কলিকাতায় শেষ দিনগুলি শাসন রচনার সঙ্গে-সঙ্গে গণ-পরিষদ এবং মুসলিম লীগ এক সাথে আত্ম বিলোপ করিবে। তার আগে নয়। আমার সম্পাদকীয় শুনিয়া শহীদ সাহেব অসন্তুষ্ট ত হনই নাই, বরঞ্চ বলিয়াছিলেন : তোমার কথায় জোর আছে।
৭. মাইনরিটির আনুগত্য
দুই, পাকিস্তানের অমুসলমানদের আনুগত্য সম্বন্ধে শহীদ সাহেব দূরদর্শী জাতীয় নেভার যোগ্য কথাই বলিয়াছিলেন : সকল এলাকা ও অঞ্চলের হিন্দুরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধ করিয়াছিল নীতি হিসাবে। পাকিস্তান স্থাপিত হওয়ার পর কাজেই হিন্দুরা সাধারণভাবে সন্দেহের পাত্র হইয়া পড়ে। ওরা কি পাকিস্তানের প্রতি অনুগত থাকিবে? এমন সন্দেহ স্বাভাবিক। প্যাটেলপন্থীদের যুক্তি পাকিস্তানী হিন্দুদের প্রতিও প্রযোজ্য একথা মনে করাও অস্বাভাবিক নয়। যারা পাকিস্তান চাহিয়াছিল, তাদের যদি হিন্দুস্থানে থাকার অধিকার না থাকে, তবে যারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধ করিয়াছিল, তাদের পাকিস্তানে থাকা উচিত নয়। এটা সাধারণ লজিক। কিন্তু সুহরাওয়ার্দী বিবৃতি দিয়া বলিলেন : পাকিস্তানের হিন্দুদের বেলা এ যুক্তি চলিবে না। তিনি বলিলেন, হিন্দুস্থানের মুসলমানও পাকিস্তানের হিন্দুর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রহিয়াছে। যুক্ত প্রদেশ ও মাদ্রাজ ইত্যাদি হিন্দু-প্রধান অঞ্চলের মুসলমানরা যখন পাকিস্তান দাবি করিয়াছিল, তখন তারা জানিয়া-বুঝিয়াই করিয়াছিল যে তাদের বাসস্থান পাকিস্তানে পড়িবে না। কাজেই তারা মনের দিক দিয়া প্রস্তুত ছিল? হয় তারা বাস্তৃত্যাগ করিয়া পাকিস্তানে চলিয়া যাইবে, নয় ত হিন্দুস্থানের বাসিন্দা হিসাবে নিজ নিজ বাসস্থানে থাকিয়া যাইবে। কিন্তু পাকিস্তানের হিন্দুদের বেলা তা বলা চলে না। পূর্ব বাংলার বা পশ্চিম পাঞ্জাবের হিন্দুরা মনের দিক দিয়া প্রস্তুতির সময় পায় নাই। শেষ পর্যন্ত তারা আশা করিয়াছিল, দেশ ভাগ হইবে না। কাজেই তাদের বাস্তুত্যাগ বা আনুগত্য পরিবর্তনের কোনও প্রশ্নই উঠে নাই। এখন যখন দেশ ভাগ হইয়া হিন্দুস্থান-পাকিস্তান হইয়া গিয়াছে, তখন হিলুদিগকে মনের দিক দিয়া প্রস্তুত হইবার উপযুক্ত সময় দিতে হইবে। যে সব হিন্দু দেশ ভাগ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান ত্যাগ করে নাই, ধরিয়া নিতে হইবে তারা পাকিস্তানী হইতে চায়; দেশ ভাগের মানসিক ধাক্কা সামলাইয়া মনের দিক দিয়া পাকিস্তানী হওয়ার জন্য তাদের সময় দিতে হইবে। এখনই এই মুহূর্তে তাদের আনুগত্য লইয়া খোঁচাখুঁচি ঝাঁকাঝাঁকি করা অন্যায় হইবে। হিন্দুরা শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানী হইবে কি না, এটা শুধু তাদের মনের উপর নির্ভর করে না; মুসলমানদের ব্যবহারের উপরও অনেকখানি নির্ভর করে। পাকিস্তানকে মুসলমানরা শুধু মুসলমানের দেশ মনে করে কি না, হিন্দুরা পাকিস্তানে সমান অধিকার লইয়া সসম্মানে থাকিতে পারিবে কি না, এ সব বিচার করিতে সময়ের দরকার। হিন্দুদেরে সে সময় দিতে হইবে এবং ইতিমধ্যে মুসলমানদেরও নিজের কর্তব্য পালন করিতে হইবে।
