১৯৪৪ সালের ৫ই মে তারিখে ইসলামিয়া কলেজের মিলনায়তনে বিপুল উৎসাহ-উদ্যমের মধ্যে এই সম্মিলনী হইল। মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্মিলনী উদ্বোধন করিলেন। আমি হইলাম মূল সভাপতি। শামসুদ্দিন হইলেন অভ্যর্থনা সমিতির চেয়ারম্যান। অধ্যাপক ডাঃ সুশোভন সরকার, ডাঃ সাদেক, ডাঃ সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, অধ্যাপক আদমুদ্দিন, মৌঃ আবদুল মওদুদ, মৌঃ হবিবুল্লাহ বাহার, শ্রীযুক্ত মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য প্রভৃতি বহু মনীষী বিভিন্ন শাখার সভাপতি হইলেন। কলিকাতার বহু লেখক সাহিত্যিক ছাড়াও মুসলিম বাংলার রাজনীতিক নেতাদের প্রায় সকলেই এই সম্মিলনীতে উপস্থিত ছিলেন। নেতাদের মধ্যে জনাব এ কে ফযলুল হক, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাযিমুদ্দিন, শহীদ সুহরাওয়ার্দী, ডাঃ মেজর সার হাসান সুহরাওয়ার্দী, মৌঃ আবুল হাশিম, মৌঃ তমিসুদ্দিন খাঁ এবং নাযিমুদ্দিন মন্ত্রিসভার সকল মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। ছাত্র-তরুণরা বিশালাকার হলটি একেবারে জম জমাট করিয়াছিল।
আমার অভিভাষণটা খুবই জনপ্রিয় হইয়াছিল। উহার কয়েক হাজার কপি বিক্রয় হইয়া গিয়াছিল সম্মিলনীতেই। আমার অভিভাষণে দুইটা মূল কথা বলিয়াছিলাম যা মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের মতের সংগে বেমিল হইয়াছিল। বোধ হয় সেই জন্যই নূতনও লাগিয়াছিল। প্রথমতঃ আমি বলিয়াছিলাম, পাকিস্তান দাবিটা প্রধানতঃ কালচারেল অটনমির দাবি। বলিয়াছিলাম, রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার চেয়েও কালচারেল অটনমি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই দিক হইতে পাকিস্তান দাবি শুধু মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক দাবি নয় এটা গোটা ভারতের কালচারেল মাইনরিটির জাতীয় দাবি। দ্বিতীয় কথা আমি বলিয়াছিলাম যে ভারতীয় মুসলমানরা হিন্দু হইতে আলাদা জাত ত বটেই বাংলার মুসলমানরাও পশ্চিমা মুসলমানদের হইতে পৃথক জাত। বলিয়াছিলাম, শুধুমাত্র ধর্ম জাতীয়তার বুনিয়াদ হইতে পারে না। আমি আরব পারস্য তুরস্কের মুসলমানদের ও ইউরোপীয় খৃষ্টানদের দেশগত জাতীয়তার নযির দিয়াছিলাম। কথাটা মুসলিম লীগের তৎকালীন মতবাদের সংগে বেসুরা শুনাইলেও সমবেত মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের কেউ প্রতিবাদ করেন নাই। কারণ কথাটা ছিল মূলতঃ সত্য।
মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবি ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত বলিয়া যে সব মুসলিম ও হিন্দু সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী পাকিস্তান দাবির বিরুদ্ধতা করিতেছিলেন আমার অভিভাষণ তাঁদের অনেকেরই দৃষ্টি ভংগিতে খানিকটা পরিবর্তন আনিতে সক্ষম হইল। আমার অনেক শ্রদ্ধেয় ও প্রবীণ কৃষক-প্রজা ও কংগ্রেস-কর্মীদের মধ্যে যাঁরা নিখিল ভারতীয় জাতীয়তার মোকাবিলায় বাংগালী জাতীয়তার দাবি তোলার পক্ষপাতী ছিলেন, তাঁরা এই মত প্রচারেও উদ্যোগী হইলেন। কমরেড রায় ব্যতীত কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড বংকিম মুখার্জী, কমরেড পি. সি. যোশী প্রভৃতি অনেকেই পাকিস্তান দাবিকে ন্যাশনাল মাইনরিটির আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার বলিয়া মানিয়া নিলেন।
