১৫. নাযিম-মন্ত্রিসভা
এমনি অবস্থায় ১৯৪৩ সালের ২১শে মার্চ তারিখে দ্বিতীয় হক মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করেন। তিন-চার দিন মধ্যেই ৩রা এপ্রিল নাযিমুদ্দিন সাহেব মন্ত্রিসভা গঠন করেন। হক সাহেবের মত জনপ্রিয় নেতার নেতৃত্বের ও আইন পরিষদে নিশ্চিত মেজরিটির অভাব পূরণের আশায় মুসলিম লীগ নেতারা হক সাহেবের আমলের মন্ত্রিসংখ্যা ১১ হইতে বাড়াইয়া ১২ করিলেন এবং হিন্দু মন্ত্রীর সংখ্যা ৫ হইতে ৬ করিলেন। ইউরোপীয় মেম্বাররা বরাবরের মতই মন্ত্রিসভা সমর্থন করিয়া গেলেন। তবু নাসিম মন্ত্রিসভা আইন পরিষদে কোন কাজ করিতে পারিলেন না। কারণ নাযিম মন্ত্রিসভার আমলেই ১৯৪৩ সালের আগস্ট-সেপ্টম্বরে (বাংলা ১৩৫০ সালের ভাদ্র-আশ্বিনে) বাংলার ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা ধ্বংসকারী দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়াছিল। অনেকের মতে এই দুর্ভিক্ষ ‘ছিয়াত্তুরের মন্বন্তরের’ (১২৭৬ বাংলা সাল) চেয়েও ব্যাপক ও দুর্বিষহ হইয়াছিল। দুর্ভিক্ষের ব্যাপকতার ও যুদ্ধের প্রচণ্ডতার সময় আমরা প্রধানতঃ যান বাহনের অভাবে কলিকাতার বাহিরে যাইতে পারি নাই। কাজেই মফলের দুর্ভিক্ষের দুর্বিষহ চিত্র আমি স্বচক্ষে দেখি নাই। শুধু মফস্বলে যাইতে পারি নাই, তাও নয়। শহরের ভিতরেও আমরা পায় হাঁটিয়াই কাজ-কর্ম করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। তা করিতে গিয়া কলিকাতা শহরের রাস্তা-ঘাটে সেদিন যা দেখিয়াছিলাম তাই এতদিন পরেও বিষম যন্ত্রণাদায়ক দুঃস্বপ্নের মতই স্মৃতি-পথে উদিত হয় এবং গা শিহরিয়া উঠে। অভূক্ত নিরন্ন রুগ্ন অস্থিচর্মসার উলংগ নর-নারীর মিছিল আমরা শুধু এই সময়েই দেখিয়াছি। ডাস্টবিনে খাদ্যের তালাশে মানুষে-কুত্তায় কাড়াকাড়ি করিতে তখনই আমরা প্রথম দেখিয়াছি। অভূক্ত উলংগ কংকালসমূহের এই মিছিলের যেন আর শেষ নাই। কোথা হইতে এত লোক আসিতেছে? খবরের কাগযে পড়িলাম, শস্য-ভাণ্ডার পূর্ব বাংলার পল্লীগ্রাম হইতেই এই মিছিল আসিতেছে বেশি।
১৬. আকাল
বিশ্ব-ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা হৃদয়বিদারী এই দুর্ভিক্ষের দায়িত্ব ও অপরাধ বর্তে গিয়া নাযিম মন্ত্রিসভার ঘাড়ে। পড়িবেই ত। তাঁদের আমলেই এই দুর্ভিক্ষ হইয়াছে। এই দুর্ভিক্ষে অনুমান পঞ্চাশ লক্ষ লোক মারা গিয়াছে। বদনাম তাঁদের সইতেই হইবে।
কিন্তু সত্য কথা এই যে দুর্ভিক্ষের কারণ ঘটিয়াছিল এই মন্ত্রিসভার গদিতে বসার আগেই। এই যুক্তিতে পূর্ববর্তী মন্ত্রিসভা মানে দ্বিতীয় পর্যায়ের হক-মন্ত্রিসভাকেই দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী করা হয়। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে এই দুর্ভিক্ষের দায়িত্ব বন্টনের আপ্রাণ চেষ্টা হয় উভয় পক্ষ হইতে। প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রচার-সম্পাদক হিসাবে আমি নিজে ‘আকাল আনিল কারা?’ নামে পুস্তিকা লিখিয়াছিলাম। তাতে মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ সাব্যস্ত করিয়া হক-মন্ত্রিসভাকেই অপরাধী, প্রমাণ করিয়াছিলাম। কিন্তু সত্য কথা এই যে এসব ছিল নির্বাচনের প্রাক্কালে পার্টি প্রপ্যাগো। প্রকৃতপক্ষে ঐ আকালের জন্য এককভাবে দুই মন্ত্রিসভার কেউই দায়ী ছিলেন না। উভয় মন্ত্রিসভাই অংশতঃ দায়ী ছিলেন। আসলে আকালের কারণ ঘটাইয়াছিলেন ভারত-সরকার। যুদ্ধ-প্রচেষ্টার অন্যতম পন্থা হিসাবে তাঁরা বাংলার চাউল যতটা পারিলেন সংগ্রহ করিয়া বাংলার বাইরে সুদূর জবলপুরে গুদামজাত করিলেন। জাপানীদের হাত হইতে দেশী যানবাহন সরাইবার মতলবে ‘ডিনায়েল পলিসি’ হিসাবে নদীমাতৃক পূর্ব-বাংলার সমস্ত নৌকা ধ্বংস করিয়া জনসাধারণের দৈনন্দিন কাজ-কর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্য অচল করিয়া দিলেন। চরম প্রয়োজনের দিনেও ভারত সরকার বাংলা-হইতে-নেওয়া চাউলগুলিও ফেরত দিলেন না। বাংলা সরকার নোমি-মন্ত্রিসভা) যখন বিহার হইতে উদ্বৃত্ত চাউল খরিদ করিতে চাইলেন, তখন বাংলাসহ অন্যান্য প্রদেশের হিন্দু-নেতারা চাউল সরবরাহের প্রতিবাদ করিলেন।কেউ কেউ স্পষ্টই বলিলেন, খাদ্যঘাটতির বাংলাদেশ কেমন করিয়া পাকিস্তান দাবি করে তা শিখাইতে হইবে। এগুলি আকালের বাইরের কারণ। এগুলির জন্য হক সরকার বানাযিম-সরকার কাউকে দোষ দেওয়া যায় না।
১৭. আকালের দায়িত্ব
কিন্তু যে জন্য তাঁদেরে দোষ দেওয়া যায়, সেটা ছিল তাঁদের দায়িত্ব-চ্যুতি ও কর্তব্য-ক্রটি। নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার হিসাবে যা তাঁদের কর্তব্য ছিল তা তাঁরা করেন নাই। তাঁরা সম্পূর্ণ আমলাতান্ত্রিক সরকারের মত কাজ করিয়াছিলেন। প্রথমতঃ তাঁরা অবস্থা জানিয়াও নিজেরা সাবধান হন নাই। দ্বিতীয়তঃ জনসাধারণকে সাবধান করেন নাই। বরঞ্চ প্রকৃত অবস্থা জনসাধারণ হইতে গোপন করিয়াছেন। খাদ্যাভাব অনিবার্য ও আসন্ন, তবু বলিয়াছেন কোনও অভাব নাই। অনাহারে লোক মরিতে শুরু করিয়াছে, তবু বলিয়াছেন কেউ মরে নাই। যারা মরিয়াছে তারা খাদ্যের অভাবে মরে নাই। অতি ভোজনের দরুন পেটের পীড়ায় মরিয়াছে ইত্যাদি।
দায়িত্বহীন আমলাতান্ত্রিক সরকারের এটা চিরন্তন অভ্যাস। দেশবাসী এই সরকারী অভ্যাসের সাথে সুপরিচিত। পাকিস্তানেও আজো চলিতেছে। গণতন্ত্রের অভাবই এর কারণ। এ অবস্থায় জনসাধারণের প্রতি যেমন সরকারের দায়িত্ব-বোধ নাই; সরকারের প্রতিও তেমনি জনসাধারণের কোনও দায়িত্ববোধ নাই। পাঠকগণ সাম্প্রতিক এমন ঘটনার কথা জানেন। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ ঘোষণা করিতে গিয়া প্রথমে সরকার পক্ষ যেখানে বলিয়াছেন মাত্র চার জন মারা গিয়াছে, সেখানে জনসাধারণের পক্ষ হইতে বলা হইয়াছে চল্লিশ হাজার মারা গিয়াছে। শেষ পর্যন্ত অনেক হিসাব কিতাব করিয়া সরকার স্বীকার করিয়াছেন চার হাজার মারা গিয়াছে। জনসাধারণও যেন সেই সংখ্যা মানিয়া লইয়াছে। এ যেন আগের দিনের চকবাজারে জিনিস খরিদ করা। দোকানদার হাকিলেন পাঁচ টাকা। খরিদ্দার বলিলেন চার আনা। দামাদামিতে শেষ পর্যন্ত দশ আনায় খরিদ-বিক্রি হইল। গণতন্ত্রহীন আমাদের দেশের জনগণ ও সরকারের সম্বন্ধ আজও তাই। জনগণ যত বেশি ক্ষতি দেখাইয়া যত বেশি চাহিয়া যত বেশি আদায় করিতে পারে তাই লাভ। আর সরকারও ক্ষতি যত কমাইয়া সাহায্য যত কম দিয়া পারেন ততই লাভ। যুদ্ধাবস্থার দরুন তৎকালীন সরকার দুইটি নির্বাচিত মন্ত্রিসভা হইয়াও কার্যতঃ ছিলেন আমলাতান্ত্রিক। মন্ত্রীদের অপরাধ ছিল এই যে জনগণের কোন কাজে লাগেন নাই তবু তাঁরা গদি আঁকড়াইয়া পড়িয়াছিলেন।
