(২) ১৯৪৬ সালে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ইলেকশনে জয়লাভ করিবার পর নাহোর-প্রস্তাবকে বাঁকা পথে আমূল পরিবর্তন করিয়াছিলেন নির্বাচিত মেম্বাররা দিল্লীর লেজিসলেটার্স কনভেনশনে। এই পরিবর্তনের চেয়ে পরিবর্তনের পন্থাটাই আমার চিন্তার কারণহইয়াছিল বেশি।
(৩) বাংলা বিভাগের সময় বাংলার মুসলমানের স্বার্থের চেয়ে গোটা পাকিস্তানের স্বার্থের দিকে বেশি নযর রাখা হইয়াছিল। গোটা পাকিস্তান’ অর্থ ছিল কার্যতঃ পশ্চিম পাকিস্তান।
এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে শেষ বিষয়টি সম্বন্ধেই আমার অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ ও ব্যক্তিগত। তাই আমি এখানে ঐ সম্বন্ধে কয়েকটি কথা বলিব। ভবিষ্যতের ইতিহাস লেখকদের জন্য এইসব ছোট-খাট ঘটনাও প্রয়োজনীয় হইতে পারে।
৭. কলিকাতার দাবি
দেশ বিভাগে রেডক্লিফ পাকিস্তানের প্রতি যতই অন্যায় করিয়া থাকুন কেন, কলিকাতার উপর পাকিস্তানের দাবি অগ্রাহ্য করা সহজ ছিল না। এটা সহজ করিয়া দিলেন স্বয়ং লীগ নেতৃত্ব ১৯৪৪ সালের ৩রা জুন ন্যাশন্যাল পার্টিশন বা আন্দাযী বিভাগ ঘোষণার সাত দিনের মধ্যেই স্বয়ং সূহরাওয়ার্দী গভর্ণমেন্টই ঢাকাকে পূর্ব বাংলার রাজধানী ঘোষণা করিয়াছিলেন। ঢাকা শহরের চার দিকের কুড়ি মাইল এলাকা রিকুইযিশন করিয়া কলিকাতা গেযেটে নোটিফিকেশনও জারি করিয়াছিলেন। তথাপি সার নাফিমুদ্দিনের দলের সন্দেহ তাতে ঘুচে নাই। তাঁদের মনে তখনও সন্দেহ ছিল যে কলিকাতা পাকিস্তানের ভাগে পড়িলে পূর্ব-বাংলার রাজধানী কলিকাতাতেই থাকিয়া যাইবে। এটা স্পষ্টতঃই তাঁদের ভিত্তিহীন সন্দেহ। কারণ কলিকাতা পূর্ব বাংলার ভাগে পড়িলেও উহাকে রাজধানী রাখা উচিৎ হইত না। পূর্ব-বাংলার গণপ্রতিনিধিরা তা করিতেনও না। কিন্তু মুসলিম লীগের খাজা-নেতৃত্ব এ ব্যাপারে অতি মাত্রায় ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। সে জন্য ৫ই আগস্ট সুহরাওয়ার্দী সাহেবকে হারাইয়া সার নাযিমুদ্দিন নেতা নির্বাচিত হইবার পরদিন হইতেই ‘কলিকাতা রক্ষার আন্দোলন একদম মন্দীভূত হইয়া গেল। বংগীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ও মুসলিম ছাত্রলীগ যুক্তভাবে তখন ‘কিপ ক্যালকাটা’ আন্দোলন চালাইতেছিল। সবগুলি মুসলিম সংবাদপত্রই আমরা প্রতিদিন বিভিন্ন ম্যাপ চার্ট ও স্ট্যাটিসটিকস দিয়া কলিকাতা পূর্ব বাংলায় থাকার যুক্তি দিতেছিলাম। মুসলিম ছাত্রলীগ মিছিল ও জনসভা করিতেছিল। হক সাহেব পর্যন্ত এই আন্দোলনে নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন। বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী ও বেংগল পার্টিশন কাউন্সিলের মেম্বর সুহরাওয়ার্দী সাহেব দার্জিলিং-এ গভর্নর সার আর, জি, ক্যাসি সাহেবের সহিত আলোচনা করিয়া আমাদের এইরূপ আভাস দেন। চরিশ পরগণার বারাকপুর, বারাসত, তাগর-ও বশিরহাট পূর্ব-বাংলার ভাগে ফেলিয়া এবং কলিকাতা ও দার্জিলিং উতয় শহরকে উভয় বাংলার কমন শহর ঘোষণা করিয়া বাংলা বাটোয়ারা করিতে গবর্নর রাযী হইয়াছেন এবং সেই মতে ঊর্ধ্বতন মহলে প্রভাব বিস্তার করিবার দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছেন। গবর্নর কলিকাতাকে পূর্ব বাংলার অংশে