২. আজাদের উপর হামলা
কিন্তু ওটা ব্যক্তিগত কথা। পাকিস্তানী প্রচারকদের মধ্যে ‘আজাদ’ পত্রিকা গ্রগণ্য। হিন্দুরা স্বভাবতঃই আজাদের উপর সবচেয়ে বেশি বিক্ষুব্ধ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই কলিকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিল। পনর দিন যাইতে-না যাইতেই ২রা সেপ্টেম্বর রাত্রে ‘আজাদ’ আফিস গুণ্ডাদের দ্বারা আক্রান্ত হইল। ফলে ৩রা সেপ্টেম্বর ‘আজাদ’ বাহির হইতে পারিল না। হিন্দু সাংবাদিকরাই উদ্যোগী হইয়া সভা ডাকিলেন। অমৃতবাজার পত্রিকার চিত্তরঞ্জন এভিনিউস্থ সিটি আফিসে সম্পাদকদের এক বৈঠক হইল। প্রায় পঁচিশ জন সম্পাদক বৈঠকে যোগ দিলাম। সর্বসম্মতিক্রমে গুণ্ডাদের নিন্দা করা হইল। নির্বিবাদে আজাদ প্রকাশের সর্ব প্রকার ব্যবস্থা করার জন্য একটি সাব-কমিটি গঠিত হইল। ‘অমৃতবাজারের’ মিঃ তুষারকান্তি ঘোষ, ‘স্টেটসম্যানের মিঃ আয়ান স্টিফেন, স্বরাজের শ্রীযুক্ত সত্যেন মজুমদার, আনন্দবাজারের শ্রীযুক্ত চলাকান্ত ভট্টাচার্য ও ‘ইত্তেহাদের আমি সহ সকল সম্পাদকের স্বাক্ষরে এক আবেদন প্রচার করা হইল। ফলে ‘আজাদ’ নিয়মিত প্রকাশিত হইতে থাকিল। ইতিমধ্যে মহাত্মাজী অনশন-ব্রত গ্রহণ করায় দাঙ্গা প্রশমিত হইল। ৪ঠা সেপ্টেম্বর সুহরাওয়ার্দী সাহেবের হাতে কমলার রস খাইয়া তিনি অনশন ভাঙ্গিলেন। মোটামুটি শান্তি স্থাপিত হইল। ঈদ ও দূর্গাপূজা আসন্ন বলিয়া উভয় পর্ব যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সমাধা হয়, তার জন্য লেখক-সাহিত্যিকদের পক্ষ হইতে মিঃ তারা শংকর বানার্জি, মিঃ পংকজ কুমার মল্লিক ও আমি একটি যুক্ত আবেদন প্রচার করিলাম।
সুহরাওয়ার্দী সাহেবের পাকিস্তানে না যাওয়াটা আমার ভাল লাগিতেছিলনা। আমার বিশ্বাস ছিল, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হিসাবে সুহরাওয়ার্দী সাহেব করাচি গেলে ‘ইত্তেহাদ’ ঢাকায় নেওয়া শুধু সম্ভব হইত না ত্বরানিতও হইত। আজাদ’ ‘মনিং নিউ ইত্যাদি সরকার-সমর্থক কাগযগুলি ঢাকায় নেওয়ার সব ব্যবস্থাই হইয়া গিয়াছে সরকারী সমর্থনে। অথচ ইত্তেহাদ’ ঢাকায় জমি-বাড়ি যোগাড় করিয়াও শুধু বিজলি সরবরাহ ও টেলিপ্রিন্টার স্থাপনাদি ব্যাপারে সরকারী কোনও সহায়তা পাইতেছিল না। বরঞ্চ ‘ব্যান’ করিয়া তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হইতেছিল। আমার ও আমার সহকর্মী সকলের বিশ্বাস ছিল সুহরাওয়ার্দী সাহেব পাকিস্তানে গেলেই এর একটা সুরাহা হইত।
৩. সুহরাওয়ার্দীর সংগত অভিমান
কিন্তু তিনি কেন্দ্রের মন্ত্রিত্ব নিলেন না। কায়েদে-আযম ও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত খাঁর অনুরোধের জবাবে তিনি জানাইলেন ভারতীয় মুসলমানদের একটা হিল্লা না করিয়া তিনি ভারত ছাড়িতে পারেন না। তিনি এ ব্যাপারে কায়েদে-আযমের কাছে যেসব তার ও চিঠি দিয়াছিলেন, আমি তা দেখিয়াছিলাম। তাতে তিনি বলিয়াছিলেন : ‘আপনার সুদক্ষ পরিচালনায় পাকিস্তানের হেফাযত করিবার যোগ্য লোকের অভাব নাই। কারণ মুসলিম লীগের প্রায় সব নেতাই পাকিস্তানে চলিয়া গিয়াছেন। কিন্তু পিছনে-ফেলিয়া-যাওয়া বেচারা ভারতীয় মুসলমানদের হেফাযত করিবার কেউ নাই। আমাকে এদের সেবা করিতে দিন।’ কথাটা খুবই মহৎ। কিন্তু অনেকেই বলিতেন, এটা সুহরাওয়ার্দীর মনের কথা ছিল না। তিনি রাগ করিয়াই পাকিস্তানের মন্ত্রী হইতে অসম্মত হইয়াছিলেন। অপরের মত আমার নিজেরও এই সন্দেহই ছিল। কায়েদে আযম ও লিয়াকত খাঁর উপর রাগ করিবার, অন্ততঃ অভিমান করিবার, অধিকার সুহরাওয়ার্দীর ছিল। সুহরাওয়ার্দীর প্রতি বিরুদ্ধভাব নবাবযাদা লিয়াকতের বরাবরই ছিল। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সুহরাওয়ার্দীর বদলে বাধ্য-অনুগত ভাল মানুষ খাজা নাযিমুদ্দিনকেই তিনি বেশি সমর্থন করিতেন। এসব কথা সুহরাওয়ার্দীর অজানা ছিল না। কিন্তু কায়েদে-আযমও এসব ব্যাপারে পক্ষপাতিত্ব করিবেন, এটা সুহরাওয়ার্দী কিছুতেই বিশ্বাস করিতেন না। কিন্তু দেখা গেল, কায়েদে-আযম-সুহরাওয়ার্দীর হক প্রাপ্য সমর্থনটুকুও তাঁকে দেন না। পাঞ্জাব ও বাংলা দুইটা প্রদেশই ভাগ হইয়াছিল। কিন্তু ভাগ হওয়ার ফলাফল দুই প্রদেশে এক হয় নাই। প্রদেশ ভাগের যুক্তিতে বাংলার মুসলিম লীগ ভাঙ্গিয়া দেওয়া হইল এবং বিভক্ত মুসলিম লীগ পার্টির দ্বারা নয়া লীডার তথা প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ব্যবস্থা হইল। পাঞ্জাবের মুসলিম লীগও অখও রহিল। পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রীও বজায় থাকিলেন। এই এক যাত্রায় ভিন্ন ফলের কারণ সোজাসুজি এই যে বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম লীগ লিয়াকত খাঁর বাধ্য-অনুগত ছিলেন না। লিয়াকত আলী খাঁ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। সবাই তাঁর বাধ্য-অনুগত। এতে কিন্তু তিনি সন্তুষ্ট থাকিলেন না। পূর্ব-বাংলার প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম লীগকেও তাঁর ‘জি হুজুর তাবেদার’ করিতে চাহিলেন করিলেনও তিনি। সুহরাওয়ার্দীকে বাদ দিয়া প্রধানমন্ত্রী পূর্ব-বাংলায় যে তাবেদার জি হুজুর প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম লীগ পার্টি খাড়া করিলেন, তাঁদের ‘তাবেদারি পূর্ব বাংলাকে এবং পরিণামে পাকিস্তানকে কোথায় নিয়াছে, আজকার ইতিহাসই তার সাক্ষ্য দিতেছে এবং ভবিষ্যতেও দিবে।
তারপর সুহরাওয়ার্দীকে ডিংগাইয়া মিঃ ফযলুর রহমান, ডাঃ মালেক প্রভৃতি যাঁদেরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় নেওয়া হইতে লাগিল, তাতেই প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খা ও তাঁর সমর্থক কায়েদে-আযমের মনোভাব সুহরাওয়ার্দীর কাছে সুস্পষ্ট হইয়া গেল। এ অবস্থায় সুহরাওয়ার্দী যদি অভিমান করিয়া থাকেন, তবুও তাকে দোষ দেওয়া যায় না। বরঞ্চ তাঁকে উচ্চ প্রশংসা করিতে হয় এই জন্য যে তিনি কোনও অভিযোগ করিয়া তাঁর অসম্মতি জানান নাই। যুক্তি হিসাবে এক মহৎ আদর্শের কথাই বলিয়াছিলেন : অভিযোগ করাটা তাঁর আত্মসম্মানে বাধিত বলিয়াই তা তিনি করেন নাই।
