মহাত্মাজীর হত্যায় ভারতীয় মুসলমানদের মনে আরেকটা আচমকা সাংঘাতিক ধাক্কা লাগে। পাকিস্তানী নেতাদের জন্য ছিল এটা একটা হুশিয়ারি। তবু তাঁরা হুশিয়ার হন নাই।
৯. মহাত্মাজীর নিধন
১৯৪৮ সালের ৩০শা জানুয়ারি বিকাল চারটায় চৌরঙ্গির মোড়ে বেড়াইতেছিলাম। বেড়াইতেছিলাম মানে পুস্তকের দোকান হইতে দোকানান্তরে বই হাতাইয়া ফিরিতেছিলাম। বিভিন্ন বই-এ তরা এই সব বুক স্টলে পুস্তক দেখিয়া বেড়ানো ছিল আমার চিরকালের অভ্যাস। বেশির ভাগ সময় অবশ্য আমি ফুটপাতের পুরান পুস্তকের দোকানে ঘুরিতাম। ফুটপাতের দোকানদাররা প্রায় সবাই ছিল মুসলমান। সাম্প্রতিক দাঙ্গা-হাঙ্গামায় এদের দোকান আর তেমন বসে না। সেজন্য চৌরঙ্গির নয়া পুস্তকের দোকানগুলিই এখন আমার প্রধান হামলা স্থল। কিনার চেয়ে অবশ্য হাতাইতামই বেশি। কিন্তু তাতে কোনও অসুবিধা হইত না। দোকানদাররা আমাকে কিছু বলিত না। একটানা বার বছর ধরিয়া এই সব দোকানের লোকেরা কালা-শেরওয়ানী-পরা এই লোকটাকে তাদের দোকানে দেখিয়া আসিতেছে। কিছু কিছু লোক আমাকে ‘উকিল ছাব’ বা এডিটর ছাব’ বলিয়া জানিত। নাম কেউ জানিত না। তবু তাদের নিজস্ব পন্থায় আমার সম্মান করিত অর্থাৎ দেখিতে চাহিলে যে-কোন বই দেখাইত যদিও জানিত শেষ পর্যন্ত আমি ঐ বইটা কিনিবনা। একেবারে যে কিনিতাম না, তাও নয়। শ টাকার বই ঘাটিয়া শেষ পর্যন্ত আট-আনা-এক টাকার একখানা অবশ্যই কিনিতাম। তাও আবার সব দিন নয়। এ অভ্যাস আমার তাদের মুখস্থ হইয়া গিয়াছিল। আমাকে দেখিলেই তারা মুচকি হাসিয়া এ-ওর দিকে চাহিত। আমাকে দেখিয়া তারা যে হাসিতেছে, তা আমিও বুঝিতাম। কিন্তু গায় মাখিতাম না। আমিও হাসিতাম। কারণ তারা বলিত : ‘আই এ ছাব’। মনে মনে বোধ হয় বলিত : দু’চারঠো দেখুকে চলে যাই এ ছাব।’
এমনি এক পুস্তকের দোকানে ঐদিনও পুস্তক ঘাটিতেছিলাম। পিছনের কুঠরি হইতে একজন বাহির হইয়া আমাকে দেখিয়া হাত তুলিয়া সালাম করিল এবং বলিল : ছোনা সাব, গান্ধীজীকো ত গুলি মারা।
আমি এইরূপ চিৎকার করিয়া বলিলাম : ক্যা কাহা।
দোকানদার তার কথা রিপিট করিল।
‘কাহাঁ ছোনা, কৌন কাহা?’ আমি জিজ্ঞাস করিলাম।
‘আবহি রেডিও মে বোলা’। দোকানদারবলিল।
‘যিন্দা হ্যাঁয় ইয়া মারা গ্যায়ে?’ শেষ আশা লইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম।
দোকানদার বলিল : রেডিওতে তা বলে নাই।
আমি বেহুশের মত এসপ্ল্যানেডে ফিরিয়া আসিলাম।
ট্রামে উঠিলাম। পার্ক সার্কাস ট্রামে চড়িয়া বুঝিলাম, ট্রাম-যাত্রীরা কেউ কিছু জানেনা। বলিলাম না কিছু। যদি উত্তেজনা দেখা দেয়। বলিয়া যদি ভুল বুঝাবুঝির ভাগী হই।
আফিসে ফিরিয়া আগে নিউডিপার্টে গেলাম। টেলিপ্রিন্টারে নিউ তখনও আসে নাই। নিজেই খবরটা ঘোষণা করিলাম। কোনও আলোচনায় যোগ না দিয়া নিজের কামরায় আসিলাম। টেবিলের উপর মাথায় হাত রাখিয়া চিন্তা করিতে লাগিলাম।
