৮. মার্কেট ভ্যালু বনাম বুক ভ্যালু
আমি বুঝিলাম, সকলেই বুঝিলেন, কলিকাতা আমরা হারাইয়াছি। কাজেই তখন বিজয়ী খাজা-গ্রুপের বন্ধুদের বলিলাম : ‘আপনাদের কথামতই কলিকাতা ছাড়িয়া দিলাম। এইবার তেত্রিশ কোটি টাকাটা আদায়ের ব্যবস্থা করুন।‘ নেতারা এ-বিষয়ে নিশ্চিত থাকিতে আমাকে আশ্বাস দিলেন। বুঝা গেল, অতঃপর বাটোয়ারা কাউন্সিলের উপর সব নির্ভর করিতেছে। প্রাদেশিক বাটোয়ারা কাউন্সিলে তখন গবর্নর চেয়ারম্যান, পশ্চিম বাংলার পক্ষে নলিনী সরকার ও ধীরেন মুখার্জী; পূর্ব-বাংলার পক্ষে খাজা নাষিমুদ্দিন ও শহীদ সুহরাওয়ার্দী। কেন্দ্রীয় পার্টিশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ছিলেন বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন। ভারতের পক্ষে সর্দার প্যাটেল ও মিঃ এইচ. এম. প্যাটেল এবং পাকিস্তানের পক্ষে লিয়াকত আলি খাঁ ও চৌধুরী মোহাম্মদ আলি। চারটি ব্যাপারে প্রাদেশিক পার্টিশন কাউন্সিল একমত হইতে না পারায় নিয়ম অনুসারে ঐ চারটি বিষয় কেন্দ্রীয় পার্টিশন কাউন্সিলে পাঠান হয়। ঐ চারটি বিষয়ের মধ্যে সরকারী বাড়ি-ঘরের মূল্য-নির্ধারণের নীতিই ছিল প্রধান। পূর্ব বাংলার প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে বর্তমান বাজার মূল্যে মোর্কেট ভ্যালু) সরকারী বাড়ি-ঘরের দাম হিসাব করিতে হইবে। পক্ষান্তরে পশ্চিম বাংলার প্রতিনিধিরা দাবি করেন যে আদি মূল্যে বুক ভ্যালু) ও-সবের দাম ধরিতে হইবে। প্রাদেশিক পার্টিশন কাউন্সিলে পূর্ব বাংলার বিশেষজ্ঞ উপদেষ্টা ছিলেন রেভিনিউ সেক্রেটারি ও পার্টিশন কাউন্সিলের অন্যতম সেক্রেটারি খান বাহাদুর মহবুবুদ্দিন আহমদ ও তৎকালীন সুপার ইঞ্জিনিয়ার {পরে চীফ ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার সাহেব। ‘ইত্তেহাদ’ আফিসে আমার রুমে ইহাদের প্রায়ই বৈঠক হইত। ইহাদের উপদেশ মতই আমি এই ব্যাপারে সম্পাদকীয় লিখিতাম এবং সংবাদ প্রকাশ করিতাম। এঁদের সংগে আলোচনা করিয়াই আমি সরকারী সম্পত্তি বন্টনে মার্কেট ভ্যালু ও বুক ভ্যালুর তাৎপর্য বুঝিতে পারি। মার্কেট ভ্যালুটা সকলেই বুঝেন। শহরে-বন্দরে বিশেষতঃ কলিকাতায় জমি ও বাড়ি-ঘর ইত্যাদি স্থাবর সম্পত্তির দাম আগের চেয়ে শত-সহস্রগুণ যে বাড়িয়া গিয়াছে এটা সুস্পষ্ট। কিন্তু বুক ভ্যালু বা আদি দাম যে খরিদ-দাম বা নির্মাণ-মূল্যও নয়, তারও কম, একথা সকলের বুঝিবার কথা নয়। উক্ত বিশেষজ্ঞদ্বয়ের নিকট হইতে আমি জানিতে পারি যে সরকারী হিসাব-মতে প্রথম শ্রেণীর ইমারতসমূহের দাম প্রতি বছর শতকরা একটাকা করিয়া কমিয়া যায়। আর দ্বিতীয় শ্রেণীর ইমরাতসমূহ কমে প্রতিবছর শতকরা দুইটাকা। মেশিনাদি-সরঞ্জামের ডিপ্রিসিয়েশন ও উয়ার এও টিয়ার যে নীতিতে ধরা হয়, বাড়ি-ঘরের ডিপ্রিসিয়েশনও সেই নীতিতেই ধরা হয়। ফলে কলিকাতার সরকারী বাড়ি-ঘর ইত্যাদি স্থাবর সম্পত্তির কোনটা একশ বছরে আর কোনটা পঞ্চাশ বছরে মূল্যহীন যিরোতে পরিণত হইয়াছে। এ কথার অর্থ এই যে কলিকাতার সরকারী বাড়ি-ঘর ভারত ও পশ্চিম বাংলা যিরো’ মূল্যে পাইবে। এইজন্য পশ্চিম বাংলা ও ভারতের প্রতিনিধিরা ‘বুক ভ্যালুর উপর অত জোর দিতেছিলেন। পক্ষান্তরে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধিরা মার্কেট ভ্যালু দাবি করিতেছিলেন।
