১০. আমার নযরে গান্ধী
মহাত্মাজীকে আমি কতটা ভালবাসিতাম, ঐদিনের আগে আমি নিজেও তা বুঝিতে পারি নাই। মহাত্মাজীর জীবন-দর্শন এবং তাঁর রাজনৈতিক মতবাদও আমাকে অনেকখানি প্রভাবিত করিয়াছিল। এতটা করিয়াছিল যে ১৯৪২ সালে কোন এক সময়ে আমার কমিউনিস্ট বন্ধুদের সাথে তর্কে-তর্কে বলিয়া ফেলিয়াছিলাম; গান্ধীম ইয এ্যান ইমপ্রুভমেন্ট আপ-অন মার্কসিযম। অনেকখানি কনভিকশন লইয়াই ও-কথা বলিয়াছিলাম। আজও তাঁর মৃত্যুর বিশ বছর পরেও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আমার অটুট আছে। কিন্তু সেদিন তাঁর অমন মৃত্যুতে আমি যেন নেতৃবৃন্দসহ সমগ্র ভারতবাসীর উপর সাধারণভাবে এবং হিন্দুদের উপর বিশেষভাবে ক্ষেপিয়া গিয়াছিলাম। আমার এই ক্ষেপামি কতদূর গিয়াছিল, তা প্রকাশ করিয়াছিলাম এক প্রবন্ধে। সে প্রবন্ধ ‘ইত্তেহাদের সম্পাদকীয় নয়, পশ্চিম বাংলা সরকারের প্রকাশিত এক পুস্তকে। মহাত্মাজীর হত্যার স্মারকস্বরূপ পশ্চিম বাংলা সরকার একখানা পুস্তক প্রকাশ করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী শ্রীযুক্ত প্রফুল্ল সেনের উদ্যোগে ও সম্পাদনায় এই পুস্তক লেখা হয়। চৌদ্দ-পনর জন সাহিত্যিকের সঙ্গে আমারও একটি লেখা নেওয়া হয়। আমার লেখাটিকেই তিনি প্রাপ্যাধিক সম্মানের স্থান দেন। ঐ প্রবন্ধে আমি গোটা হিন্দু জাতিকে কষিয়া গাল দিয়াছিলাম। বলিয়াছিলামঃ হিন্দু জাতির নীচতাই মহাত্মাজীর উচ্চতার প্রমাণ। রোগ যত কঠিন হয়, তত বড় ডাক্তার দরকার হয়। মহাত্মা গান্ধী এমন মুনি-ঋষি-তুল্য মহৎ ব্যক্তি ছিলেন যে আফ্রিকার জঙ্গলে যদি তিনি খালি গায় খালি পায় খালি হাতে বেড়াইতেন, তবে সেখানকার বাঘ-ভালুক ও সাপ-বিচ্ছও তাঁকে আঘাত করিত না। তেমন মহাপুরুষের গায় হাত দিবার, তাঁকে খুন করিবার, লোক হিন্দু সমাজ ছাড়া আর কোন মানব-গোষ্ঠীতে পাওয়া যাইত না। এতে প্রমাণিত হইল যে হিন্দু জাতি মানব জাতির মধ্যে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট। সেই সঙ্গে এটাও প্রমাণিত হইল যে মহাত্মাজী বর্তমান বিশ্বের মহত্তম ও উচ্চতম মহাপুরুষ। কারণ আল্লা নিকৃষ্টতম অধঃপতিত জাতির চিকিৎসার জন্য নিশ্চয়ই সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষই পাঠাইয়াছিলেন।
এই কঠোর গালাগালির জন্যই নাকি আমার প্রবন্ধকে সম্মানের স্থান দেওয়া হইয়াছিল। প্রফুল্ল বাবু নিজে ও আরও বহু হিন্দু নেতা ও লেখক-সাংবাদিক মুখে ও টেলিফোনে আমাকে মোবারকবাদ দিয়াছিলেন। রাগটা কিছু কমিলে আমি বুঝিয়াছিলাম, হিন্দুস্থানে বসিয়া হিন্দু জাতিকে এমন গাল দিয়া সম্মান ও তারিফ কলিকাতায় শেষ দিনগুলি পাইলাম। মুসলমানদের বিরুদ্ধে এমন কথা বলিলে তা পাকিস্তানেই থোক, আর হিন্দুস্থানেই হোক, মহাত্মাজীর পিছে-পিছেই আমাকে দুনিয়া ত্যাগ করিতেই হইত। কাজেই শেষ পর্যন্ত বুঝিলাম ও হিন্দু সমাজ নীচ বটে কিন্তু সে নীচতা বুঝিবার মত উচ্চতাও তাদের আছে।
