তিনি আবার ছাত-ফাটা হাসি হাসিলেন। বলিলেন : ‘তোমার বদনাম লোকে কেন করব? তুমি কোন্ ভাল কাজটা করছ? লোকের কোন্ উপকারটা করছ? আগে লোকের উপকার কর। দু’চারটা ভাল কাজ কর। তখন দেখবা লোকে তোমার বদনাম শুরু করছে। আম গাছেই লোকে ঢিল মারে। শেওড়া গাছে কেউ মারে না। ফজলী আমের গাছে আরও বেশী মারে।’ ফযলুল হকের এ কথার সত্যতা বুঝিতে আমার দশ-পনর বছর লাগিয়াছিল।
১৬. কালতামামি
কালতামামি
যোলই অধ্যায়
১. বাংলার ভুল
১৯৩৮ সাল হইতে ১৯৪৮ সাল তক এই দশটা বছর শুধু একটা যুগ নয়, একটা মহাযুগ। এই উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী যুগ। বিপ্লবটা শুধু দেশের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্যই নয়, আমার ও আমার মত হাজার হাজার কর্মীর চিন্তার কাঠামোর জন্যও। কোথা হইতে কেমন করিয়া কিসের জন্য কি হইয়া গেল, কিছুই বোঝা গেল না। এক কাজ ছাডিয়া আরেক কাজ ধরিতে-না ধরিতেই পরেরটাও বাতিল হইয়া গেল। এক চিন্তা ছাড়িয়া আরেক চিন্তা ধরিতে-না ধরিতেই পরের চিন্তাও ভ্রান্ত প্রমাণিত হইয়া গেল। যেন সব ম্যাজিক!
কিন্তু এটা ম্যাজিক ছিল না মোটেই। এতদিন পরে পিছনের দিকে এক নজর তাকাইলে দেখা যাইবে সত্যই যেন কোনও অদৃশ্য হাতের বর্ধ-মুষ্টিতে ধরা অসহায় প্রাণীর মতই আমরা অঙ্গ চালনা করিয়াছি। কিন্তু পুতুল নাচ নয়। সত্য-সত্যই ঘোরতর জীবন-নাট্যের অভিনেতা-অভিনেত্রীর সিরিয়াস ভূমিকা। এতদিন পরে মনে হইবে, কতই না ভুল হইয়াছে! আমরা বলিব ওরা করিয়াছে; ওরা বলিবে আমরা করিয়াছি। কারও না কারও ভুল হইয়াছে নিশ্চয়ই। অথবা সত্য কথা এই যে এক ব্যাপারে তুমি ভুল করিয়া থাকিলে আরেক ব্যাপারে আমিও ভুল করিয়াছি নিশ্চয়ই। এটাই দেখা যাইবে আলোচ্য যুগের ঘটনা পরম্পরার বিশ্লেষণে।
পলাশির যুদ্ধের মত এ যুগের ভুলটাও শুরু হয় বাংলার মাটি হইতেই। ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনের পরে কংগ্রেস যুক্ত প্রদেশ বোম্বাই ইত্যাদি প্রদেশে মুসলিম লীগের সাথে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠনে অসম্মত হইয়া যে মারাত্মক ভুল করিয়াছিল, তাও শুরু হইয়াছিল কার্যত বাংলাতেই। এখানে হক সাহেবের নেতৃত্ব কৃষক-প্রজা পার্টি কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠনের যে প্রস্তাব চূড়ান্ত করিয়াছিল তা ভাঙ্গিয়া যায় তুচ্ছ বিষয়ে কংগ্রেসের মারাত্মক ভুলের দরুন। তারপর হক মন্ত্রিসভার প্রতি গোটা বাংলার এটিচুড আচার্য প্রফু চন্দ্রের উপদেশ-মত না হওয়াটা গোটা বাংলার জন্যই চরম দুর্ভাগ্যের বিষয় হইয়াছিল। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও আচার্য এর চন্দ্র একই প্যাটার্নের বাংগালী জাতির স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন। এই স্বপ্নের সাফল্যের জন্য রাষ্ট্রনায়কদের মনে যে অন্তর্মুখী দৃষ্টির (ইওয়ার্ড লুকিং) প্রয়োজন ছিল, সেটা ছিল তৎকালে একমাত্র হক সাহেবের মধ্যেই। কিন্তু সিরাজদ্দৌলাকে কেন্দ্র করিয়া যে বাংগালী জাতিত্বের পরিকল্পনা করিয়াছিল বাংলার হিন্দুরাই, বিশ শতকের তৃতীয় দশকের নয়া চিন্তা ভারতীয় জাতিত্বের বন্যায় সেই বাংগালী হিন্দুই ভাসিয়া যায়। তারা পশ্চিমমুখী হইয়া পড়ে। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনকে তারা একদিকে অখও ভারতের বিরোধী এবং অপরদিকে বাংলায় মুসলিম-রাজ মনে করিতে শুরু করে। এর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় বাংলার মুসলমানরা, এমন কি স্বয়ং হক সাহেবও, কাজে কর্মে পশ্চিমমুখী হইয়া পড়েন। বাংলা ‘অখণ্ড ভারতের রাজনৈতিক দাবা-খেলার বডিয়ায় পরিণত হয়। হক মন্ত্রিসভা প্রজাস্বত্ব আইন, মহাজনী আইন ও সালিশী বোর্ডের মারফত ধর্মসম্প্রদায়-নির্বিশেষে শোষিত জনগণের এত উপকার করিলেন, তবু হিন্দু রাষ্ট্রনেতা ও কংগ্রেসের মুখে এই মন্ত্রিসভার তারিফে একটি কথাও উচ্চারিত হইল না। বরং হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে তাদের রাগ ও দুশমনি বাড়িতেই লাগিল। ফলে হক সাহেব ও হকপ্রন্থী মুসলিম নেতারাও নিতান্ত আত্মরক্ষার উপায় স্বরূপ নিখিল-ভারতীয় মুসলিম নেতৃত্বের আশ্রয় লইলেন। কিন্তু হক সাহেব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হইতেই জানিতেন, নিখিল-ভারতীয় মুসলিম নেতৃত্ব বাংগালী মুসলিম স্বার্থ বলিয়া কোনও কিছুর অস্তিত্ব স্বীকার করিতেন না। বাংলার মুসলিম স্বার্থও তাঁরা বিচার করিতেন নিখিল-ভারতীয় মুসলিম স্বার্থের মাপকাঠি দিয়া। ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম’ নামক নব-সৃষ্ট মুসলিম-প্রদেশটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলিয়া ঘোষণা করিয়া প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরের মধ্যে বাতিল করা হইলে এই কারণেই নিখিল-ভারতীয় মুসলিম নেতৃত্ব হইতে এই বিশ্বাস ভংগের কোনও সিরিয়াস প্রতিবাদ উঠে নাই। বিহার-যুক্ত-প্রদেশ-বোম্বাই-মাদ্রাজে কতিপয় মুসলিম আসন আদায় করিতে গিয়া মেজরিটি বাংগালী মুসলমানকে চিরস্থায়ী মাইনরিটি করিয়া লাখনৌ-প্যাকটে দস্তখত করিতে পারিয়াছিলেন তাঁরা এই কারণেই। এসব ঘটনা হক সাহেবের চোখের সামনেই ঘটিয়াছিল। ভারতীয় রাজনীতিতে আমি সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগার, বাংলার রাজনীতিতে আমি ‘অসাম্প্রদায়িক প্রজা-নেতা’ কথাটা হক সাহেব বলিতে পারিয়াছিলেন এই জন্যই। আমরা তখন তাঁকে বুঝি নাই। মানি ত নাইই। কিন্তু হক সাহেব নিজেই কি বুঝিয়াছিলেন তাঁর কথার ঐতিহাসিক গুরুত্ব?
