পরে যখন তিনি বুঝিয়াছিলেন, তখন তাঁর বাহির হওয়ার পথ বন্ধ। তা সত্ত্বেও তিনি যখন বাহির হইয়াছিলেন, তখন তিনি একা। মুসলিম-বাংলা আর তার পিছনে নাই। মুসলিম লীগ নেতৃত্ব ও পাকিস্তান আন্দোলনের মোকাবিলায় হক নেতৃত্বের কৃষক-প্রজা পার্টি ও হক মন্ত্রিসভার ভূমিকার অন্তর্নিহিত বাণী ও শিক্ষা এই। এই কারণেই এই সময়কার অজানা ঘটনাবলী আমি অতি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করিয়াছি। ১৯৩৮ সালে হক সাহেবের মুসলিম লীগে যোগদান ও প্রাদেশিক লীগের সভাপতিত্ব গ্রহণ, আমাদের সকলের অত অনুরোধেও কৃষক-প্রজা সমিতির সভাপতিত্বে ইস্তফা দেওয়া, বাংলার ক্ষেত্রে মুসলিম-আন্দোলন ও প্রজা আন্দোলনকে একই আন্দোলন বলা, স্বয়ং লাহোর প্রস্তাব পেশ করা এবং শেষ পর্যন্ত জিন্না সাহেবের সহিত মুসলিম বাংলার ভবিষ্যৎ লইয়া কলহ করা ও ১৯৪১ সালের ১০ই অক্টোবরের ঐতিহাসিক পত্র লেখা ও প্রগ্রেসিভ কোয়েলিশন মন্ত্রিসভা গঠন করা ইত্যাদি সমস্ত ব্যাপার যেন যুগ ও ভাগ্য-বিবর্তনের অচ্ছেদ্য অংশ হিসাবেই ঘটিয়া গিয়াছে। এতে বাধা দিবার বা এর গতি পরিবর্তনের ক্ষমতা যেন কারুরই ছিল না। হক সাহেবের মনে কি বিপুল চাঞ্চল্যের ঝড় বহিতেছিল, তা এই সময়কার ঘটনা হইতেই বুঝা যাইবে।
২. কংগ্রেসের আত্মঘাতী-নীতি
১৯৩৭ সালে কংগ্রেস যে মারাত্মক ভুল করিয়াছিল ১৯৪৭ সালে সে ভুলেরই পুনরাবৃত্তি করে তারা। কেবিনেট মিশন প্ল্যান সাবটাশ করাই এই দ্বিতীয় ভুল। পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশের সমবায়ে তিন বিষয়ের কেন্দ্রীয় সরকার সহ একটি ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন আমরা বামপন্থী কমীরা দেখিতেছিলাম, কেবিনেট মিশনের গ্রুপিং সিস্টেম কৌশলে সাবটাশ করিয়া কংগ্রেস আমাদের সে স্বপ্ন চুরমার করিয়া দিয়াছিল।
কংগ্রেসের তঙ্কালীন প্রেসিডেন্ট পণ্ডিত নেহরু নিজ মুখে ও হাতে এই সাবটাশ কাজটি করিয়াছিলেন। সেজন্য মুসলিম লীগ-পন্থী মুসলমানরা ত বটেই এমন কি কংগ্রেস-নেতা স্বয়ং মওলানা আবুল কালাম আজাদ পর্যন্ত পণ্ডিত নেহরুর নিন্দা করিয়াছেন। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে অনেক ছোট-বড় নেতা-কর্মীও করিয়াছেন। আমিও করিয়াছি। কারণ এটা সুস্পষ্ট সত্য যে পণ্ডিত নেহরু ঐ কথা না বলিলে মুসলিম লীগ গ্রুপিং সিস্টেম গ্রহণ প্রত্যাহার করিত না। ফলে একটা আপোস হইয়া যাইত। মুসলিম লীগ গণ-পরিষদে ও কেন্দ্রীয় সরকারে প্রবেশ করিত।
কিন্তু এর আরো একটা দিক আছে। পণ্ডিত নেহরু যে কথাটা বলিয়াছিলেন, সেটা শুধু তাঁর নিজের কথা ছিল না; অধিকাংশ কংগ্রেসী হিন্দু নেতার মনের কথা ছিল। নেহরঙ্গী সরলভাবে আগেই সে কথা বলিয়া দিয়া মুসলিম-লীগারদের হুশিয়ার করিয়া দিয়াছিলেন মাত্র। সার্বভৌম গণ-পরিষদ কারও কোনও চুক্তি মানিতে বাধ্য নয়, এই কথাটাই তিনি গণ-পরিষদে বসিবার আগে গণ-পরিষদের বাইরে বলিয়া ফেলিয়াছিলেন। ধরুন, ঐ সময়ে ও-কথা না বলিয়া মুসলিম লীগ সহ গণ-পরিষদ বসিবার পরে শাসনতন্ত্র রচনাকালে পরিষদ-কক্ষে দাঁড়াইয়া তিনি যদি ভা বলিতেন, তবে কেমন হইত? মুসলিম লীগকে নিশ্চয় বেকায়দায় ফেলা হইত। গণ-পরিষদ ও কেন্দ্রীয় সরকার হইতে মুসলিম লীগকে বাহির হইয়া আসিতে হইত। নৃল করিয়া আন্দোলন শুরু করিতে হইত। তাতে সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক আরও তিক্ত হইত। ‘কেবিনেট মিশন প্ল্যান সফল হইয়াছে, কংগ্রেস লীগ উভয়ে তা কার্যকরী করিতে