সত্যই এই সময় কলিকাতার বেশিরভাগ মানুষ তাদের মনুষ্যত্ব-বোধ হারাইয়া ফেলিয়াছিল বলিয়া মনে হয়। একটা সংক্রামক ফ্রেবিতে যেন সবাই সমবেতভাবে উন্মত্ত হইয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু এই সামগ্রিক উন্মত্ততার মধ্যেও দু-একটা সাহসিক মানবিকতার দৃষ্টান্ত মহত্ত্বের উজ্জ্বলতায় ঝলমল করিতেছে। হিন্দু এলাকায় উত্ত জনতা-বেষ্টিত মুসলমান পরিবারকে রক্ষার জন্য হিন্দু নারী-পুরুষের বীরত্ব এবং মুসলিম এলাকায় ঐ অবস্থায় পতিত হিন্দু পরিবার রক্ষায় মুসলিম নারী-পুরুষের বীরত্ব ইতিহাসে সোনার হরফে লেখা থাকার যোগ্য।
এই সাম্প্রদায়িক দাংগার প্রাথমিক দায়িত্ব সম্পর্কে অনেকে অনেক কথা বলিয়াছেন। স্বাভাবিক কারণেই তার অধিকাংশই পক্ষপাতদুষ্ট। প্রত্যক্ষদশী হিসাবে আমার নিজের বিবেচনায় এর প্রাথমিক দায়িত্ব মুসলিম লীগ-নেতৃত্বের। বড়লাট লর্ড ওয়াভেলের পক্ষপাতদুষ্ট কাজকে ‘ডাবলক্রসিং’ আখ্যাদিয়া যেদিন কায়েদে-আযম লীগ ওয়ার্কিং কমিটিতে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের প্রস্তাব গ্রহণ করিয়াছিলেন, সেদিন আমি সর্বাপেক্ষা বেশি আনন্দিত হইয়াছিলাম। বহুঁকাল কংগ্রেসের সেবা করিয়া আমি ও আমার মত অনেকেই নিয়মতান্ত্রিক দেন-দরবারের রাজনীতি অপেক্ষা সংগ্রামের পন্থার প্রতিই অধিকতর বিশ্বাসী হইয়াছিলাম। কংগ্রেস ছাড়িয়া মুসলিম লীগে যোগ দিবার সময়ও ঐ সংগ্রামী মনোভাব ফেলিয়া আসিতে পারি নাই। মুসলিম লীগ কোনদিন সংগ্রামের পথে যাইবে না, কংগ্রেসী বন্ধুদের এই ধরনের চ্যালেঞ্জের উপযুক্ত জবাব দিতে না পারিয়া অনেক সময় লজ্জা পাইতাম। এইবার তাঁদেরে বলিতে পারিলাম? কেমন, হইল ত? ধরিয়া দিলাম প্রত্যেক সংগ্রামে নবাগত মুসলিম লীগ নেতৃত্ব কিছুকাল ট্রেনিং লইবেন। আমরা সাবেক কংগ্রেসীদের মর্যাদা একটু বাড়িবে। কিন্তু ও মা! কায়েদে-আযম ১৬ই আগস্ট প্রত্যক্ষ সংগ্রাম-দিবস ঘোষণা করিয়া দিলেন। কিন্তু কোনও কার্যক্রম ঘোষণা করিলেন না। তবে একথা তিনি বলিয়াছিলেন : আজ হইতে মুসলিম লীগ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথ ত্যাগ করিল। আমরা ধরিয়া নিলাম সভা-সমিতিতে হুমকি দিয়া উত্তেজনাপূর্ণ প্রস্তাবাদি পাস হইবে। আমার অনেক হিন্দু বন্ধুর সাথে আলাপ করিয়া বুঝিয়াছিলাম হিন্দুরাও তাই ধরিয়া নিয়াছিল।
কিন্তু দুইটা ঘটনা হিন্দু-মনে স্বভাবতঃই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করিল। এক, খাজা নাযিমুদ্দিন সাহেব ঘোষণা করিলেন। আমাদের সংগ্রাম ভারত সরকারের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দুদের বিরুদ্ধে। দুই, প্রধানমন্ত্রী শহীদ সাহেবের নির্দেশে বাংলা সরকার ১৬ই আগস্ট সরকারী ছুটির দিন ঘোষণা করিলেন। প্রথমটি সুস্পষ্ট যুদ্ধ ঘোষণা। দ্বিতিয়টির ব্যাখ্যা আছে। প্রধানমন্ত্রী হয়ত অন্তত আশংকা করিয়াই সরকারী কর্মচারীদের নিরাপত্তার জন্য আফিস-আদালত ছুটি দিয়াছিলেন। পরবর্তী ঘটনায় বোঝাও গিয়াছিল যে ঐ দিন ছুটি না থাকিলে উভয় সম্প্রদায়ের অনেক সরকারী কর্মচারির জীবনহানি
