কিন্তু আমরা আশ্বাস পাইলাম না। অতঃপর পার্টিশন কাউন্সিলের পরবর্তী সভা ঢাকায় হইল। আমরা কিছুই জানিতে পারিলাম না। সরকারী দলের মুখপত্র ‘আজাদে (২৪শে সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭)-এর খবরটা ছিল এইরূপ: গতকাল (২৪-৯-৪৭) পার্টিশন কাউন্সিলের সভা ঢাকায় হইয়াছে। পূর্ব-বাংলার গভর্নর (সার ফ্রেডারিক বোর্ন) সভাপতিত্ব করিয়াছেন। সম্পত্তি দায় বিভাগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। পরবর্তী সভা হয় কলিকাতায় ৮ই নবেম্বর।
এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যে কি, তা আমরা জানিতে পারি এক মাস পরে ১ই ডিসেম্বর তারিখে। ঐ তারিখে কেন্দ্রীয় পার্টিশন কাউন্সিলের ভারতীয় প্রতিনিধি সর্দার প্যাটেল ভারতীয় গণ-পরিষদে ঘোষণা করিলেন : “সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণের নীতি সম্পর্কে পাকিস্তানের সাথে আমাদের যে বিরোধ ছিল আপোসে তা মিটিয়া গিয়াছে। বুক ভ্যালুতে সম্পত্তির মূল্য নির্ধারণ স্থির হইয়াছে।” ছাত্রনেতা রাজনৈতিক নেতা ও আমরা সকলে চঞ্চল হইয়া উঠিলাম। হামিদুল হক চৌধুরী সাহেবের বেনিয়াপুকুর রোডের বাড়িতে তাঁদের ভিড় হইল। কেমন করিয়া এটা হইল? আমাদের পক্ষে বুক ভ্যালুতে কে রাজি হইলেন? এখন আমাদের তেত্রিশ কোটি টাকা পাওয়ার কি হইবে? তিনি আমাদের মতই অবতা প্রকাশ ও হায়-আফসোস করিলেন। তিনি শীঘ্রই প্রধানন্ত্রী খাজা নাযিমূদ্দিন, কেন্দ্রীয় পার্টিশন কাউন্সিলে আমাদের প্রতিনিধি চৌধুরী মোহাম্মদ আলী ও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করিয়া যা হয় একটা ব্যবস্থা করিবেন বলিয়া সকলকে আশ্বাস দিয়া বিদায় করিলেন।
বেশ কিছুদিন পরে হামিদুল হক সাহেব এক বিবৃতিতে ঘোষণা করিলেন। হিসাবের হেরফেরে আমরা তেত্রিশ কোটি পাইলাম না বটে তবে ওজেবাদ করিয়াই আমরা পশ্চিম বাংলা ও ভারত সরকারের নিকট হইতে নেট নয় কোটি পাইব। সকলে ছাতি পিটিয়া হায়-হায় করিলাম। কোথায় তেত্রিশ কোটি? আর কোথায় নয় কোটি? কিন্তু আমাদের ছাতি পেটার বেদনার উপশম হইবার আগেই আবার মাথায় হাত মারিবার দরকার হইল। কারণ মিঃ হামিদুল হক চৌধুরীর কথাটা মাটিতে পড়িবার আগেই মিঃ নলিনী রঞ্জন সরকার এক বিবৃতি দিলেন। তিনি হিসাব-নিকাশ করিয়া দেখাইলেন যে সব হিসাব করিয়া ভারত ও পশ্চিম বাংলার কাছে পূর্ব-বাংলার পাওনা হইয়াছে মোট তিন কোটি, আর পূর্ব-বাংলার কাছে ভারত ও পশ্চিম বাংলার পাওনা হইয়াছে নয় কোটি। পূর্ব-বাংলা আগে পশ্চিম বাংলা ও ভারতের নয় কোটি শোধ করিবে। তারপর তার পাওনা তিন কোটি টাকা পাইবে। অর্থাৎ ওজেবাদ করিয়া শেষ পর্যন্ত পূর্ব-বাংলার, পাওনা নয়, দেনা থাকিল ছয় কোটি। হায় কপালতেত্রিশ কোটি যোগের বদলে ছয় কোটি বিয়োগ। নলিনীবাবুর এই ঘোষণায় মিঃ হামিদুল হক চৌধুরী কেন মূৰ্ছা গেলেন না, আমরাই বা বাঁচিয়া থাকিলাম কিরূপে, আমি আজিও তা বুঝি নাই। বোধ হয় এই সানায় যে শুধু রেডক্লিফ একা আমাদেরে ঠকাইতে পারেন নাই; আমরা সকলে মিলিয়াই আমাদেরে ঠকাইয়াছি। তার উপর সত্য যুগ কলি যুগ হইয়াছে। সত্য যুগে ছিল ‘শুভংকরের ফাঁকি, তেত্রিশথনে থনে তিনশ গেলে তিরিশ থাকে বাকী’; আর কলিযুগে : ‘শুভংকরের ফাঁকি, তেত্রিশথনে থনে শূন্য গেলে দেনা থাকে বাকী।‘