অল্পক্ষণ মধ্যেই টেলিফোন আসা শুরু হইল। কিছুক্ষণ পরেই লোকের ভিড় হইতে লাগিল। লোক মানে মুসলমান। পার্ক সার্কাস মুসলমান এরিয়া। এখানকার নেতৃস্থানীয় লোকেরা ত বটেই, দূর-দূরান্তের মুসলিম নেতারাও আসিয়া ‘ইত্তেহাদ’ আফিসে ড্ডি জমাইলেন। আমার সহকর্মী বন্ধুরা যথাসম্ভব লোকজনকে নিচে হইতেই বিদায় করিতে লাগিলেন। কিন্তু কলুটোলা-যাকারিয়া স্ট্রিটের একদল বড় লোক নেতাকে আমার কামরায় আসিতে না দিয়া পারিলেন না। এরা সকলে মোটর চড়িয়া আসিয়াছেন। কুড়ি-পঁচিশ জনের কম হইবে না। অত চেয়ার আমার কামরায় ছিল না। প্রায় আধাআধি লোক দাঁড়াইয়া থাকিলেন। আমি চেয়ার আনাইতে চাহিলে তাঁরা দৃঢ়ভাবে মানা করিলেন। কাজেই অর্ধেক বসা-অর্ধেক খাড়া অবস্থায় আলোচনা শুরু হইল।
এঁদের নেতা নাখোদা মসজিদের পেশ-ইমাম সাহেব। বড় আলেম। তেমনি বড় পাগড়ি। ইতিমধ্যে টেলিপ্রিন্টারে বিস্তারিত বিবরণ আসিয়া পড়িয়াছিল। সব তাদেরে শুনাইলাম। সব শুনিয়া পেশ ইমাম সাহেব বলিলেন : ‘গান্ধীজী ত মারা গ্যায়ে, আর মুসলমানোঁকা ক্যা হোগা?’
প্রশ্নটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। মুসলমানরা গান্ধীজীকে এতটা বিশ্বাস করিত। এমনি আশ্রয়স্থল মনে করিত তাঁকে! এই মাত্র পনর দিন আগে আমরণ অনশনব্রত করিয়া তিনি দিল্লী ও উপকণ্ঠের মুসলমানদের জীবন রক্ষা করিয়াছেন। হিন্দুদের-হাতে-ভাঙ্গা মসজিদগুলি তাদেরে দিয়াই মেরামত করাইয়াছেন। পাকিস্তানের প্রাপ্য পঞ্চান্ন কোটি টাকা দেওয়াইয়াছেন। সেই মহাত্মাজীই আজ আততায়ীর গুলিতে নিহত হইলেন মুসলমানদের পক্ষ নেওয়ার অপরাধে। কাজেই স্বাভাবিক প্রশ্নঃ ‘আব মুসলমানোঁকা ক্যা হোগা?
আমার অজ্ঞাতে বিনা চিন্তায় আমার মুখ হইতে বাহির হইয়া পড়িল। ‘মহাত্মাজী মারা গ্যায়ে ছহি, লেকেন আল্লা ত নেহী মরা।’
সবাই স্তম্ভিত হইলেন। আমি নিজেও। অন্য সবার মত, তাঁদেরই সাথে, আমার মুখে আমিও ঐ কথাটা শুনিলাম। তার আগে আমিও জানিতাম না, ঐ কথাটাই আমি বলিতেছি। বাস্তবতার ক্ষেত্রে ও-কথার কোনও অর্থ হয় না। কাজেই পেশ-ইমামের প্রশ্নের জবাব ওটা নয়। তবু ওটা ছাড়া বলিবার ছিলইবা কি? চরম বিপদে মুসলমানের মুখে ও-কথা ছাড়া আর কি আসিতে পারে?
তবু পেশ-ইমাম সাহেবের মনেই কথাটা আছর করিল বেশি। অত বড় ভারত বিখ্যাত আলেম। অত বড় পাগড়ি! অত লম্বা দাড়ি। তিনি ভাবিতেও বোধ হয় পারেন নাই, এই দাড়ি-মোচ-মুড়ানো নাংগা-ছের ইংরাজী-দাঁ খুব-সম্ভব-বেনামাযী একটা লোকের মুখে অমন কথা শুনিবেন। কিন্তু বিস্মিত হওয়ার চেয়ে তিনি লজ্জা পাইলেন বেশি। তাঁর চোখে-মুখে তা স্পষ্ট ফুটিয়া উঠিল। তিনি নিজের সঙ্গীদের উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন : এডিটর সাহেব ছহি বাৎলাইয়াছেনঃ মুসিবত দিয়াই আল্ল মোমিনের ঈমানের জোর পরখ করেন। এর পর যা কথাবার্তা হইল, তার প্রতিক্রিয়া খুবই ভাল হইল। চিন্তাকূল ভীতিগ্রস্ত বিষণ্ণ মুখে যারা আসিয়াছিলেন, আশাপূর্ণ আশ্বস্ত হাসিমুখে তাঁরা ফিরিয়া গেলেন।
