২২. মুসলিম লীগে যোগদান
যাহোক শেষ পর্যন্ত আমার সহকর্মী বন্ধুরা এই প্রস্তাবে রাযী হন নাই। এখানে উল্লেখযোগ্য যে কৃষক-প্রজা সমিতির সভাপতি মওলানা আবদুল্লাহিল বাকী শহীদ সাহেবের প্রস্তাব মানিয়া লইতে ব্যক্তিগতভাবে সম্মত হইয়াছিলেন। কিন্তু একথাও লিখিয়াছিলেন যে তিনি নিজে আইন সভার মেম্বর না হওয়ায় এ বিষয়ে কোনও নির্দেশ দিবার যোগ্যতা রাখেন না; এ ব্যাপারে চূড়ান্ত মত দিবার তাঁরাই অধিকারী। কৃষক প্রজা-পার্টির এম. এল. এ. গণ তাঁদের চূড়ান্ত মতে শহীদ সাহেবের প্রস্তাব গ্রাহ্য করিলেন। অথচ কৃষক-প্রজা সমিতির ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক দেওয়াও হইল না। অবশেষে অগত্যা আমি মুসলিম লীগে যোগদান করিয়া খবরের কাগযে বিবৃতি দিলাম। সমিতির সভাপতি মওলানা আবদুল্লাহিল বাকী সাহেব এই সিদ্ধান্তের জন্য আমাকে মোবারকবাদ দিয়া পত্র লিখিলেন। কয়েকদিন পরে তিনিও মুসলিম লীগে যোগদান করিলেন। কৃষক-প্রজা সমিতির নেতা ও কর্মীদের মধ্যে স্বভাবতঃই বিভ্রান্তি ও বিশৃংখলা দেখা দিল। ব্যক্তিগতভাবে যাঁর যেমন ও যখন সুবিধা হইল, কৃষক-প্রজা নেতারা তেমন ও তখন মুসলিম লীগে যোগদান করিতে লাগিলেন। যাঁরা কংগ্রেসের দিকে হেলিয়াছিলেন, তাঁরা পুরাপুরি ও খোলাখুলি কংগ্রেসে ঢুকিয়া পড়িলেন। অবশেষে নবাবযাদা হাসান আলী এবং আরও পরে সমিতির সেক্রেটারি মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ, এসিস্টেন্ট সেক্রেটারি মৌঃ নূরুল ইসলাম চৌধুরী এবং মৌঃ গিয়াসুদ্দিন আহমদ এম, এল, এ, ও মুসলিম লীগে যোগ দিলেন। এক নবাবযাদা হাসান আলী রাজনীতির খবছর ছাড়া আর সকলে আসন্ন নির্বাচনে মুসলিম লীগের টিকিট চাহিয়া এই বদনামের ভাগী হইলেন যে তাঁরা টিকিটের জন্যই মুসলিম লীগে যোগ দিয়াছেন। এক শামসুদ্দিন সাহেব ছাড়া আর কেউ লীগের টিকিট পান নাই। এইরূপে বিচ্ছিন্নভাবে কৃষক-প্রজা নেতারা কেউ কংগ্রেসে এবং বেশিরভাগ মুসলিম লীগে যোগদান করায় কৃষক-প্রজা সমিতি কার্যতঃ লোপ পাইল। অথচ কোন প্রতিষ্ঠানেই তাঁরা নিজেদের অস্তিত্বের কোন স্ট্যাম্প বা ছাপ রাখিতে পারিলেন না।
এই কারণে আজও অনেক সময় আমার মনে হয়, যথাসময়ে সুহরাওয়ার্দী ফরমূলা গ্রহণ করিলে কৃষক-প্রজা সমিতির ভাল ত হইতই, মুসলিম লীগ রাজনীতিতে এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তান রাজনীতিতেও অধিকতর সুস্থতা দেখা যাইত।
১৪. পাকিস্তান হাসিল
১৪. পাকিস্তান হাসিল
চৌদ্দই অধ্যায়
১. পার্লামেন্টারিয়ান হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা
আমি কলেজ জীবন হইতেই সক্রিয় রাজনীতি করিতেছিলাম বটে কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর শিক্ষা-প্রভাবে কতকটা এবং নিজের মোজ-মর্যির ফলে কতকটা, আমি কোনও নির্বাচনে প্রার্থী হই নাই। কিন্তু মুসলিম লীগে যোগ দেওয়ার পর তৎকালীন সেক্রেটারি বন্ধুবর আবুল হাশিমের প্রভাবে আমি ১৯৪৬ সালে একবার প্রাদেশিক আইন পরিষদের এবং দুইবার কেন্দ্রীয় আইন পরিষদের (গণ-পরিষদ) মেষর হইবার চেষ্টা করিয়াছিলাম। তিনবারই আমি নিরাশ হইয়াছিলাম। (১) প্রাদেশিক মুসলিম লীগ আমাকে প্রাদেশিক আইন পরিষদের প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দান করেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি বোর্ড আমার নাম বাতিল করিয়া আজাদ-সম্পাদক মৌঃ আবুল কালাম শামসুদ্দিনকে মনোনীত করেন। {2) আমি ১৯৪৬ সালের সেটেম্বর মাসে মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে গণ-পরিষদের মেম্বর নির্বাচিত হইলাম। গণ-পরিষদের বৈঠকে যোগ দিতে দিল্লী যাওয়ার জন্য তৈয়ারও হইয়াছিলাম। এমন সময় জিন্ন সাহেব গণ-পরিষদ বয়কট করার নির্দেশ দিলেন। আমার মেম্বরগিরি করা আর হইল না। {৩) এর পরে পাকিস্তানের জন্য স্বতন্ত্র গণ-পরিষদ গঠনের সময় মুসলিম লীগ আবার আমাকে মনোনীত করিলেন। বংগীয় ব্যবস্থা পরিষদের মুসলিম মেম্বরদের ভোটে গণ-পরিষদের মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হওয়ার বিধান ছিল। সিংগল ট্রান্সফারেবল পদ্ধতিতে এই ভোট দিবার নিয়ম ছিল। যে তিনজন মুসলিম মেম্বর আমার ভাগে পড়িয়াছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন মুসলিম লীগের ‘হুইপ’ অমান্য করিয়া আমার স্কুলে অন্য লোককে ভোট দিয়াছিলেন। ফলে আমি নির্বাচিত হইতে পারি নাই। এইভাবে তিন-তিন বার চেষ্টা করিয়াও আমি মুসলিম লীগের সেবক হিসাবে কেন্দ্রীয় অথবা প্রাদেশিক আইন পরিষদের মেম্বর হইতে পারি নাই। বুঝিলাম মুসলিম লীগের লোক হিসাবে মেম্বর হওয়া আমার বরাতেই ছিল না।
২. লীগের প্রচার সম্পাদক
বংগীয় আইন পরিষদের আসনে প্রাদেশিক লীগের-দেওয়া আমার নমিনেশন কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টারি বোর্ড বাতিল করিলেও আমি তাতে মোটেই মনক্ষুণ্ণ হইলাম না। বরঞ্চ মুসলিম-লীগের পাবলিসিটি সেক্রেটারি হিসাবে আমার সমস্ত শক্তি লীগ প্রার্থীদের জয়লাভের জন্য নিয়োজিত করিলাম। এ ছাড়া আমি প্রচারের ধারাই বদলাইয়া দিলাম। বন্ধুদের আশ্বাস সত্ত্বেও আমার মনের এই সন্দেহের ভাব দূর হয় নাই যে ধমীয় জাতিত্বের শ্লোগানে যে রাষ্ট্র দাবি করা হইতেছে, তাতে কৃষক শ্রমিকের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিরাপদ নয়। তাই আমি ইলেকশনী শ্লোগান ও যিকিরকে বিবৃতি-ইশতাহারে যথাসম্ভব গণমুখী করিতে লাগিলাম। আমার এখতিয়ার এই পর্যন্তই ছিল। কারণ মুসলিম লীগের ইলেকশন মেনিফেস্টো লিখিবার ভার আমার উপর ছিল না; তাতে হস্তক্ষেপ করিবারও আমার কোনও ক্ষমতা ছিল না। প্রাদেশিক মুসলিম লীগের তিন বছর আগে গৃহিত-জমিদারি-উচ্ছেদের প্রস্তাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া না-দেওয়া সম্পর্কে কোনও কথা ছিল না। এই নীরবতার পূর্ণ সুযোগ আমি গ্রহণ করিলাম। ‘লাংগল যার মাটি তার ‘বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদ চাই’ ‘কায়েমী স্বার্থের ধ্বংস চাই’ ‘শ্রমিক যে মালিক সে’, ‘জনগণের পাকিস্তান’ কৃষক-শ্রমিকের পাকিস্তান প্রভৃতি শ্লোগান তৈরি করিয়া পোস্টার প্ল্যাকার্ড ছাপাইয়া বস্তায়-বস্তায় মফস্বলে পাঠাইতে লাগিলাম। বিশেষ করিয়া আমার নিজের জিলা ময়মনসিংহে এটা করা অতি সহজ ছিল। এ জিলায়-কৃষক-প্রজা আন্দোলন জোরদার ছিল। এখানকার ছাত্র-তরুণরা প্রায় সকলেই জমিদারি-ধন-বিরোধী ছিল। এইসব ছাত্র-তরুণের দ্বারা গঠিত ভলান্টিয়ার বাহিনীর স্লোগান-যিকির ও পোস্টার প্ল্যাকার্ডে স্বভাবতই এইসব দাবি সহজেই স্থান পাইল।