৮. বাস্তুত্যাগে পাকিস্তানের বিপদ
সুহরাওয়ার্দীর এই সব যুক্তি সাধারণ মানবতার দিক দিয়া অকাট্য ন্যায়-ত যুক্তিসঙ্গত ত ছিলই, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা হিসাবেও অবশ্য পালনীয় ছিল। পাকিস্তানের জন্য আরও বেশি ছিল। উভয় রাষ্ট্রই থিওরেটিক্যালি নয়া রাষ্ট্র হইলেও পাকিস্তান ছিল বাস্তবিকই নয়া। শাসনতন্ত্র, অর্থনীতি, শান্তি রক্ষা ও দেশ রক্ষা সব দিক হইতেই পাকিস্তানকে গড়িতে হইতেছিল একদম অ আ ক খ হইতে; ইংরেজীতে যাকে বলা হয় ফ্রম দি স্ক্র্যাচ। এই সময় তার জটিল সমস্যাকে আরও জটিল করিয়া তুলিতেছিল লক্ষ লক্ষ লোকের বাস্তুত্যাগ। বাস্তুত্যাগীদের পুনর্বাসন উভয় রাষ্ট্রের জন্যই ছিল একটা বিরাট ও বিপুল সমস্যা। কিন্তু পাকিস্তানের জন্য ছিল এটা অনেক বেশি জটিল। তার উপর যদি সব মুসলমান বা তাদের অধিকাংশ ভারত ছাড়িয়া, পাকিস্তানে আসা শুরু করে, তবে তাদেরে সামলানো পাকিস্তানের পক্ষে কার্যতঃ অসম্ভব হইয়া পড়িবে। বস্তুতঃ চরম সাম্প্রদায়িকতাবাদী একদল হিন্দু সর্দার প্যাটেলের আশকারা পাইয়া সব মুসলমানকে এক সঙ্গে তাড়া করিয়া পাকিস্তানে ঠেলিয়া দিয়া পাকিস্তান ডুবাইয়া দিবার কথাও তুলিয়াছিল। ‘ট্রাংকেটেড’ ‘মথইটেন’ ছাঁটাই-করা পোকায়-খাওয়া পাকিস্তানের ক্ষুদ্রায়তনের ভূখণ্ডকে এরা জলে-ভাসা যাত্রী ভর্তি ছোট নৌকার সাথে তুলনা করিতেছিল। তারা বিশ্বাস করিত এই যাত্রীভর্তি তল-তলায়মান নৌকায় জোর করিয়া আরও কিছু যাত্রী তুলিয়া দিলেই এ নৌকা ডুবিয়া যাইবে। কথাটা নিতান্তই বাজে কথা ছিল না। দশ কোটি ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে মাত্র ছয় কোটি লইয়া পাকিস্তান হইয়াছিল। বাকী চার কোটিই হিন্দুস্থানে ছিল। কাজেই বাস্তুত্যাগীর চাপে পাকিস্তান খতম করার আশা একদল পাকিস্তান-বিরোধীর মাথায় আসিয়াছিল। গান্ধী-নেহরু আজাদের দূরদর্শিতায় এবং তাঁদের সত্যিকার অনুসারীদের সহায়তায় এ বিপর্যয় ঘটিতে পারে নাই। পাকিস্তানের পক্ষ হইতে পরিপূরক নীতি অনুসৃত না হইলে এ বিপর্যয় ঠেকানো যাইত না। নেহরু-লিয়াকত চুক্তি এই সুষ্ঠু দূরদর্শী নীতির দলিল। কিন্তু সুহরাওয়ার্দীর দুঃখ ছিল, পাকিস্তান সরকার অনেক দেরিতে এই নীতির মূল্য ও তাৎপর্য উপলব্ধি করিয়াছিলেন। সুহরাওয়ার্দীর ৪৭-৪৮ সালের শান্তি মিশন ও শান্তি-সেনা পরিকল্পনা ছিল মূলতঃ এবং প্রধানতঃ পাকিস্তানের কল্যাণের স্কিম। দুই বাংলার মধ্যে শান্তি রক্ষা করিয়া বাস্তুত্যাগ বন্ধ করা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জীবন-মরণের প্রশ্ন। নাযিমুদ্দিন মন্ত্রিসভায় অদূরদর্শী ক্ষুদ্রতা সুহরাওয়ার্দীর ঐ দূরদশী নীতি কার্যকরী করিতে দেয় নাই। তার জের আমরা আজও টানিতেছি।
