৬. পার্টিশনে অবিচার
১৯৪৭ সাল হইতে ১৯৫০ সাল এই তিনটি বছর সক্রিয় রাজনীতির সংগে আমার সব বিশেষ ছিল না। ইত্তেহাদের সম্পাদক হিসাবে আমার সাথে রাজনীতিকরা মাঝে-মাঝে যতটুক পরামর্শ করিতেন এবং আমি সম্পাদকীয় প্রবন্ধাবলীতে যতটুক অতিমত প্রকাশ করিতাম, সেই টুকুকেই আমার রাজনীতি বলা যাইতে পারে। তবে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে মশগুল না থাকার দরুন এই মুহূর্তে দর্শক ও বিচারক হিসাবে আমার যোগ্যতা অনেক বেশি করিয়া বাড়িয়া ছিল, নিতান্ত বিনয়ের সাথে এ দাবি আমি করিতে পারি।
পরবর্তীকালে বিদেশী ও নিরপেক্ষ লোকদের অনেকেই স্বীকার করিয়াছেন, পার্টিশনে পাকিস্তানের উপর অবিচার করা হইয়াছে। রেফারেন্ডামে বিপুল মেজরিটি পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেওয়া সত্ত্বেও সিলেটের করিমগঞ্জ ভারতের ভাগে ফেলা, সমস্ত গৃহীত মূলনীতির বরখেলাফে পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জিলা ভারতের ভাগে ফেলা, সুস্পষ্টতই ইচ্ছাকৃত পক্ষপাতমূলক অবিচার। কাশ্মীর ও ত্রিপুরার সাথে ভারতের কন্টিগিউটি রক্ষার অসাধু উদ্দেশ্যেই এ সব কাজ করা হইয়াছিল। কৈফিয়ৎ স্বরূপ বলা য়ু কায়েদে-আযম লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে পাকিস্তানের প্রথম বড়লাট না করিয়া নিজেই বড়লাট হইয়া পড়ায় পাকিস্তানের উপর রাগ করিয়াই মাউন্টব্যাটেন ব্রেডক্লিফকে দিয়া এসব অবিচার করাইয়াছেন। জিন্না সাহেব বড়লাট হইবার ব্যক্তিগত লোভটা সংবরণ করিতে পারিলে পাকিস্তানের উপর মাউন্টব্যাটেন অত অবিচার করিনো। চাই কি কিছু সুযোগ-সুবিধাও করিয়া দিতেন।
যে কারণেই হউক পাকিস্তানের উপর অবিচার যে ইচ্ছাকৃতভাবে করা হইয়াছিল, এটা আজ সুস্পষ্ট এবং সাধারণভাবে স্বীকৃত। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান টিকিবে না, কাজেই এসব অবিচার কালের বিচারে মূল্যহীন হইয়া যাইবে, এই ধারণা হইতেই ঐসব পক্ষপাতমূলক বিচার করা হইয়াছিল। সেসব অবিচারের ধরন ও পরিমাণ এমন ছিল যে পাকিস্তানের পরিমাণ বিলুপ্তি ত্বরান্বিত করাই স্বাভাবিক ছিল। এ অবস্থায় অত সব প্রতিকুলতা কাটাইয়া পাকিস্তান যে বাঁচিয়া আছে এটাই একটা বিষয়ক ব্যাপার। আমাদের বরাত গুণ।
তবে পাকিস্তান হাসিলের বিজয়োল্লাসের প্রাথমিক উচ্ছ্বাসের মধ্যে উপরের তলার নেতারা কি নিচের তলার কর্মীরা আমরা এ সব কথায় তত গুরুত্ব দেই নাই আনন্দে বিঘু হইবে ভয়ে। কিন্তু এত উল্লাসের মধ্যেও দুইটা ব্যাপারে আমি স্তম্ভিত না হইয়া পারি নাই। একটি রাজনৈতিক আদর্শের কথা। অপরটি পূর্ব বাংলার অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের কথা। অবশ্য দুইটার জন্যই আমি মনে-মনে কায়েদে-আযমকেই দায়ী করিয়াছিলাম। কিন্তু আদর্শের ব্যাপারটা এককভাবে কায়েদে-আযমের নিজের কাজ। জিন্ন সাহেবের রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা ও গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদে আমার পূর্ণ আস্থা ছিল। তিনি কোনও অন্যায় অগণতান্ত্রিক বেকায়দা