কথায় আছে চরম দুর্দিনে মানুষের অজ্ঞাত প্রতিভার সন্ধান হয়। পঞ্চাশ সালের ঐ নবিরহীন আকালে মুসলিম বাংলা নিজের মধ্যে কিছু-কিছু মানব-সেবীর সন্ধান পাইয়াছিল। এঁদের মধ্যে শহীদ সুহরাওয়ার্দীর নাম সকলের আগে নিতে হয়। অত অভাবের মধ্যেও ধৈর্য ও সাহসে বুকে বাঁধিয়া গুয়েল কিচেন ও লংগরখানা খুলিয়া তিনি কিভাবে আর্ত ও ক্ষুধার্তের সেবা করিয়াছিলেন, সেগুলি পরিদর্শনের জন্য আহার-নিদ্রা তুলিয়া দিনরাত চড়কির মত ঘুরিয়া বেড়াইতেন, সেটা ছিল দেখিবার মত দৃশ্য।
১৮. পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ রূপায়ণ
আলীপুরে ওকালতি শুরু করিয়াছি। নূতন জায়গায় ব্যবসা শুরু করিয়াছি। সুতরাং মওক্কেল কম, অবসর প্রচুর। বিকালটা একদম ফ্রি। বাসার কাছেই ‘আজাদ’ আফিস। ‘আজাদের’ সম্পাদকীয় ও ম্যানেজারীয় বিভাগের প্রায় সকলেই আমার বন্ধু-বান্ধব। কাজেই প্রায় সেখানেই আড্ডা। দুনিয়ার সমস্ত সমস্যার আলোচনা এবং অনেক ক্ষেত্রে সমাধানও হয় সংবাদপত্র-আফিসে। ‘আজাদ’ আফিসেও তাই হইত। আমি ছাড়া আরও লোক জুটিতেন। এইসব বৈঠকে আমি যেমন পারিলাম বন্ধুদের ফ্যাসি-বিরোধী। করিতে। বন্ধুরাও তেমনি পারিলেন আমাকে পাকিস্তানবাদী করিতে। বন্ধুদের যুক্তি-তর্ক ছাড়া ডাঃ আম্বেদকারের ইংরাজী ‘পাকিস্তান’ ও বন্ধুবর মুজিবর রহমানের বাংলা ‘পাকিস্তান’ এই দুইখানা বই আমার মনে বিপুল ভাবান্তর আনয়ন করিল। আমি পাকিস্তান-বাদী হইয়া গেলাম। কিন্তু এ সম্পর্কে দুইটা বিচার্য বিষয় থাকিল। এক, পাকিস্ত’ন দাবিকে দেশ-বিদেশের সকল চিন্তুকের কাছে গ্রহণযোগ্য করিতে হইলে উহাকে একটা ইনটেলেকচুয়াল রূপ দিতে হইবে। ইতিহাস, ভূগোল ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিচারে উহাকে যুক্তিসহ ও এ্যাকটিক্যাল করিতে হইবে। দুই, শুধু ধর্মের ডাকে পাকিস্তান আসিলে মোল্লাদের প্রাধান্য হওয়ার সম্ভাবনা আছে। মোল্লাদের প্রভাবে মুসলমানরা কেবল পিছন ফিরিয়া রাস্তা চলে। তাই জীবন-পথে মুসলমানরা এত বেশি হোঁচট খাইতেছে। ধর্মীয় ভ্রাতৃত্বের নামে রাষ্ট্র গঠিত হইলে তাকে কৃষক-শ্রমিকের স্বার্থ বিপন্ন হইতে পারে। এই দুইটা সম্ভাবনাকে ঠেকাইতে হইবে। এই আলোচনার ফলে প্রথম উদ্দেশ্যের জন্য পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি গঠন করা সাব্যস্ত হইল। দ্বিতীয়টা সম্বন্ধে বন্ধুরা আমাকে আশ্বাস দিলেন যে জিয়া সাহেবের মত বাস্তব-জ্ঞানী মডার্ন নেতার নেতৃত্বে যে রাষ্ট্র গঠিত হইবে, তাতে মোল্লাদের প্রাধান্য থাকিতে পারে না। এই প্রসংগে বন্ধুরা খবরের কাগ্য খুঁজিয়া সাম্প্রতিক একটা ঘটনার দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন। মুসলিম লীগের অন্যতম নেতা মাহমুদাবাদের তরুণ রাজা সাহেব এক বক্তৃতায় বলিয়াছিলেন যে পাকিস্তানে কোরআনের আইন অনুসারে শাসন কার্য চলিবে। জিন্না সাহেব পরদিনই তার প্রতিবাদে খবরের কাগযে বিবৃতি দিয়া রাজা সাহেবকে ধমকাইয়া দিয়াছেন এবং