শুরু করিয়াছে’, এই কথা ঘোষণা করিয়া ততদিনে কেবিনেট মিশন নিশ্চিন্তে দেশে ফিরিয়া যাইতেন। কাজেই গণ-পরিষদের ভিতরকার ঐ গণ্ডগোলে নূতন করিয়া দেন-দরবার আলাপ-আলোচনা মিশন-কমিশন শুরু হইত। পণ্ডিত নেহরুর ১০ই জুলাইয়ের ঘোষণার ফলে এটা ঘটিতে পারে নাই। মুসলিম লীগ তৎক্ষণাৎ গ্যান গ্রাহ্য করিয়াছিল। ফলে বৃটিশ সরকার ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন দেশ-বাঁটোয়ারার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। নেহরুর ঘোষণা ঐ সময় না হইয়া পরে হইলে ৩রা জুনের ঘোষণাও আরও পিছাইয়া যাইত। এতে আরও রক্তক্ষয় হইত। মুসলমানরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হইত। এটা না হইয়া যে তখনই একটা এসপার-ওসপার হইয়া গিয়াছিল, এর জন্য দায়ী পণ্ডিত নেহরু। আমার এখানকার বিবেচনায় ঐ বিবৃতি দিয়া পণ্ডিতজী মুসলমানদের উপকারই করিয়াছিলেন।
দেশ ভাগটা হাতে-কলমে হওয়ার সময় স্বভাবতঃই আমার মত নিচের তলার মুসলিম লীগ-কর্মীর কোন সক্রিয় ভূমিকা ছিল না। অন্যান্য লক্ষ-লক্ষ কর্মীর মতই আমারও ভূমিকা ছিল অজ্ঞ দর্শকের। উপরের তলায় ও ভিতরে ভিতরে সব ঘটিয়া যাইত। ঘটনার পরে আমরা শুনিতাম। কোনটায় খুশী হইতাম; কোনটায় চটিয়া যাইতাম। কিন্তু তাতে ঘটনার কোনও এদিক-ওদিক হইত না। তবু প্রধানমন্ত্রী সুহরাওয়ার্দী সাহেবের দৈনিক কাগযের সম্পাদক হিসাবে আমার একটু সুবিধা ছিল। কোনও কোনও ঘটনা ঘটিবার আগে আঁচ ও আভাস পাইতাম। নেতাদের কেউ কেউ কিছু কিছু আভাসে ইংগিতে বলিতেনও। আবার সাংবাদিকের বিশেষ অধিকার যে ‘ভৌতিন সোর্স’ তারাও কিছু কিছু সংবাদ অর্থে গুজব সরাহ করিত।
৩. প্রবঞ্চিত মুসলিম-বাংলা
ঐ সব ঘটনা হইতে আমার তখনই সন্দেহ হইতেছিল যে বাঁটোয়ারার ব্যাপারে মুসলিম বাংলার উপর সুবিচার হইতেছে না। যতই দিন যাইতেছিল ততই আমার সন্দেহ দৃঢ়তর হইতেছিল। পরে তা বিশ্বাসে পরিণত হইয়াছিল। ব্যাপারটা আমাকে খুব পীড়া দিত। যে মুসলিম-বাংলার ভোটে পাকিস্তান আসিল, ভাগ-বাঁটোয়ারার সময়ে তাদেরই প্রতি এ বঞ্চনা কেন? কোনও যুক্তি নেই। কিন্তু অবিচার চলিল নির্বিবাদে। নেতাদের অর্থাৎ জনগণের ভাগ্য-নিয়ন্তাদের চোখের সামনে, তাঁদের সম্মতিক্রমে, বাটোয়ারায় মুসলিম বাংলাকে তার প্রাপ্ত মর্যাদা ও ন্যায্য হক হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে। অপরের স্বার্থের যুপকাষ্ঠে মুসলিম বাংলার মানে পূর্ব বাংলার স্বার্থ বলি দেওয়া হইয়াছে। ‘কলিকাতা চাই’ আন্দোলনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, বেংগল পার্টিশন কাউন্সিল ও কেন্দ্রীয় পার্টিশন কাউন্সিলের দুই নীতি, দায় ও সম্পত্তি হিসাব নিকাশে শুভংকরের ফাঁকি ইত্যাদি ব্যাপারে এই জন্যই আমি অত বিস্তারিত আলোচনা করিয়াছি। ও-সব কথাই রেকর্ডের কথা বটে, তার অধিকাংশই খবরের কাগযে। প্রকাশিত তথ্যও বটে, কিন্তু ইতিমধ্যেই অনেকে তা ভুলিয়া যাওয়া শুরু করিয়াছেন। পাকিস্তান সংগ্রামে অংশ গ্রহণকারী নেতা-কর্মীদের অবর্তমানে আমাদের নয়া পুস্তের তরুণরা এ সব কথা জানিবে না। প্রাচীন কাগ-পত্র ঘাটিয়া এ সব কথা জানিবার। কৌতূহলের কোনও অজুহাতও তাদের থাকিবে না। তাই এ সব কথা একত্রে লিপিবদ্ধ করিয়া আমাদের ভবিষ্যৎ তরুণদের চিন্তার খোরাক ও জ্ঞানের মাল-মশলা হিসাবে রাখিয়া যাইবার উদ্দেশ্যেই এ সবের উল্লেখ করিলাম। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিক ইতিহাস-কারদের কাজে লাগিবে।