১৫. কলিকাতায় শেষ দিনগুলি
কলিকাতায় শেষ দিনগুলি
পনরই অধ্যায়
১. আলীপুরের বন্ধুরা
১৯৪৭ সালের শেষ দিক হইতে ১৯৫০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত পৌনে তিন বছর রাজনীতির সাথে আমার কোনও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না। ‘ইত্তেহাদের সম্পাদনা উপলক্ষে আমাকে কলিকাতায় থাকিতে হইয়াছিল। শহীদ সাহেবের উপর নাযিমুদ্দীন মন্ত্রিসভার বিরূপ ভাব ছিল। তাঁরা নানা অজুহাতে ‘ইত্তেহাদ’ ঢাকায় আনার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিলেন। অধিকন্তু একাধিকবার ব্যান’ করিয়া ‘ইত্তেহাদ’কে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত করিলেন। পক্ষান্তব্রে শহীদ সাহেব বহু মুসলিম-লীগ কর্মী, ছাত্র নেতা ও এম, এল, এ.-র পুনঃপুনঃ অনুরোধ সত্ত্বেও ঢাকায় আসিলেন না। ওদিকে কায়েদে-আযম ও লিয়াকত খাঁর পুনঃ অনুরোধেও তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও মন্ত্রিত্ব গ্রহণে রাখী হইলেন না। কাজেই আমাদের নেতা শহীদ সাহেবের মতই এবং সাথেই আমরা কোনমতে কলিকাতায় দিন কাটাইতে লাগিলাম। কোনমতে বলিলে ঠিক বলা হইবে না। পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করিয়া পাকিস্তান হাসিল করিয়া তার পরেও পাকিস্তানী হিসাবে হিন্দুস্থানে থাকাটাকে নিতান্ত বিবেচনার কাজ দাবি করা যাইতে পারে না। তবু এই সময়ে পশ্চিম বাংলা সরকার ও পশ্চিম বাংলার সুধী সমাজ সাধারণভাবে এবং সাংবাদিকরা বিশেষভাবে আমাদের সাথে যে ভদ্র ব্যবহার করিয়াছিলেন তার দৃষ্টান্ত বিরল। মুসলিম লীগের প্রচার-সম্পাদক হিসাবে আমার লিখিত ও সম্পাদিত প্রচার-পুস্তিকায় অন্যান্য স্থানের মতই আলীপুর কোট এলাকা ভরিয়া গিয়াছিল। এই কারণে ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রতি আলীপুরের উকিল ব্যারিস্টাররা খুবই বিক্ষুব্ধ থাকার কথা। ঝগড়া-গগাছের গরম তর্ক-বিতর্ক তাঁদের সাথে আমার অনেক হইয়াছে। এ অবস্থায় পাকিস্তান হাসিলের পর আমাকে আলীপুরে ওকালতি করিতে দেখিয়া তাঁরা অনেকেই নিশ্চয়ই বিস্মিত হইয়াছিলেন। কেউ-কেউ নিশ্চয়ই চটিয়া গিয়াছিলেন। তা সত্ত্বেও বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্ব নষ্ট হয় নাই। তাঁরা আগের মতই হাসিমুখে একদিন বলিলেন : ‘এখনও এখানে আছ যে? পাকিস্তান চেয়েছিলে, পাকিস্তান পেয়েছ। তবে আর এখানে বসে আছ কেন?’ আমিও বরাবরের মত হাসিমুখে বলিলাম তোমরা হিন্দুরা বড় চালাক। আমিন বাধ্য কৈরা বাঁটোয়ারার ছাহামে আমাদেরে ঠকাইছ। বাংগালরে তোমরা হাইকোর্ট দেখাইছ। ফলে আমাদের ভাগে জমি কম পড়ছে। কাজেই আরো কিছু জমি খাবার মতলবে আমরা জনকতক এখানে কিছুদিন থাকব ঠিক করছি। সকলে হো-হহ করিয়া উচ্চস্বরে হাসিয়া উঠিলেন। রসিকতা করিবার ও বুঝিবার সময় ওটা ছিল না। তবু আমি রসিকতা করিলাম। হিন্দু বন্ধুরা তার রস গ্রহণ করিলেন। এসব ব্যাপারে হিন্দু-মনের উদারতার তুলনা নাই।