কথা বলিলে বা কাজ করিলে আমি মনে খুবই ব্যথা পাইতাম। পাকিস্তান হওয়ার পরে-পরেই এমন কথা তিনি দুইটি বলিয়াছিলেন : প্রথমটি এই : পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসাবে দায়িত্ব . গ্রহণের জন্য দিল্লী হইতে করাচি রওয়ানা হওয়ার সময় তিনি বলিয়াছিলেন : “আমি ভারতের নাগরিক হিসাবে পাকিস্তানে যাইতেছি। পাকিস্তানের জনগণ আমাকে তাদের সেবা করার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করায় আমি তাদের সেবা করিতে যাইতেছি। নৃর্ড মাউন্টব্যাটেন বৃটিশ নাগরিক হইয়াও যেমন ভারতবাসীর সেবা করিতেছেন, আমিও ঠিক তেমনি করিতে যাইতেছি।”
কথাটা শোনা মাত্র আমার মনে ব্যথার যে কাঁটা ফুটিয়াছিল, সে টাটানি আজো সারে নাই। প্রথমতঃ এটা কোনও জরুরী শাসনতান্ত্রিক কথা ছিল না। একথা বলার কোনও দরুকারই ছিল না। দ্বিতীয়তঃ বিদেশী হিসাবে আমাদের গভর্নর-জেনারেল হইয়া আমাদের সেবা করিতে আসিতেছেন এটা কোনও গৌরবের কথা ছিল না, আমাদের দিক হইতে ত নয়ই, তাঁর নিজের দিক হইতেও না। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সংগে নিজের তুলনা করিয়া তিনি কি আনন্দ পাইলেন তা আমি আজও বুঝি নাই। তিনি ছিলেন নয়া রাষ্ট্র পাকিস্তানের স্রষ্টা ও পাকিস্তানী জাতির পিতা। পক্ষান্তরে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ছিলেন মুমূর্ষ বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের শেষ প্রতীক।
কায়েদে আযমের আর যে কথাটি আমাকে পীড়া দিয়াছিল, তা বাংলাভাষা সম্পর্কে তাঁর ঢাকার বক্ততা। পঁচিশ বছর ধরিয়া জিন্ন সাহেবকে চিনিতাম। এই পঁচিশ বছরের মধ্যে মাত্র পাঁচ বছর তাঁর বিরোধী ছিলাম। বাকী কুড়ি বছরই তাঁর সমর্থক ছিলাম। তাঁর মুখে এমন গুরুতর ব্যাপারে এমন অবিবেচকের কথা আশা করি নাই। তিনি বাংলা বা উর্দু কোনও ভাষাই জানিতেন না। তবে এটা তিনি জানিতেন যে বাংলা অধিকাংশ পাকিস্তানীর মাতৃভাষা। আর জানিতেন তিনি গণতন্ত্র মাতৃভাষার তাৎপর্য। কাজেই কায়েদ-আযমের মুখে মাত্র একবারের মত ঐ গণতন্ত্রবিরোধী কথার মানে আমি আজও উপলব্ধি করি নাই।
পরপর তিনটি ঘটনা আমাকে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ভাবাইয়া তুলিয়াছিল। (১) ১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে মুসলিম লীগ যখন কেন্দ্রীয় সরকারে যোগদান করে, তখন জিন্না সাহেব মুসলিম বাংলার কোনও প্রতিনিধিকে মন্ত্রী করেন নাই। জিনা-নেতৃত্বে মুসলিম-বাংলার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তখন হইতেই আমার দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। বন্ধুদের কাছে আমার দুশ্চিন্তার কথা বলিয়াছিলাম। ১৯১১ সালে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ সম্পর্কে নিখিল ভারতীয় মুসলিম নেতৃত্বের মনোভাব ও ১৯১৬ সালের লাখনৌ প্যাকটে বাংলার মুসলিম মেজরিটিকে চিরতরে কোরবানি করিবার ইতিহাসের নফিরও উল্লেখ করিয়াছিলাম কিন্তু অনেক বন্ধুই আমার ঐ সন্দেহকে নব-দীক্ষিতের ইমানের কমজোরি বলিয়া উড়াইয়া দিয়াছিলেন।