গান্ধী-ভক্তি দেখাইতে গিয়া কায়েদে-আযমকেও আমি ছাড়িয়া কথা কই নাই। মহাত্মাজীর মৃত্যু উপলক্ষে শোক-বাণীতে কায়েদে-আযম বলিয়াছিলেন : ‘ভারত একজন মহান হিন্দু হারাইল। আমি ইত্তেহাদের সম্পাদকীয় প্রবন্ধে বলিলাম : কায়েদে-আযমের বলা উচিৎ ছিল : মহাত্মাজীর হত্যায় পাকিস্তান হারাইল একজন ফ্রেণ্ড, দুনিয়া হারাইল একজন ফিলোসফার, আর ভারত হারাইল একজন গাইড। তিনি সত্য-সত্যই এদের একজন ফ্রেণ্ড, ফিলোসফার ও গাইড ছিলেন। ইতিহাস বরাবরই এ সাক্ষ্য বহন করিবে।
১১. আহত সিংহ
‘ইত্তেহাদ’ আফিসের খুবই কাছে একই পার্কস্ট্রিটের অপর পাশে হক সাহেবের বাসা। পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকাতে সমগ্র রাজনৈতিক কার্যকলাপ ও রাষ্ট্র-নেতারাও চলিয়া আসিয়াছেন। হক সাহেব আমাদের মতই তখনও কলিকাতায় পড়িয়া আছেন। পাকিস্তান-প্রস্তাবের প্রস্তাবক হইয়াও তিনি শেষ পর্যায়ে জিন্না সাহেবের সাথে ঝগড়া করিয়া মুসলিম লীগ হইতে বাহির হইয়া যান। পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধী আখ্যায়িত হন। জিন্না সাহেব বলেন : ‘ফযলুল হকের কপালে ওয়াটারলু (চরম পরাজয় ও রাজনৈতিক মৃত্যু) ঘটিয়াছে। যারা ফযলল হককে জানিত তারা এটাও জানিত যে শেরে-বাংলার মৃত্যু ঘটে নাই। বাংলার সিংহ আসলে সাংঘাতিক আহত হইয়া তখন নিজের ঘা চাটিতেছিলেন। ইংরাজীতে বলা হয় : লায়ন লিকিং হিজ উণ্ডস্। সিংহ চাটিয়াই নিজের ঘা শুকায়। ১১৬নং পার্কস্ট্রিটে বসিয়া-বসিয়া বাংলার সিংহ তখন তাই করিতেছিলেন। অবসর কাটাইবার জন্য তিনি প্রায়ই বিকালে আমার রুমে আসিয়া গল্প-গোযারি করিতেন। একদিন কথা-প্রসঙ্গে বলিলাম : আপনের মত জনপ্রিয় নেতা বাংলায় আর একজনও ছিলেন না। এমন একদিন ছিল যেদিন আপনে ইন্তেকাল করলে আপনের জানাযায় লক্ষ লোক হৈত। আজ খোদা-না-খাস্তা আপনে এন্তেকাল করলে পাঁচশ লোকও হৈব কি না সন্দেহ।
হক সাহেব তাঁর স্বাভাবিক ছাত-ফাটা হাসি হাসিয়া বলিলেন : তোমরা আমার রাজনৈতিক দুশমনরা নিশ্চিন্ত থাকতে পার, তোমাদেরে খুশী করবার লাগি এখনই আমি মরতেছি না। আমার সময় মতই আমি মরব। আমার জনপ্রিয়তা কমছে কি বাড়ছে, সেদিনই তোমরা তা বুঝতে পারবা।
বাপের তুল্য বুড়া মুরুব্বির মরার কথা মুখের উপর বলিয়া বেআদবি করিয়াছি। মনে অনুতাপ হইল। শোধরাইবার আশায় দরদের সুরে তাঁর বিভিন্ন ভুল-ভ্রান্তির কথা তুলিলাম। ঐ সব ভুল না করিলে তিনি আন-পপুলার হইতেন না। তিনি স্বীকার করিলেন না। তাঁর কোনও ভুল হয় নাই। তাঁর দুশমনেরা পশ্চিমাদের খপ্পরে পড়িয়া তাঁর মিথ্যা বদনাম দিয়া সাময়িকভাবে তাঁকে বেকায়দায় ফেলিয়াছে। আমি প্রতিবাদে বলিলাম ও অন্যায় না করলে মিথ্যা বদনাম কেউ দিতে পারে না। কই আমার বদনাম ত কেউ করে না।