কৃষক-প্রজা নেতৃবৃন্দের সহিত আলাপ-আলোচনায় সুফল পাওয়া না গেলেও আজাদে প্রকাশিত আমার আবেদনের সুফল হইল। বিভিন্ন জিলার কৃষক-প্রজা কর্মীদের অনেকেই আমার মত সমর্থন করিয়া এবং কেহ কেহ আরো কতিপয় প্রশ্ন সম্বন্ধে আলোকপাত করিতে অনুরোধ করিয়া পত্র লিখিতে লাগিলেন। সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হইলাম সমিতির প্রেসিডেন্ট মওলানা আবদুল্লাহিল বাকী সাহেবের পত্র পাইয়া। তিনি আমার সাথে সম্পূর্ণ একমত। এমন কি আমার লেখা পড়িবার আগে হইতেই তিনি এই লাইনে চিন্তা করিতেছিলেন। আমাকে এ ব্যাপারে আরও অগ্রসর হইবার জন্য উৎসাহ দিলেন।
২১. শহীদ সাহেবের চেষ্টা
আমি কংগ্রেস-প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ন্যাশনাল প্লাটফর্ম ও কৃষক প্রজা সমিতিকে সে প্লাটফর্মের অন্যতম শ্রেণী প্রতিষ্ঠান বলিতাম। এই কথার সূত্র ধরিয়া শহীদ সাহেব কৃষক-প্রজা সমিতিকে কংগ্রেসের বদলে মুসলিম লীগের শ্রেণী শাখা হইতে উপদেশ প্রদান করেন। কিছুদিন আলোচনার পর তিনি লীগ-কৃষক-প্রজা যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব দেন। আমি আনন্দের সাথে এই প্রস্তাব মূলনীতি হিসাবে সমর্থন করি। কৃষক-প্রজা সমিতির অন্যতম বিশিষ্ট সদস্য মিঃ নির্মল কুমার ঘোষ শহীদ সাহেবের বিশ্বস্ত লোক ছিলেন। তিনি আমার ও আমার সহকর্মীদেরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তাঁর মাধ্যমে শহীদ সাহেবের সহিত কৃষক-প্রজা নেতাদের আলোচনা চলে। শেষ পর্যন্ত শহীদ সাহেবের প্রস্তাব এইরূপ দাঁড়াইয়াছিল : প্রাদেশিক আইন পরিষদের ও আইনসভার মোট মুসলিম আসনের শতকরা ৪০টি আসনে কৃষক-প্রজা পার্টির মনোনীত প্রার্থীকে মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী বলিয়া গণ্য করা হইবে। কৃষক-প্রজা পার্টির এম, এল, এ.-রা মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির ভিতরে স্বতন্ত্র গ্রুপ হিসাবে কাজ করিতে পারিবেন; কিন্তু মুসলিম লীগ পার্টির ডিসিপ্লিন মানিয়া চলিতে হইবে।
প্রস্তাবটি আমি গ্রহণ করিলাম এবং আমার পূর্বোক্ত সহকর্মীদের দিয়া ইহা গ্রহণ করাইবার জন্য আবার আলোচনা সভার আয়োজন করিলাম। নির্মল বাবু এ ব্যাপারে যথেষ্ট চেষ্টচরিত্র করিলেন। কৃষক-প্রজার স্বার্থ এতে যথেষ্ট রক্ষিত হইবে বলিয়া নিজেও বুঝিলাম, শহীদ সাহেবও আমাকে বুঝাইলেন। তিনি আমাকে দেখাইলেন, কৃষক-প্রজা পার্টির মনোনীত শতকরা ৪০টি সদস্য ছাড়াও মুসলিম লীগের মনোনীত শতকরা ৬০ জনের মধ্যেও অর্ধেকের বেশি কৃষক-প্রজা শ্রেণীর লোক থাকিবেন। কৃষক-প্রজার স্বার্থের ব্যাপারে তাঁরা নিশ্চয়ই কৃষক-প্রজা সমিতির কর্মপন্থার সমর্থক হইবেন। ফলে মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির মধ্যে কৃষক-প্রজা প্রতিনিধিদের স্বচ্ছন্দ মেজরিটি হইবে। এইভাবে বাংলার আইন পরিষদের এলাকার কার্যকলাপে কৃষক-প্রজার স্বার্থ রক্ষিত ত হইবেই, গোটা পাকিস্তান-আন্দোলনেও কৃষক-প্রজার দাবি প্রতিফলিত হইবে। শহীদ সাহেবের এই প্রতিশ্রুতিতে সন্দেহ করিবার কোনও কারণ ছিল না। বস্তুতঃ মুসলিম লীগকে মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় করিবার পদক্ষেপ রূপে জমিদারি উচ্ছেদকে মুসলিম লীগের আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করা হইয়াছিল। প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলে এই প্রস্তাব পাস হইয়াছিল আমার উপদেশে এবং বন্ধুবর জনাব নূরুল আমিন ও জনাব গিয়াসুদ্দিন পাঠানের আন্তরিক ও অবিশ্রান্ত চেষ্টায়। প্রধানতঃ ময়মনসিংহ জেলার প্রতিনিধিদের দৃঢ় মনোতাবে ও সমবেত চেষ্টায় এটা সম্ভব হইয়াছিল। বিনা-ক্ষতিপূরণে জমিদারি উচ্ছেদের প্রস্তাবও কাউন্সিলে তুলা হইয়াছিল। এটাও ময়মনসিংহের প্রতিনিধিরাই করিয়াছিলেন। কিন্তু বড়-বড় কতিপয় নেতার প্রবল বিরুদ্ধতার ফলে প্রস্তাবটি পরিত্যক্ত হয়।