৯. পার্টিশন কাউন্সিলের ভূমিকা
খাজা নাযিমূদ্দিন শহীদ সাহেবকে পরাজিত করিয়া মুসলিম লীগ পার্টির লীডার হল ৫ই আগস্ট তারিখে। তার মানে তিনিই পূর্ব-বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী হইয়াই অক্টোবর মাসের শেষ দিকে তিনি সুহরাওয়ার্দী সাহেবের স্থলে হামিদুল হক চৌধুরী সাহেবকে পার্টিশন কাউন্সিলের মেম্বর করেন। কাজেই ঐ সময় হইতে এ ব্যাপারের দেন-দরবার ও পরামর্শ আমি শহীদ সাহেবের বদলে হামিদুল হক চৌধুরী সাহেবের সহিতই করিতাম। আমার জ্ঞানবুদ্ধিমত পরামও তাঁকেই দিতাম। আমি দেখিয়া খুশী ও নিশ্চিত হইলাম যে শহীদ সাহেবের মতই চৌধুরী সাহেবও বুক ভ্যাল ও মার্কেট ভ্যালুর তাৎপর্য বুঝেন এবং পূর্ব-বাংলার আর্থিক জীবনে এই প্রশ্নের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। ইতিপূর্বে তিনি তেত্রিশ কোটি টাকা পাওয়ার যে আশায় কলিকাতা ত্যাগে আমাদেরে রাযী করিয়াছিলেন, মার্কেট ভ্যালু ছাড়া সে টাকা যে পাওয়া যাইবে না, সেটাও তিনি বুঝিতেছিলেন। সুতরাং এদিক হইতে আমি আশ্বস্ত হইলাম। কিন্তু কেন্দ্রীয় পার্টিশন কাউন্সিলে বাংলার কোন প্রতিনিধি না থাকায় এ ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকিবার পরামর্শ আমরা ও অফিসাররা সকলেই এক বাক্যে দিতে থাকিলাম। এ বিষয়ে অতিরিক্ত সাবধানতার দরকার এইজন্য যে শুধু পশ্চিম বাংলা ও ভারত যে কলিকাতার সম্পত্তির বুক ভ্যালু দেওয়ার পক্ষপাতী, তা নয়। কেন্দ্রীয় পশ্চিম পাকিস্তানীরাও বুক ভ্যালুর পক্ষপাতী। কারণ লাহোর করাচি পেশওয়ার কোয়েটা ইত্যাদি স্থানের সরকারী দালান-ইমারত ও স্থাবর সম্পত্তির বাজার মূল্য অনেক হইবে এবং সে মূল্য পশ্চিম পাঞ্জাব সরকার ও কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকার ভারত সরকার ও পূর্ব পাঞ্জাব সরকারকে দিতে বাধ্য থাকিবেন। অথচ চুক্তি অনুসারে কলিকাতার সম্পত্তির দামটা পাইবে পূর্ব-বাংলা সরকার। কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকার এর এক পয়সাও পাইবেন না। মুসলিম বাংলার স্বার্থ সম্পর্কে অতীতের নিখিল ভারতীয় মুসলিম নেতৃত্ব যেরূপ ব্যবহার করিয়াছেন, তাতে কলিকাতা ভারতকে বিনামূল্যে দিয়া তার বদলা লাহোরা বিনামূল্যে পাইতে তাঁদের বিবেকে একটুকুও বাধিবে না। এ সব কথা উক্ত অফিসারদ্বয় ও আমরা অনেকেই নেতৃবৃন্দকে বিশেষতঃ চৌধুরী হামিদুল হক সাহেবকে বুঝাইলাম। তিনি আমাদিগকে নিশ্চিন্ত থাকিতে আশ্বাস দিলেন।