কিন্তু আগে এটা বুঝার উপায় ছিল না। সরকারী ঘোষণায় বলাও হয় নাই। হইলেও হিন্দুরা বিশ্বাস করি না। মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভা হইলেই লীগের পার্টি প্রোগ্রামকে সরকারী ছুটির দিন গণ্য করা হইবে, এটা কোনও যুক্তির কথা নয়। কংগ্রেস মন্ত্রিসভারা তা করেন নাই। কাজেই হিন্দুরা খুব ন্যায়-ও যুক্তিসংগত ভাবেই এই আশংকা করিল যে মুসলিম লীগ-ঘোষিত হরতাল পালনে হিন্দুদিগকে বাধ্য করা হইবে। নিতান্ত স্বাভাবিকভাবেই হিন্দুরা আগে হইতেই প্রস্তুত ছিল। এর প্রমাণ পাওয়া গেল ঘটনার দিনে।
গড়ের মাঠের অক্টারলনি মনুমেন্টের উত্তরে ও কার্যন পার্কের দক্ষিণে বিরাট খেলার মাঠে সভার আয়োজন করা হইয়াছে। শহীদ সাহেব, হাশিম সাহেব প্রভৃতি নেতৃবৃন্দ মঞ্চোপরি উপবিষ্ট। আমরা একদল শ্রোতা মঞ্চের নিচে চেয়ারে উপবিষ্ট। সভার কাজ শুরু হয়-হয়। এমনি সময় খবর আসিল বেহালা, কালিঘাট, মেটিয়াবুরুজ, মানিকতলা ও শ্যামবাজার ইত্যাদি স্থানে-স্থানে মুসলমানদিগের উপর হিন্দুরা আক্রমণ করিয়া অনেক খুন-জখম করিয়াছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই লহ-মাখা পোশাক-পরা জনতা রক্ত-রঞ্জিত পতাকা উড়াইয়া আহত ব্যক্তিদের কাঁধে করিয়া চার দিক হইতে মিছিল করিয়া আসিতে শুরু করিল। চারদিকেই মাতমের আহাজারি ও প্রতিশোধের যিকির। তাদের মুখে শোনা গেল হিন্দুরা শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর বিনা-কারণে হামলা করিয়াছিল। হিন্দুরা দোকানে ঘরে ও ছাদে ইট-পাটকেল ও লাঠি-সোটা আগেই যোগাড় করিয়া রাখিয়াছিল। হিন্দুদের পক্ষ হইতে অবশ্যই বলা হইয়াছিল যে মিছিলের লোকেরা রাস্তার পাশের হিন্দু দোকানদারদেরে জোর করিয়া দোকান বন্ধ করাইতে গিয়াছিল। ফলে বিরোধ বাধে। এটা সম্ভব। মুসলিম জনতার জোর করিয়া হিন্দু দোকান বন্ধ করাইতে যাওয়ার দুই-একটা নযির আমার নিজেরই জানা আছে। তবে এসব ক্ষেত্রে সংঘাত বাধে নাই। হিন্দু দোকানদাররা ডরে-ভয়ে দোকান বন্ধ করিয়াছিল। এসব ক্ষেত্রেও হিন্দুরা বাধা দিলে যে সংঘর্ষ হইত, তাতে সন্দেহ নাই।
কলিকাতায় স্বভাবতঃই হিন্দুর চেয়ে মুসলমানের জান-মালের ক্ষতি হইয়াছিল অনেক বেশি। এই খবর অতিরঞ্জিত আকারে পূর্ব বাংলায় পৌঁছিলে নোয়াখালি জিলায় হিন্দুরা নিষ্ঠুরভাবে নিহত হয়। তারই প্রতিক্রিয়ায় বিহারের হিন্দুরা তথাকার মুসলমানদিগকে অধিকতর নৃশংসতার সাথে পাইকারীভাবে হত্যা করে। ফলে সাম্প্রদায়িক দাংগার ব্যাপারে বাংলা-বিহার একই যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই যুদ্ধ চলে প্রায় চার মাস ধরিয়া। উভয় পক্ষে কত লোক যে হতাহত ও কত কোটি টাকার সম্পত্তি যে ধ্বংস হইয়াছিল তার লেখা-জোখা নাই। পরবর্তীকালে দেশ ভাগের সময়ে অবশ্য আরও বহু প্রদেশে দানবীয় নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটিয়াছিল। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত বাংলা-বিহারের সাম্প্রদায়িক দাংগাই নৃশংস অমানুষিকতার সর্বাপেক্ষা লজ্জার নিনি। অনেক অতি-সাম্প্রদায়িক মুসলমান আজও সগর্বে বলিয়া থাকে কলিকাতা দাংগাই পাকিস্তান আনিয়াছিল। এ কথা নিতান্ত মিথ্যা নয়। এই দাংগার পরে ইংরাজ হিন্দু-মুসলিম তিনপক্ষই বুঝিতে পারেন, দেশ বিভাগ ছাড়া উপায়ান্তর নাই।
