এমনভাবে সমাধান করা ছাড়া উপায়ান্তর ছিল না। কারণ সমস্যা যত বড় হয়, সমাধানও তত বড় হইতেই হয়। ভারতের হিন্দু-মুসলিম-সমস্যার সমাধানের অ বিস্তর চেষ্টা সব নেতাই করিয়াছেন। ঐ সমস্যার মূলগত গভীরতা ও আকারের পরিব্যাপ্তি বুঝিয়াছিলেন মাত্র তিনজন নেতা৷ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, কায়েদে-আযম জিয়া ও মাহাত্মা গান্ধী। এ তিন জনের প্রথম দুইজন সমস্যাটার প্রকৃতি বুঝিয়াছিলেন কতকটা উৎপ্রেরণা বা ইষ্টিং বলে। তাঁদের কুশা বুদ্ধির কাছে সমস্যাটার প্রকৃতি সহজাত মনীষার জোরেই ধরা পড়ে। গভীরভাবে তলাইয়া এবং দীর্ঘদিন গবেষণা করিয়া বুঝিতে হয় নাই। তাই ১৯১৬ সালের লাখনৌ প্যাক্টের মাধ্যমে কায়েদে-আযম সমস্যাটা সমাধান করিতে চাহিয়াছিলেন। ১৯১৭ সালের কংগ্রেসের কলিকাতা অধিবেশন হইতেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও কায়েদে-আযম জিন্ন সমবেতভাবে ও একই ধরনে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের পন্থায় সাম্প্রদায়িক সমস্যাটার সমাধান করিবার চেষ্টা চালাইয়া যান। কিন্তু ১৯২১ সালে মহাত্মাজী তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব বলে কংগ্রেসী রাজনীতিতে আধ্যাত্মিকতার আমদানি করার প্রতিবাদে নিরেট যুক্তিবাদী সেকিউলারি জিন্না কংগ্রেসের রাজনীতির সহিত সমস্ত সম্পর্ক বর্জন করেন। অতঃপর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এককভাবে উভয়ের অনুসৃত নীতি চালাইয়া যাইতে থাকেন। নিখিল ভারতীয় কোন নেতার সহযোগিতা না পাইয়া দেশবন্ধু বাংলাদেশ ভিত্তিক সমাধানের সিদ্ধান্ত করেন। বেংগল প্যাক্ট তার ফল। নিখিল ভারত কংগ্রেস দেশ বন্ধুর মত গ্রহণ করেন নাই। মর্মাহত দেশবন্ধু অকালে ১৯২৫ সালে পরলোক গমন করেন। তিনি মারা গেলেও তাঁর প্রদর্শিত মূলনীতি মরে নাই। দেশবন্ধুর বেংগল প্যান্টের মূলনীতি ছিল হিন্দু-মুসলিম সমস্যার সমাধান হিন্দু-মুসলিম সমাসে নয় সন্ধিতে, সংযোগে নয় সংসর্গে, ঐক্য নয় সখ্যে, মিশ্রণে নয় যোগে, মিলনে নয় মিলে, ফিউশনে নয় ফেডারেশনে। দেশবন্ধু তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে একথা স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন। এত স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন যে তৎকালে অনেক নেতাই তাতে চমকিয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি স্পষ্টই বলিয়াছিলেন : ‘হিন্দু-মুসলিম মিলন অর্থে যদি আমি বুঝিতাম দুই সমাজের মিশ্রণ, তবে আমি কোনও দিন মিলনের কথা বলিতাম না। কারণ দুই সমাজ এক করা আমার কল্পনাতীত। আমার মতে হিন্দু-মুসলিম মিলন অর্থ রাজনৈতিক ফেডারেশন।‘
