৪. সুহরাওয়ার্দীর মিশন
গোড়াতে ‘ভারতীয় মুসলমানদের হেফাযত’ করাটা তাঁর অজুহাত মাত্র ছিল এটা ধরিয়া নিলেও পরে এটাই হইয়া উঠে সুহরাওয়ার্দী সাহেবের নিশা। তিনি শুধু নিজের জীবন বিপন্ন করিয়া কলিকাতার হিন্দু দাঙ্গাকারীদের উদ্যত খড়গের সামনেই গলা বাড়াইয়া দেন নাই, তিনি উভয় রাষ্ট্রের মাইনরিটির রক্ষার জন্য মাইনরিটি চার্টারও রচনা করিয়াছিলেন। উহাতে উভয় রাষ্ট্রের নেতাদের দস্তখত লইবার জন্য দিল্লী-করাচি দৌড়াদৌড়িও করিয়াছিলেন। ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে সাহস ও অধিকারবোধ জিয়াইয়া তুলার জন্য ১৯৪৭ সালের ৯ই ও ১০ই নবেম্বর তিনি ৪০নং থিয়েটার রোডস্থ নিজের বাসভবনে নিখিল ভারতীয় মুসলিম কনভেনশন নামে এক প্রতিনিধিত্বমূলক সম্মিলনীর অনুষ্ঠান করেন। ঐ সম্মিলনীতে মওলানা হত মোহানী প্রভৃতি মুসলিম লীগের সাবেক নেতৃবৃন্দ এবং স্বয়ং সুহরাওয়ার্দী সাহেব পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের জন্য হৃদয়স্পর্শী আবেদন করেন। মাইনরিটির অধিকার রক্ষার দাবি-দাওয়া করিয়া এবং সুস্লাওাদী-রচিত মাইনরিটি-চাটার মানিয়া লওয়ার জন্য উভয় রাষ্ট্রের সরকারকে সুরাধ করিয়া প্রস্তাব গৃহীত হয়।
সুহরাওয়ার্দী সাহেব শুধু সভা-সম্মিলনী করিয়াই ক্ষান্ত থাকেন নাই। তিনি নিজে যেমন উভয় রাষ্ট্রের সমঝোতার ব্যাপার লইয়া দিল্লী-করাটি দৌড়াদৌড়ি করেন, কলিকাতায় শেষ দিনগুলি তেমনি পশ্চিম বাংলার প্রধানমন্ত্রী ডাঃ প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ ও গবর্নর ডাঃ কৈলাস নাথ কাটজুকে পূর্ব বাংলার সফরে উদ্বুদ্ধ করেন। ফলে পশ্চিম বাংলার উভয় নেতা ঢাকা আগমন করেন। উভয়েই বিরাট বিরাট জনসভায় বক্তৃতা করেন। কলিকাতা বসিয়া আমরা সংবাদ পাই এবং সে সব সংবাদ ‘ইত্তেহাদে’ প্রকাশ করি যে লক্ষ-লক্ষ পাকিস্তানী জনতা পশ্চিম বাংলার ঐ দুই নেতাকে অভিনন্দন দেন এবং সোল্লাসে তাঁদের বক্তৃতা শুনেন। ডাঃ প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ নিজে ঢাকার লোক। নিজের ঋষি তুল্য মহৎ জীবনের জন্য তিনি মুসলমানদের কাছেও সমভাবে সম্মানিত ও জনপ্রিয় ছিলেন। আর ডাঃ কাটজু যুক্ত প্রদেশের মুসলিম কালচারে পুষ্ট আরবী-ফারসী উর্দুতে পণ্ডিত উদারনৈতিক অসাম্প্রদায়িক হিন্দু। উভয়ে পূর্ব বাংলার জনতার কাছে আন্তরিক অভিনন্দন পাইয়াছিলেন এতে অস্বাভাবিক কিছু ছিল না।
এই দুই উদার নেতার শাসনাধীনে পশ্চিম বাংলার মুসলমানরা আশাতিরিক্ত শান্তি, ও নিরাপত্তায় বাস করিতেছিল। এটা আমি নিজেকে দিয়াই বুঝিতেছিলাম। আমি কাল শিরওয়ানী পরিয়া বিক্ষুব্ধ হিন্দু জনতার সাথে ও মধ্যে ট্রামে চড়িয়া আলীপুর কোর্টে যাইতাম আসিতাম নিরাপদে ও নির্ভয়ে। পাশে বসা হিন্দু বন্ধুদের সাথে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি ও হিন্দুস্থান-পাকিস্তান সম্পর্কে আলোচনা করিতাম মুক্তকণ্ঠে।
