৪. গ্রুপিং-সিস্টেম
এই ধরনের ঘটনার একটি কেবিনেট মিশন প্ল্যান বা গ্রুপিং মম। ১৯৪৬ সালের ১৬ই মে কেবিনেট মিশন এই প্ল্যান ঘোষণা করেন। খবরের কাগষে ঐ গানটা পড়িয়াই আমার অন্তর নাচিয়া উঠে। মনে মনে ভাবি, এইটাই যেন আমি নিজে চিন্তা করিতেছিলাম। সুভাষ বাবুর কথা মনে পড়িল। তাঁর মধুর হাসিমাখা মুখোনা চোখের সামনে ভাসিয়া উঠিল। হায়। তিনি যদি আজ বাঁচিয়া থাকিতেন।
আমরা নিচের তলার কর্মীরা প্রথম দৃষ্টিতেই প্ল্যানটাকে ভালবাসিয়া ফেলিলেও আমাদের নেতারা অত ব্যস্ততা দেখাইলেন না। প্রায় এক মাস চিন্তা-ভাবনা রিয়াজুল মাসের শেষদিকে এক সপ্তাহ আগে-পরে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস উভয় দলই কেবিনেট প্ল্যান গ্রহণ করিলেন। তখন আমার আনন্দ দেখে কে? আমি দেখিয়া আরও খুশী হইলাম যে আমার চেয়ে গোঁড়া পাকিস্তান-বাদী ও সনাতনী মুসলিম লীগাররা পর্যন্ত উল্লসিত হইয়াছেন। যাক, এতদিনে একটা দুঃসাধ্য সমস্যার সমাধান হইয়া গেল। চারদিকেই স্বস্তির নিশ্বাস।
কিন্তু দেশের আবহাওয়া ততদিনে এত বিষাক্ত হইয়া গিয়াছে যে মুসলমানরা যাতে হয় খুশি, হিন্দুরা হয় তাতে বেজার। বিষয়টা ভাল কি মন্দ তার বিচার করে না। কেবিনেট প্ল্যান গ্রহণ নিয়া তাই ঘটিল। এমন যে বামপন্থী বন্ধুরা যাঁরা এতদিন দিনরাত গান্ধী-জিন্না মিলনের শ্লোগান দিয়া কলিকাতার আকাশ-বাতাস মুখরিত করিতেছিলেন, তাঁদের মুখেও বিষাদের কাল ছায়া পড়িল। প্ল্যানটা নিশ্চয়ই মুসলমানের পক্ষে গিয়াছে। নইলে মুসলিম লীগ ওটা গ্রহণ করিল কেন? কংগ্রেস এত দেরি করিল কেন? মুসলমানরা এত উল্লাস করে কেন?
দশ-পনর দিন না যাইতেই কংগ্রেসের নয়া প্রেসিডেন্ট পণ্ডিত নেহরু ১০ই জুলাই এক প্রেস কনফারেন্সে ঘোষণা করিলেন। কংগ্রেস কেবিনেট প্ল্যান গ্রহণ করিয়াছে বটে কিন্তু সার্বভৌম গণ-পরিষদ কংগ্রেসের মত মানিয়া চলিতে বাধ্য নয়।
কায়েদে-আযম ন্যায়তঃই এর প্রতিবাদে লীগের প্ল্যান গ্রহণ প্রত্যাহার করিলেন। সত্যিকার দেশপ্রেমিকদের মধ্যে হাহাকার পড়িয়া গেল।
কংগ্রেসের লুকাচুরিতে কেবিনেট মিশন বড়লাট ও বৃটিশ সরকার চুপ করিয়া তামাশা দেখিলেন। কায়েদে-আযম ১৬ই আগস্ট তারিখে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ঘোষণা করিলেন ইংরাজ সরকারের বিরুদ্ধে।
ইংরাজসহ আমাদের সমাজের নাইট-নবাবরাও চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। এঁদের অনেকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুসলিম লীগের আহবানে ইংরাজের দেওয়া উপাধি ত্যাগ করিলেন; বেশিরভাগ টিলামিছি করিতে লাগিলেন। কিন্তু ইংরাজের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের নামে সকলে ঘাবড়াইয়া গেলেন। এই দলের নেতা সার নাফিমুদ্দিন কলিকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউটের এক সভায় ঘোষণা করিলেন : আমাদের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ইংরাজের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দুর বিরুদ্ধে। হিন্দুরা দ্বন্ত এবং শেষ পর্যন্ত এগ্রেসিত হইয়া উঠিল।