কথাটা শুধু রাজনৈতিক নয় আধ্যাত্মিকও বটে। এই জন্যই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন যেটা বুঝিয়াছিলেন বিশের দশকে, মহাত্মা গান্ধীও কায়েদে আযম জিন্না তাই বুঝিয়াছিলেন চল্লিশের দশকে। মহাত্মাজী সাধক পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও এটা বুঝিতে তাঁর কুড়ি-পঁচিশ বছরের বেশি লাগিয়াছিল এই জন্য যে তাঁর সাধনা ছিল একরোখা হিন্দুর সাধনা। শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝিয়াছিলেন এই কারণে যে তাঁর সাধনা ছিল অহিংসার সাধনা, প্রেমের সাধনা। কায়েদে-আযমের এত সময় লাগিয়াছিল এই জন্য যে কুশাগ্র-বুদ্ধি হইয়াও তিনি ছিলেন নির্ভেজাল সেকিউলারিষ্ট। রাজনীতিতে ধর্ম কৃষ্টির আমদানির তিনি ছিলেন ঘোরর বিরোধী। তবু শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝিয়াছিলেন এই জন্য যে তাঁর সেকিউলারিযমের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা ছিল। কারণ তিনি ছিলেন সত্যবাদী সত্যের পূজারী হক-পন্থী। পরের হক্কের প্রতি তিনি ছিলেন নিজের হকের মতই সচেতন। গণতান্ত্রিক স্বাধীন ভারতে হিন্দুর প্রাধান্য তার ন্যায় সঙ্গত অধিকার। সাম্প্রদায়িক নির্বাচন-প্রথা বা অন্য কোন সংরক্ষণ-ব্যবস্থা দ্বারা হিন্দুর সে গণতান্ত্রিক অধিকারকে সংকুচিত করিবার অধিকার কারও নাই; এই সত্যের স্বীকৃতির মধ্যেই জিন্নার সত্য-প্রিয়তার প্রমাণ বিদ্যমান।
এখন বিচার করুন, হিন্দু-মুসলিম সমস্যার বুনিয়াদী যে প্রশ্নটা দেশবন্ধু বিশের দশকে এবং মহাত্মাজী ও কায়েদে-আযম আরও বিশ বছর পরে চল্লিশের দশকে বুঝিতে পারিয়াছিলেন, তা কি ছিল? কত গভীর ছিল? কেমন বিপুল ছিল? তার সমাধানের সর্বোত্তম পন্থাইবা কি ছিল? এইটা বুঝিতে পারিলেই স্পিরিট-অব পার্টিশন বোঝা যাইবে। এই স্পিরিটটা ধরিতে পারিলেই হিন্দু-মুসলমানের ভবিষ্যৎ বংশধরগণ চিরকাল মহাত্মাজী ও কায়েদে-আযমের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকিবে। দেশ ভাগ করার অপবাদে তাঁদেরে অভিশাপ দিবে না।
কারণ ভারতের হিন্দু ও মুসলিম দুইটাই মহান মানব গোষ্ঠী। উভয়ের ঐতিহ্য গরীয়ান। উভয়ের ইতিহাস কীতি ও কৃতিত্বে প্রোজ্জ্বল। উতয়ের অতীত গৌরবের বস্তু। একদিকে দেশের তিন-চতুর্থাংশ অধিবাসী ত্রিশ কোটি হিন্দু। সুপ্রাচীন সভ্য আর্যজাতির অংশ তারা। মাত্র আট বছর আগেও এরা দীর্ঘ দুইটি হাজার বছর ধরিয়া এই উপমহাদেশের বেশির ভাগের উপর সগৌরবে অখণ্ড প্রতাপে রাজত্ব করিয়াছে। এই মুদতে তারা বেদ-বেদাংগ উপনিষদ-ষড়দর্শনের মত মননশীল সাহিত্য, রামায়ণ মহাভারতের মত মহাকাব্য, শকুন্তলার মত রম্যকাব্য, মনু-সংহিতার মত আইন শা, চরক-সতের মত চিকিৎসাবিজ্ঞান রচনা ও গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতিষী-বিদ্যা আবিষ্কার করিয়া তৎকালীন বিশ্বের চিন্তা-নায়ক রূপে স্বীকৃত ছিল। গৌতম বুদ্ধের মত ধর্মপ্রবর্তনের জন্ম তারাই দিয়াছিল। অশোক-চন্দ্রগুপ্ত-কনিক-বিক্রমাদিত্যের মত সাম্রাজ্য-নির্মাতা সুশাসক সৃষ্টি তারাই করিয়াছিল। এদের সত্যতা পশ্চিমে কাবুল-কান্দাহার ও পূর্বে মালয়-জাবা-সুমাত্রা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এমনি গৌরবমণ্ডিত এদের প্রাচীন ইতিহাস।
