৩. বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদ
এছাড়া আরেকটা বড় সুযোগ মিলিল ময়মনসিংহ জিলার গফরগাঁও নির্বাচনী এলাকায় আমাদের প্রার্থী ছিলেন খান বাহাদুর গিয়াসুদ্দিন পাঠান। পাঠান সাহেব জিলা মুসলিম লীগের সেক্রেটারি। তাঁর সাফল্যের উপর মুসলিম লীগের মান ইয্যত নির্ভর করিতেছিল। পাঠান সাহেব বিচক্ষণ প্রগতিবাদী রাজনীতি ও ভাল অর্গানাইযার হওয়া সত্ত্বেও নিজের এলাকায় তিনি জনপ্রিয় ছিলেন না। পক্ষান্তরে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মওলানা শামসুল হুদা খুবই জনপ্রিয় প্রজা-নেতা ছিলেন। কৃষক-প্রজা আন্দোলনে তাঁর দান ছিল অসামান্য। আগের সাধারণ নির্বাচনে তিনি কৃষক-প্রজা প্রার্থী হিসাবে তৎকালীন মুসলিম লীগ প্রার্থীকে বিপুল ভোটে হারাইয়া নির্বাচিত হইয়াছিলেন। মাত্র কয়েক বছর আগে তিনি ছিলেন আমার সম্মানিত সহকমী। অথচ মুসলিম লীগের অর্থাৎ পাকিস্তান দাবির সাফল্যের খাতিরে তাঁকেই পরাজিত করা দরকার হইয়া পড়িল। পাঠান সাহেবের সাফল্য নিশ্চিত করিবার জন্য আমি শহীদ সাহেব ও হালিম সাহেবের অনুমোদনক্রমে গফরগাঁয় একটি সম্মিলনীর আয়োজন করিলাম। জিলা মুসলিম লীগের সভাপতি মিঃ নূরুল আমিন সাহেবকে চেয়ারম্যান ও জিলার অন্যতম জনপ্রিয় বক্তা ও সংগঠক গফরগাঁর বাশেন্দা মিঃ আবদুর রহমান খাঁ সাহেবকে সেক্রেটারি করিয়া একটি শক্তিশালী অভ্যর্থনা কমিটি গঠিত হইল। ১৯৪৬ সালের ১২ই জানুয়ারি এই সখিনীর তারিখ নির্ধারিত হইল। জিলা মুসলিম লীগের সভাপতি অভ্যর্থনা সমিত্রি চেয়ারম্যান নূরুল আমিন সাহেব পাঠান সাহেবের সাফল্যে তেমন আগ্রহী নন, পাঠান সাহেব আমার কাছে এই অভিযোগ করায় আমি কনফারেন্সের পর-বিশ দিন আগে হইতেই প্রাদেশিক লীগের প্রচার দফতর গফরগাঁয় স্থানান্তরিত করিয়া সেখানেই বাসা বাঁধিলাম। গঠনতন্ত্র অনুসারে এটা হইল বটে জিলা সম্মিলনী, কিন্তু এটাকে প্রাদেশিক রূপ দিবার সমস্ত আয়োজন করিলাম। বহু সংখ্যক ডেলিগেট ও বিপুল জনতা সশিলনীতে সমবেত হইলেন। এই সম্মিলনীতে জনাব লিয়াকত আলী খাঁ, সার নাযিমুদ্দিন, জনাব শহীদ সুহরাওয়ার্দী, মওলানা আযাদ সোবহানী, জনাব আবুল হাশিম, মৌলবী তমিয়ুদ্দিন প্রভৃতি বহু খ্যাতনামা নেতা যোগদান ও বক্তৃতা করিলেন। জনাব লিয়াকত আলি খাঁ এই সম্মিলনীর সভাপতি হইলেন। বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদের প্রস্তাবটি আমি স্বয়ং উপস্থিত করিলাম। এই জিলার জনৈক খ্যালামা এম, এল, এ. “বিনা-ক্ষতিপূরণে” কথাটা বাদ দিবার জন্য। সংশোধনী প্রস্তাবে উপস্থিত করিলেন। ফলে ক্ষতিপূরণের প্রশ্নটা সোজাসুজি সম্মিলনীর বিচার্য বিষয় হইয়া পড়িল। মঞ্চোপরি উপবিষ্ট দুই-এক জন নেতা বিনা-ক্ষতিপূরণের আমার প্রস্তাবে একটু অস্বস্তির ভাব দেখাইতেছিলেন। এবার সংশোধনী প্রস্তাব আসায় তাঁদের মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সংশোধনী প্রস্তাব কেউ সেকেণ্ড করিলেন না। সংশোধনী প্রস্তাব সেকেণ্ড করা লাগে না। এই যুক্তিতে উক্ত প্রস্তাবককে বক্তৃতা করিতে দেওয়া হইল। কিন্তু সমবেত লক্ষাধিক লোকের ‘না’ ‘না’-ধ্বনিতে বক্তার গলার সুরতলাইয়া গেল। আর কোনও বক্তা নাই দেখিয়া সভাপতি নবাবযাদা লিয়াকত আলি খাঁ সায়ে মুচকি হাসিয়া প্রস্তাব ভোটে দিলেন। সংশোধনী প্রস্তাবের প্রস্তাবক ছাড়া আর কারো হাত উঠিল না। পক্ষান্তরে আমার মূল প্রস্তাবের পক্ষে সমস্ত প্যাভাল হারে জংগল হইয়া গেল। নবাববাদা সার নাযিমুদ্দিন প্রভৃতি নেতৃবৃন্দের দিকে চাহিয়া হাসিয়া ঘোষণা করিলেন : প্রস্তাব গৃহীত হইল। সভায় দীর্ঘক্ষণস্থায়ী হর্ষধ্বনি ও করতালি চলিল। আমার উদ্দেশ্য সফল হইল। মুসলিম লীগের প্রগ্রেসিভ গ্রুপের জয় হইল। মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদে কমিটেড হইলেন। এই জিলা সর্মিলনীর নিয়মতান্ত্রিক ভিত্তি কি, তাতে গৃহীত প্রস্তাবের প্রাতিষ্ঠানিক মূল্য কি, এসব কথা কেউ তুলিতে পারিলেন না। মুখে-মুখে ভলানটিয়ারদের মিছিলে, মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডদের কুচকাওয়াজে, নির্বাচনী সভাসমূহের প্রস্তাবাদিতে কিনা ক্ষতিপূরণের দাবি অন্ততঃ জনগণের বিচারে মুসলিম লীগের প্রকারী দাবিতে পরিগণিত হইল। কোনও দিক হইতে ইহার প্রতিবাদে টু শব্দটি হইল না। সকলে বুঝিয়া নিল, এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। পাকিস্তান হাসিলের পরে মুসলিম লীগ মন্ত্রীরা এই ওয়াদা রক্ষা করেন নাই। সেটা ভিন্ন কথা। জমিদারি উচ্ছেদের বদলে ক্ষতিপূরণ দিয়া একোয়ার করার সময় লীগ নেতারা বলেন নাই যে তাঁরা বিনা-ক্ষতিপূরণের ওয়াদা করেন নাই। তাঁরা বলিয়াছিলেন যে একদম ক্ষতিপূরণ না দিলে জমিদারদের উপর অবিচার করা হয়। লীগ নেতারা যে শুধু জমিদারি উচ্ছেদের ব্যাপারেই সজ্ঞানে জন সাধারণের সাথে বিশ্বাস ভংগ করিয়াছেন, তাও নয়। লাহোর প্রস্তাবের ব্যাপারেও মুসলিম ঐক্য ও ‘কীটে-খাওয়া পাকিস্তানের যুক্তিতে এইরূপ বিশ্বাসভংগ করা হইয়াছে। নির্বাচনের আগের কথা নির্বাচনের পরে ভুলিয়া যাওয়া এবং সে ভুলার সমর্থনে উচ্চ বুলির যুক্তি দেওয়ার ইতিহাস আমাদের দেশে এটাই নূতন নয়।
এই সময় হইতে পাকিস্তান হাসিলের দিন পর্যন্ত মুতের ঘটনাবলী সকলেরই জানা। ঐ সব ঘটনার সাথে আমার দেখা রাজনীতির সোজাসুজি কোনও সম্পর্ক নাই বলিয়া সে সবের উল্লেখ বাদ দিয়া গেলাম। কিন্তু প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রচার সম্পাদক হিসাবে ঐসব ঘটনার অনেকগুলির সাথে অন্ততঃ মনের দিক দিয়া এতটা জড়াইয়া পড়িয়াছিলাম যে ঐসব ঘটনার সুফল-কুফলের স্মৃতি আমার নিজের মন হইতে কিছুতেই মুছিয়া যাইতেছে না। এত এতদিন পরেও ওগুলি কাঁটার মতই আমার অন্তরে বিধিতেছে।