১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট কলকাতায় কেয়ামত নামিয়া আসিল।
৫. কলিকাতা দাংগা
১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট ও পরবর্তী কয়েকদিন কলিকাতায় যে হৃদয়বিদারক অচিন্তনীয় ও কল্পনাতীত সাম্প্রদায়িক দাংগা হইয়াছিল যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়া এমন নৃশংসতা আর কোথাও দেখা যায় না। কলিকাতায় দুইটা মর্মান্তিক সাম্প্রদায়িক দাংগা হয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ দুইটার সময়েই আমি কলিকাতায় উপস্থিত ছিলাম। একটা ১৯২৬ সালের এপ্রিলে। অপরটা ১৯৪৬ সালের আগস্টে। গভীরতা, ব্যাপকতা ও নিষ্ঠুরতা সকল দিক হইতেই ১৯৪৬ সালের দাংগা ১৯২৬ সালের দাংগার চেয়ে অনেক বড় ছিল। চল্লিশ বছরের আগের ঘটনা বলিয়া ছাব্লিশ সালের দাংগার নৃশংসতার খুঁটিনাটি মনে নাই। কিন্তু মাত্র বিশ বছরের আগের ঘটনা বলিয়া ছয়-চল্লিশ সালের চোখের দেখা অমানুষিক নৃশংসতা আজও ঝলমলা মনে আছে। মনে হইলেই সজীব চিত্রের মতই চোখের সামনে ভাসিয়া উঠে। গা কাঁটা দিয়া উঠ। স্বাভাবিক হৃদয়বান ব্যক্তির মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটিবার কথা। ঘটিয়াও ছিল অন্ততঃ একজনের। আমার নিতান্ত ঘনিষ্ঠ আলীপুর কোর্টের এক ব্রাহ্মণ তরুণ মুনসেফ সত্য-সত্যই কিছুকালের জন্য মনোবিকার রোগে আক্রান্ত হইয়াছিলেন। রিটায়ার্ড জজ ও বয়স্ক উকিল-ব্যারিস্টারের মত উচ্চশিক্ষিত কৃষ্টিবান ভদ্রলোকদিগকে খড়গ রামদা দিয়া তাঁদের মহল্লার বস্তির মুসলমান নারী-পুরুষ ও শিশু-বৃদ্ধকে হত্যা করিতে দেখিয়াই ঐ তরুণ হাকিমের ভাবালু মনে অমন ধাক্কা লাগিয়াছিল। তিনি ছুটি লইয়া বেশ কিছু দিন মেন্টাল হাসপাতালে থাকিতে বাধ্য হইয়াছিলেন আমার অবস্থাও প্রায় ঐরূপই হইয়াছিল। আমার মহল্লায় হয়ত একজন মুচি ফুটপাথে বসিয়া মুসলমানদেরই জুতা মেরামত করিতেছে। হয়ত একজন হিন্দু নাপিত ফুটপাথে বসিয়া মুসলমানদের ক্ষৌরকাজ করিতেছে। হঠাৎ কয়েকজন মুসলমান আততায়ী ধারাল রুড বা বল্লম তার মাথায় গলায় বা পেটে এপার-ওপার ঢুকাইয়া দিল। মুহূর্তের মধ্যে ধড়ফড় করিয়া লোকটি সেখানেই মরিয়া পড়িয়া রহিল। বীরেরা জয়ধ্বনি করিতে করিতে চলিলেন অন্য শিকারের তালাশে। এমন নৃশংসতা দেখিলে কার না মস্তিষ্ক-বিকৃতি ঘটিবে? অথচ এটাই হইয়া উঠিয়াছিল স্বাভাবিক মনোবৃত্তি। বিপরীতটাই ছিল যেন অস্বাভাবিক। হৃদয়বান মানব-প্রেমিক বলিয়া পরিচিত আমার জানা এক বন্ধু এই সময়ে একদিন আমাকে কৈফিয়ৎ তলবের ভাষায় বলিয়াছিলেন : কয়টা হিন্দু মারিয়াছেন আপনি? শুধু মুখে-মুখেই মুসলিম প্রীতি।
