এই ব্যাপারে এবং এই সময়ে পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ দুইটা গুরুতর পরীক্ষার সম্মুখীন হইয়াছিলেন। দুইটা ব্যাপারেই শহীদ সাহেবের সুস্পষ্ট অভিমত ছিল এবং তিনি তা সংবাদপত্রে বিবৃতি মারফত প্রকাশও করিয়াছিলেন। এক, পাকিস্তান হাসিল হওয়ার পর পাকিস্তানের জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের নাম আর মুসলিম লীগ থাকা উচিৎ নয়। দুই, পাকিস্তানের হিন্দুদের রাজনৈতিক আনুগত্য বিচারে উদার বাস্তব দৃষ্টি অবলম্বন করা উচিৎ।
৬. মুসলিম লীগ বনাম ন্যাশনাল লীগ
প্রথমতঃ নিখিল ভারত মুসলিম লীগই পাকিস্তান হাসিল করিয়াছে। সত্য, কিন্তু পাকিস্তান হাসিলের পর ইহা বিদ্যমান থাকা উচিৎ নয়। এখন ইহা ভাঙ্গিয়া দিয়া পাকিস্তান ন্যাশনাল লীগ স্থাপন করা দরকার। সে লীগে অমুসলমান পাকিস্তানীদের প্রবেশাধিকার থাকা আবশ্যক। ইহা কায়েদে-আযমের মত বলিয়া তৎকালে পাকিস্তানী নেতৃবৃন্দের জানা ছিল। অনেকের মতও তাই ছিল বলিয়া শোনা যাইত। কিন্তু সুহরাওয়ার্দী সাহেবই প্রথম সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়া এই মত দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন। কথাটা স্পষ্টতঃই যুক্তিসঙ্গত। সুতরাং তাঁর বিবৃতিতে সেই সুস্পষ্ট যুক্তিটারই উপর জোর দেন। পাকিস্তান হাসিল করিয়াছে মুসলিম লীগ ঠিকই; মুসলমানদের দাবিতেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, তাও ঠিক। কিন্তু আদম-এওয়াজ না হওয়ায় এবং দাবিটাও সেরূপ না থাকায় পাকিস্তানে যেমন অনেক হিন্দু আছে, ভারতেও তেমনি অনেক মুসলমান রহিয়াছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে উভয় রাষ্ট্রেই জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের সমান অধিকার স্বীকার করিতে গেলেই জাতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে অসাম্প্রদায়িক হইতেই হইবে। ভারতের যেমন ন্যাশনাল কংগ্রেস আছে, পাকিস্তানেরও তেমনি ন্যাশনাল লীগ করিতে হইবে, কথাটা যুক্তিসঙ্গত এবং কায়েদে আযমের মতও তাই; এই ধারণায় আরো অনেক মুসলিম নেতা শহীদ সাহেবের এই মত সমর্থন করেন। কিন্তু সকলকে বিস্মিত করিয়া আমি শহীদ সাহেবের এই মতের প্রতিবাদ করি শহীদ সাহেবের কাগ্য ‘ইত্তেহাদেই’। ‘ইত্তেহাদের’ সম্পাদক হিসাবেই। ইত্তেহাদ শহীদ সাহেবের সমর্থন করিবে এটাত জানা কথা। কিন্তু এইবারই পাঠকরা প্রথম জানিতে পারিলেন যে “ইত্তেহাদের’ সম্পাদকের সত্যই স্বাধীনতা ছিল। এর আগে আমি কতবারই না কতজনকে বলিয়াছিলাম শহীদ সাহেবের কাগযের আমি মাইনা করা সম্পাদক হইলেও তিনি কোনও দিন আমার লেখায় হস্তক্ষেপ করেন নাই; আমার মতামত প্রভাবিত করিবার চেষ্টাও কোনদিন করেন নাই। কিন্তু বন্ধুরা কেউ আমার কথা বিশ্বাস করেন নাই। বন্ধুবর আবুল হাশিমের মত তীক্ষ্ণ বুদ্ধির