ফেলিবার জোর আন্দোলন চালাইয়া যাইতেও সুহরাওয়ার্দী সাহেবকে উপদেশ দিয়াছিলেন। সুহরাওয়ার্দী সাহেবের নিকট হইতে এইরূপ আশ্বাস পাইয়া আমরা ‘কলিকাতা রাখ’ আন্দোলন আরও জোরদার করি। বৃদ্ধ হক সাহেব পর্যন্ত এই আন্দোলনে আমাদের সাথে নামিয়া আসেন। কিন্তু কিছুদিন যাইতে-না-যাইতেই আমরা লীগ-নেতাদের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করিলাম। হক সাহেব ও শহীদ সাহেব প্রকাশ্যভাবে কলিকাতা রাখার আন্দোলন সমর্থন করিতেছিলেন। কিন্তু দেখা দেখা গেল কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ বাউণ্ডারি কমিশনের সামনে হক সাহেব ও শহীদ সাহেবকে সওয়াল-জওয়াব করিতে না দিয়া যুক্ত প্রদেশের মিঃ ওয়াসিমকে উকিল নিযুক্ত করিলেন এবং জনাব হামিদুল হককে তাঁর সহকারী করিলেন। মুসলিম লীগের অনেকে ও ছাত্রলীগের সকলেই এই ব্যবস্থার প্রতিবাদ করিলেন। হক সাহেব খবরের কাগযে বিবৃতি দিলেন। কিন্তু তাতে কোন কাজ হইল না। এমন সময়ে খাজা নাফিমুদ্দিন সাহেব নেতা নিযুক্ত হইবার পরদিন হইতেই প্রকাশ্যভাবে উল্টা বাতাস বহিতে লাগিল। পূর্ব-বাংলার এবং খাজা-গ্রুপের অনেক নেতা একাধিক দিন ‘ইত্তেহাদ’ অফিসে আমার সাথে সাক্ষাৎ করিয়া কলিকাতা রাখার আন্দোলন বন্ধ করিতে অনুরোধ করিলেন। কলিকাতা ছাড়িয়া দেওয়ার অসংখ্য লাভ ও সুবিধা সম্পর্কে অনেক যুক্তি-তর্ক দিলেন। তাঁদের যুক্তিগুলির মধ্যে একটি বড় যুক্তি এই ছিল যে কলিকাতা ছাড়িয়া দিলে সমস্ত দায়শোধ করিয়াও পূর্ব বাংলা নগদ তেত্রিশ কোটি টাকা পাইবে। এই টাকা দিয়া আমরা পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকা শহরকে নিউইয়র্ক শহর করিয়া ফেলিতে পারিব। বক্তারা খাজা নাযিমুদ্দিন ও চৌধুরী হামিদুল হক সাহেবের বরাত দিয়া এই হিসাবের অংক আমার সামনে পেশ করিলেন। আমি যদিও তাদের যুক্তি মানিলাম না, তথাপি তাঁদের-দেওয়া এই আর্থিক যুক্তিটা আমার কলিকাতা রাখার উৎসাহে কিছুটা পানি ঢালিতে সমর্থ হইল। তারপর ‘আজাদ’ ‘স্টার-অব-ইণ্ডিয়া ‘মনিং নিউয’ ইত্যাদি খাজা-সমর্থক কাগযগুলি আস্তে-আস্তে ‘কলিকাতা রাখ আন্দোলন হইতে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিলেন। তাঁরা এইরূপ উদার নীতিকথা বলিতে লাগিলেনঃ “আমরা যাই বলি না কেন এটা স্বীকার করিতেই হইবে যে কলিকাতা হিন্দু-প্রধান স্থান। আমরা মুসলমানরা এখানে মাইনরিটি একথা ত আর অস্বীকার করা যায় না। মেজরিটিকে উৎখাত করিয়া মাইনরিটি আমরা কলিকাতা রাখিতে চাই না। এটা গণবিরোধী হইবে। তাছাড়া হিংস্র উপায়ে আমরা কলিকাতা রাখার পক্ষপাতী নই।” গত দুইমাস ধরিয়া যাঁদের কলমের মুখে কলিকাতার দাবিতে অগ্নিস্ফুলিংগ বিচ্ছুরিত হইতেছিল, খাজা নাযিমূদ্দিন নেতা নির্বাচিত হওয়ার তিন দিনের মধ্যেই তাদের মুখেই অহিংসার বাণী ও মেজরিটি-মাইনরিটির যুক্তি শোনা যাইতে লাগিল। এক ইত্তেহাদেই আমরা কলিকাতার কথা বলিয়া যাইতে থাকিলাম। খাজা-গ্রুপের কলিকাতার হিন্দু মেজরিটির যুক্তি মানিয়া লইলে ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা প্রভৃতি জিলা শহরের, বস্তুতঃ পূর্ব-বাংলার অধিকাংশ জিলা নগরের হিন্দু মেজরিটির যুক্তিও স্বতঃই আসিয়া পড়ে। এসব কথাও বলিতে লাগিলাম। কিন্তু কে শুনে কার কথা?