প্রধানমন্ত্রী ডাঃ ঘোষের অনুরোধে ও শহীদ সাহেবের উৎসাহে আমি নিজে কলিকাতা ও হাওড়ার মুসলিম ‘পকেট’গুলিতে যাইতাম বক্তৃতা করিয়া তাদের সাহস দিতে এবং দেশ ছাড়িয়া না যাইতে। যতদিন ডাঃ ঘোষ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ততদিন কলিকাতার মুসলমানদের মধ্যে একটা স্বস্তির ভাব আমি সর্বত্র লক্ষ্য করিয়াছি। কালাবাজারী ও মুনাফাখখারদেরে শাস্তি দিতে গিয়া দুর্ভাগ্যবশতঃ তিনি কংগ্রেস পার্টির মেজরিটির সমর্থন হারান। ১৯৪৮ সালের ১৫ই জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদে ইস্তাফা দেন। মুসলমানদের মধ্যে আবার ত্রাসের সঞ্চার হয়। ইতিমধ্যে সর্দার প্যাটেলের নির্দেশে পাকিস্তানকে নগদ টাকার অংশ প্রাথমিক ৫৫ কোটি টাকা দিতে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক অস্বীকার করে। ইহার এবং দিল্লীর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিবাদে মহাত্মাজী আমরণ অনশন গ্রহণ করেন। তাতে আমরা কলিকাতার মুসলমানরা ভয়ানক উৎকণ্ঠিত হইয়া পড়ি। এ সময়ে ডাঃ ঘোষের মত লোক প্রধানমন্ত্রিত্বে ইস্তাফা দেওয়া মুসলমানদের জন্য সকল দিকেই অশুভ ঘটনা বলিয়া মনে হইল।
কিন্তু ২০শে জানুয়ারি ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় পশ্চিম বাংলার প্রধানমন্ত্রী হইয়াই কঠোর হস্তে সাম্প্রদায়িকতা দমন করেন এবং ডাঃ ঘোষের নীতি পুরাপুরি অনুসরণ করিয়া চলেন। তিনি আমাকে রাইটার্স বিল্ডিং-এ তাঁর চেম্বারে ডাকিয়া সকল প্রকার সাহায্য ও সহায়তার আশ্বাস দেন এবং সরকারের সাথে সহযোগিতা করিতে অনুরোধ করেন। ডাঃ ঘোষের সময় যেভাবে মুসলিম মহল্লায় সভা-সমিতি করিয়া বেড়াইতাম, পরিত্যক্ত মসজিদ মেরামত ও পুনর্বহাল করাইতাম, ডাঃ রায়ের আমলেও তাই করিতে লাগিলাম। বরঞ্চ ডাঃ রায়ের কাছে যেন আরও বেশি দরদ ও সহানুভূতি পাইলাম।
৫. বাস্তুত্যাগ-সমস্যা
এই সময়ে উভয় রাষ্ট্রের ভিতরকার সম্পর্কের মধ্যে বাত্যাগ সমস্যাটাই ছিল সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অংকশাস্ত্রের দিক দিয়া হিন্দুস্থানের চেয়ে পাকিস্তানের জন্যই ছিল এটা অধিকতর সমস্যা-সংকুল। আদম-এওয়াজের স্কিম বাটোয়ারার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কিন্তু যে মনোভাব ও প্রচার-প্রচারণার মধ্যে দেশ ভাগ হইয়াছে, সে পরিবেশে বাস্তুত্যাগ দুর্নিবার হইয়া উঠিবে, এটা নেতাদের অল করিয়া ভাবা উচিৎ ছিল। এক দিকে জিন্ন সাহেব অপরদিকে গান্ধী-নেহরুর মত উদার ও উঁচুস্তরের লোকদের পক্ষে অমন বলা বা চিন্তা করা সম্ভব নাও হইতে পারে কিন্তু সাধারণ মানুষের কথাটাই বলিয়াছিলেন সর্দার প্যাটেল। তিনি বলিয়াছিলেন : যারা পাকিস্তান চাহিয়াছিল পাকিস্তান পাওয়ার পর তাদের কারও হিন্দুস্থানে থাকার অধিকার নাই। কথাটা অন্যায় নয়, অসঙ্গত নয়, অযৌক্তিক নয়। কিন্তু পার্টিশনের সময়েই সর্দারের এ কথা বলা উচিত ছিল। আর ভাবা উচিৎ ছিল পাকিস্তানের নেতাদেরও। তা যখন হয় নাই, তখন একমাত্র কর্তব্য হইল বলা : ‘যে যেখানে আছ, সেখানেই থাক’। গান্ধীজিন্না তাই বলিয়াছিলেন : দুই সরকারও সেই নীতির কথাই ঘোষণা করিয়াছিলেন। কিন্তু আমার ঐ সময়ে মনে হইয়াছিল, ঐ সুন্দর নীতিটাকে কাজে-কর্মে পালন করিতেছিলেন সরকার হিসাবে একমাত্র পশ্চিম বাংলা সরকার, আর ব্যক্তি হিসাবে একমাত্র শহীদ সুহরাওয়ার্দী।
