আজ সবাই জানেন। সে নামের হরফে বাংলা তখনও ছিল না। এখনও নাই। এটা শুধু চৌধুরী রহমত আলীর মত ছাত্র-তরুণের দেওয়া নাম মাত্র নয়। পাকিস্তান আদর্শের ‘স্বাপ্নিক ও রূপকার’ বলিয়া প্রশংসিত মনীষী দার্শনিক ও কবি সার মোহাম্মদ ইকবালের ঝিম। তিনি ১৯৩০ সালের এলাহাবাদ মুসলিম লীগ অধিবেশনে তাঁর ইতিহাস-বিখ্যাত সভাপতির ভাষণে এই পাকিস্তানের ভৌগোলিক আকার, আকৃতি ও সীমারেখাও বর্ণনা করিয়াছিলেন। ঐ আকার আকৃতির মধ্যে বাংলার নামগন্ধও ছিল না। পাঞ্জাব, কাশ্মীর, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশ লইয়াই তিনি ভারতীয় মুসলিম রাষ্ট্র তৈয়ার করিয়াছিলেন। ঐ ভারতীয় মুসলিম রাষ্ট্রের দাবিকে তিনি ভারতীয় মুসলিমদের জাতীয় দাবি ও চূড়ান্ত আদর্শ বলিয়া বর্ণনা করিয়াছিলেন। বাংলাকে, মুসলিম বাংলাকে, তিনি শুধু ঐ চূড়ান্ত কাঠামোর মধ্যে ধরেন নাই তা নয়, তাঁর ঐ মূল্যবান অভিভাষণে বাংলার বা বাংলার মুসলমানদের কোনও উল্লেখও নাই। অথচ সার ইকবাল কথা বলিতেছিলেন ভারতীয় মুসলমানদের পক্ষে, সভাপতির অভিভাষণ দিতেছিলেন তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কফারেন্সে এবং ভারতীয় মুসলমানদের অধিকাংশ তখনও বাস করিতেছিল বাংলাতে। এই মনোভাবই ইকবাল সাহেবের বহু আগে ১৯০৬ সালে পূর্ব-বাংলা ও আসাম স্থাপনের এবং ১৯১১ সালে পূর্ব বাংলা ও আসাম বাতিলের বেলা নিখিল। ভারতীয় মুসলিম নেতৃত্বের অমার্জনীয় ঔদাসীন্য প্রকট হইয়াছিল। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের উদ্যোক্তা-প্রতিষ্ঠাতা নবাব সার সলিমুল্লার প্রস্তাব ও অনুরোধ সত্ত্বেও মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ ১৯০৬ সালের প্রতিষ্ঠা অধিবেশনে পূর্ব-বাংলা ও আসাম প্রদেশ সমর্থন করেন নাই। ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে হিন্দু সন্ত্রাসবাদীদের বোমার ভয়ে বৃটিশ সরকার তাঁদের সে ‘সেটেলড ফ্যাক্ট’-কে আন্-সেটেল্ড ও বাতিল করেন। এরপর মুসলিম লীগের ১৯১২ সালের কলিকাতা অধিবেশনে নবাব সলিমুল্লা হাজার চেষ্টা করিয়াও মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠানকে দিয়া মুসলিম বাংলার প্রতি এই বেঈমানির প্রতিবাদ করাইতে পারেন নাই। পূর্ব-পাকিস্তানের আজিকার কীট-দুষ্ট বিকলাঙ্গ চেহারা দেখিয়া আজ স্বভাবতঃই বাংগালী মুসলমান মাত্রেরই মনে পড়ে ১৯০৫ সালের পূর্ব-বাংলা ও আসাম প্রদেশের কথা। বর্তমান আকারের পূর্ব পাকিস্তানের ৫২ হাজার বর্গ মাইলের আয়তনের তুলনায় পূর্ব-বাংলা আসামের আয়তন ছিল ১ লক্ষ ৬ হাজার মাইল। ৩ কোটি ১০ লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৮৫ লক্ষ ও হিন্দু আসামী ও পার্বত্য জাতিসমূহ মিলিয়া ছিল ১ কোটি ২০ লক্ষ। মুসলমানদের সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের দরুন ঐ সব অমুসলমানের বিপুল সংখ্যাধিক লোক ছিল হিন্দুর চেয়ে মুসলমানের ঘনিষ্ঠ। এক দিকে মুসলিম বাংলা আসামের খনিজ-বনজ সম্পদের অংশীদার হইত। অপর দিকে আসামী ও পার্বত্য জাতিরা বর্তমানের ল্যাওড় ও বন্দহীন দুরবস্থার বদলে চাটগাঁর মত বিশাল বন্দরের অংশীদার হইত। মুসলিম-বাংলার মত এত সুখ যেন নিখিল ভারতীয় মুসলিম নেতৃত্বের কাম্য ছিল না। তারপর ১৯১৬ সালে লাখনৌ-প্যান্টের ব্যাপারে এই মনোভাবই ফুটিয়াছিল। এ সবই ডাঃ ইকবালের এলাহাবাদী ঘোষণার আগের ঘটনা। তারপর ইকবাল সাহেবের পরে ১৯৪৭ সালে পাঞ্জাব ও বাংলার দায়-জায়াদবন্টনের আগা-গোড়া ঐ একই মনোব কাজ করিয়াছিল। এই জন্যই ‘পূর্ব বাংলা ফাউ’-এর ধান। ‘ফাউ’-এর ধান টিয়ায় খাইলে গৃহস্থের আপত্তি হয় না। পাকিস্তান হাসিলের আগে এদের দরকার ছিল ভোটের। পাকিস্তান হাসিলের পর এদের দরকার পাটের। একটা শেষ হইয়াছে। আরেকটা শেষ হইতে দেরি নাই। ‘কাজের বেলা কাজী, কাজ ফুরালে পাজী।‘ পূর্ব পাকিস্তানের বরাতে তাই আছে।