বলিয়াছেন, পাকিস্তান একটি প্রগতিবাদী মডার্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হইবে। আর জমিদার-ধনিকদের প্রাধান্য সম্বন্ধে বন্ধুরা বলিলেন যে পাকিস্তান সংগ্রামেই যদি জনগণের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তবে সে সম্ভাবনা একেবারেই অংকুরে বিনষ্ট হইতে পারে। এ অবস্থায় বাংলার কৃষক-প্রজা নেতা কর্মীরা যদি সদলবলে মুসলিম লীগে, সুতরাং পাকিস্তান-সংগ্রামে, শামিল হইয়া যান, তবে এদিককার বিপদ সম্পূর্ণরূপে দূর হইয়া যাইবে।
১৯. সহকর্মীদের সাথে শেষ আলোচনা
কথাটা আমার খুব পছন্দ হইল। কৃষক-প্রজা নেতাদের মধ্যে যাঁদেরে আমি কলিতাকায় উপস্থিত পাইলাম, তাঁদের সকলকে আমি আমার বাসায় দাওয়াত করিলাম। মৌঃ আশরাফুদ্দিন চৌধুরী, মৌঃ শামসুদ্দিন আহমদ, মিঃ আবু হোসেন সরকার, অধ্যাপক হুমায়ুন কবির, নবাবযাদা হাসান আলী, মৌঃ গিয়াসুদ্দিন আহমদ ও চৌধুরী নূরুল ইসলাম প্রভৃতি নেতৃবৃন্দ আমার বাসায় সমবেত হইলেন। অনেক আলাপ-আলোচনা হইল। কিন্তু আমার মতবাদ ও বিশ্লেষণ তাঁরা গ্রহণ করিলেন না। তবে আলোচনা ভাংগিয়াও দিলেন না। পর-পর কয়েকদিন ধরিয়া আলোচনা চলিল। তৎকালে কংগ্রেসের ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন খুবই জোরদার হইয়াছে। ইউরোপে হিটলারের জয়-জয়কার। মিত্র পক্ষসহ ইংরাজরা প্রায় ফতুর। এশিয়ায় জাপান ইংগ মার্কিন শক্তিকে মারের পর মার দিতেছে। সুভাষ বাবুর নেতৃত্বে ‘আযাদ-হিন্দু-ফৌজ’ কোহিমায় পৌঁছিয়াছে। এমন পরিবেশে মুসলিম লীগের সহিত মার্জ করার প্রয়োজনীয়তা সকলের কাছেই খুব ক্ষীণ মনে হইল। আমাদের আলোচনা সভা ভাংগিয়া গেল। আমার এদিককার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় আমি খবরের কাগয়ে বিবৃতি দিয়া কৃষক-প্রজা-কর্মীদের কর্তব্য সম্বন্ধে আমার মতামত ব্যক্ত করিলাম। আমার এই সব বিবৃতি মুসলিম লীগের মুখপত্র ‘আজাদ’ ছাড়া আর কেউ ছাপিলেন না। ফলে বন্ধুরা প্রায় সকলেই ধরিয়া নিলেন আমি মুসলিম লীগে যোগদান করিয়া ফেলিয়াছি। অতঃপর কৃষক-প্রজা-কর্মীদের কাছে আমার উপদেশের স্বভাবতঃই কোন মূল্য থাকিল না।
২০. রেনেসাঁ সোসাইটিতে যোগদান
ইতিমধ্যে আজাদ-সম্পাদক মৌঃ আবুল কালাম শামসুদ্দিন প্রভৃতির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত রেনেসাঁ সোসাইটির মতবাদে আমি আকৃষ্ট হইলাম। শামসুদ্দিন ও আমি একই ম্যানসনের পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকিতাম। রাতদিন আমাদের মধ্যে রাজনীতিক বিবর্তনের ও যুদ্ধ-পরিস্থিতির আলোচনা হইত। আমাকে বুঝাইবার জন্য শামসুদ্দিন প্রায়ই তাঁর সহকর্মী মুজিবুর রহমান খাঁ ও হবিবুল্লাহ বাহারকে সংগে নিয়া আসিতেন। দীর্ঘক্ষণ ধরিয়া গরম আলোচনা হইত। ফলে আমি রেনেসাঁ সোসাইটিতে যোগদান করিলাম। এরা আমার প্রাপ্যাধিক মর্যাদা দিলেন। আমাকে মূল সভাপতি নির্বাচন করিয়া পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সম্মিলনীর আয়োজন করিলেন।