লোকও আমার স্বাধীনতায়’ আস্থা স্থাপন করেন নাই। ১৯৪৭ সালের গোড়ার দিকে মওলানা আকরম খাঁ মুসলিম লীগের সভাপতিত্বে ইস্তফা দেন। হক, সাহেব ও হাশিম সাহেবের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ‘ইত্তেহাদে’ আমি হক সাহেবকে সমর্থন করি। হাশিম সাহেব তখন শহীদ সাহেবের রাজনৈতিক জুড়ী এবং দোর্দণ্ড প্রতাপ লীগ নেতা। তাঁকে ফেলিয়া হক সাহেবকে সমর্থন করায় হাশিম সাহেব মনে করিলেন, শহীদ সাহেবই আমাকে দিয়া হক সাহেবকে সমর্থন করাইতেছেন। আমি এই যে বুঝাইলাম, শহীদ সাহেব কোনও দিন আমার সম্পাদকীয় কর্তব্যে হস্তক্ষেপ করেন না, ইশারা-ইঙ্গিতেও আমার মতামত প্রভাবিত করেন না। কোনও কথাই হাশিম সাহেব বিশ্বাস করিলেন না। হাশিম সাহেবের সন্দেহ ভঞ্জনের জন্য শহীদ সাহেব নিজে চেষ্টা করিলেন। তাও তিনি বিশ্বাস করিলেন না।
১৯৪৭ সালের শেষের দিকে যখন ‘ইত্তেহাদে’ শহীদ সাহেবের বিবৃতি ছাপিয়া সেই সংখ্যাতেই এবং পরবর্তী কয়েক সংখ্যায় শহীদ সাহেবের প্রতিবাদে সম্পাদকীয় লেখা হয় মাত্র তখনই হাশিম সাহেব সহ বন্ধুরা স্বীকার করেন, হাঁ, শহীদ সাহেবের ‘ইত্তেহাদে’ সম্পাদকের স্বাধীনতা আছে। শহীদ সাহেব নিজে তাতে দুঃখিত হন নাই। কিন্তু হাশিম সাহেব হইয়াছিলেন। বছরের গোড়ার দিকে তিনি আমার নিন্দা করিয়াছিলেন শহীদ সাহেবকে মানার অপরাধে; এখন তিনি আমার নিন্দা করিলেন শহীদ সাহেবকে না মানার অপরাধে। কারণ পাকিস্তান মুসলিম লীগের বদলে ন্যাশনাল লীগ করার তিনিও পক্ষপাতি ছিলেন।
মুসলিম লীগ ভাঙ্গিয়া দিয়া ন্যাশনাল লীগ করার পক্ষে যত যুক্তি আছে, তার একটারও বিরুদ্ধতা আমি করি নাই। বরঞ্চ ঐ সব যুক্তির আমি পূর্ণ সমর্থক। আমার যুক্তিটা ছিল সময়ের ব্যাপারে সীমাবদ্ধ। আমার বক্তব্য ছিল মুসলিম লীগ ভাঙ্গিবার সময় এখনও আসে নাই। পাকিস্তান হাসিল করাতেই মুসলিম লীগের কার্য শেষ হয় নাই। পাকিস্তানের কনস্টিটিউশন না হওয়া পর্যন্ত সে কৰ্তব্য শেষ হইবে না। আমার যুক্তি ছিল এই : পাকিস্তান-সংগ্রামে মুসলিম লীগ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় রূপের কোন নির্দিষ্ট কাঠামো দেয় নাই। এটা না করিয়াই যদি মুসলিম লীগ আত্ম-বিলোপ করে তবে সেটা হইবে যুদ্ধ জয় করিয়া শান্তি প্রতিষ্ঠার আগেই সৈন্যবাহিনী ডিমবিলাইজ করার মত। আমি ওটাকে পলিটিক্যাল এসকেপিযম’ বলিয়াছিলাম। রাষ্ট্রীয় রূপ দেওয়ার আগে পাকিস্তান ছিল মাত্র একটি ভূখন্ড। এই ভূখন্ড পাইয়াই মুসলিম লীগ সরিয়া পড়িতে পারে না। জনগণকে পাকিস্তানের কত ভাবাবেগপূর্ণ রঙ্গিন চেহারা দেখাইয়া পাকিস্তানের পক্ষে ভোট লওয়া হইয়াছে। সে রাষ্ট্রের রূপ দিয়া জনগণের অধিকারকে শাসনতন্ত্রে বিধিবদ্ধ না করিয়া মুসলিম লীগ যদি সরিয়া পড়ে তবে সেটা হইবে বিট্রেয়াল। সেজন্য আমি প্রস্তাব করিয়াছিলাম : পাকিস্তানের একটি গণতান্ত্রিক
