১৪. বাংলা-ভিত্তিক সমাধানের শেষ চেষ্টা
প্রগ্রেসিভ কোয়েলিশন গঠনও ছিল এমনি একটা ব্যাপার। আশু কারণ হয়ত ছিল তাঁর সাময়িক প্রয়োজন। কিন্তু ভাব-প্রবণতা-বশে তিনি এমন এক কাজ করিয়াছিলেন, বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিক হইতে যার সম্ভাবনা ছিল বিপুল। কিন্তু বরাবর যেমন, এবারও তেমনি, হিন্দু-নেতৃত্বের অদূরদশী সংকীর্ণতা সে সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করিয়া দিল। জিন্না-হক দ্বন্দ্বকে তাঁরা নিজেদের অপূর্ব সুযোগ মনে করিলেন। খাদে-পড়া বাংলার সিংহকে দিয়া তাঁরা গাধার বোঝা বওয়াইতে চাহিলেন। হক সাহেবকে দিয়া তাঁরা এমন সব কাজ করাইতে চেষ্টা করিলেন, একটু তলাইয়া চিন্তা করিলেই বুঝা যাইত, সেগুলি পরিণামে মুসলিম স্বার্থ বিরোধী, সুতরাং সে কাজ মুসলিম সমাজে হক সাহেবের অপ্রিয় হওয়ার কারণ হইতে পারে। এই ধরনের কাজের মধ্যে নিয়ে মাত্র কয়েকটির উল্লেখ করা যাইতেছে,
(১) আইন পরিষদের বিবেচনাধীন মাধ্যমিক শিক্ষা বিলটির আলোচনা স্থায়ীভাবে স্থগিত হইল। ঘটনাচক্রে এই সময়েই আযিযুল হকের ভাইস চ্যান্সেলারির অবসান হয়। প্রথম হক মন্ত্রিসভার আমলে ১৯৪০ সালে তিনি ভাইস চ্যান্সেলার নিযুক্ত হন। লীগ নেতারা এই ঘটনার সদ্ব্যবহার করিলেন।
(২) ১৯৪২ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জ প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করিবার জন্য জিন্ন সাহেব ১১ই ফেব্রুয়ারি কলিকাতা পৌঁছিলে তাঁর উপর ১৪৪ ধারার নিষেধাজ্ঞা জারির ব্যবস্থা হয়। কলিকাতার মুসলমানদের ফাটিয়া-পড়া রোষের মুখে তা পরিত্যক্ত হয়। ফলে জিন্না সাহেব আশাতীত ও কল্পনাতীত অভ্যর্থনা পান এবং নয়া হক মন্ত্রিসভা অনাবশ্যকভাবে একটা অপ্রিয়তা অর্জন করেন।
(৩) জাপানী বোমার আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষার জন্য যে এ. আর. পি. প্রতিষ্ঠান আগেই প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, ১৯৪২ সালে ইহাকে সম্প্রসারিত করিয়া সিভিল ডিফেন্স নামে একটি স্বতন্ত্র বিভাগে রূপান্তরিত করা হইল। কলিকাতার অধিবাসীরা শতকরা আশি জনই হিন্দু, এই যুক্তিতে এক-ধারসে বহু হিন্দুকে এই প্রতিষ্ঠানে নূতনভাবে নিযুক্ত করা হইতে লাগিল। মুসলিম লীগ-নেতারা এবং তাঁদের মুখপত্র ‘আজাদ’ এর বিরাট সুযোগ গ্রহণ করিলেন। তাঁরা এই ব্যবস্থার প্রতিবাদে দস্তুরমত একটি প্রাদেশিক সম্মিলনী করিয়া বসিলেন। হক সাহেবের নয়া মন্ত্রিসভা মুসলিম সমাজে আরও অপ্রিয় হইয়া পড়িলেন।
(৪) ১৯৪২ সালের ২৪শে অক্টোবর ময়মনসিংহ জিলার কিশোরগঞ্জ শহরের জামে মসজিদে পুলিশের গুলিবর্ষণ ও তার ফলে কয়েক জনের মৃত্যু। মসজিদের সামনে হিন্দুদের বাজনার অধিকার লইয়া যোব বছর আগে ১৯২৬ সালে বরিশালের কুলকাঠি থানার পোনাবালিয়ার পর গুলি বর্ষণের মত ঘোরতর এটাই দ্বিতীয় ঘটনা। কিন্তু সেটা ছিল মসজিদের সামনে; আর এটা হইল মসজিদের ভিতরে। সেটা ছিল দ্বৈত শাসনে ইংরাজ হোম মিনিস্টারের রাজত্বে শ্বেতাঙ্গ জিলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ র্যাভির আমলে, আর এটা হইল স্বায়ত্তশাসনে হক সাহেবের হোম মিনিস্টারির রাজত্বে হিন্দু জিলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ বানার্জির আমলে। মুসলমানরা স্বভাবতঃই খুবই উত্তেজিত হইল। বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করিল তারা। কিন্তু সরকার হুকুম দিলেন জিলা ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়া বিভাগীয় তদন্ত করিবার। জিলা মেজিস্ট্রেট ছিলেন মিঃ বানাজী। তাঁর উপর নানা কারণে জিলার মুসলমানরা অসন্তুষ্ট ছিল। তার উপর তাদের সন্দেহ ছিল মিঃ বানার্জীর জানামতেই ঐগুলি চলিয়াছিল। সুতরাং প্রতিবাদে সারা জিলার এবং ক্রমে সারা বাংলার মুসলমানরা ক্ষেপিয়া গেল। কিশোরগঞ্জের মুসলমানরা সংগে সংগে মসজিদের নামকরণ করিল শহিদী মসজিদ। ঘটনাচক্রে এর কিছুদিন আগেই ‘নবযুগ’ হইতে আমার চাকুরি গিয়াছিল। সে ব্যাপারেও আমি উপলব্ধি করিয়াছিলাম যে মুসলিম মন্ত্রীরা, এমন কি স্বয়ং হক সাহেবও, ক্রমে অসহায় হইয়া পড়িতেছেন। নয়া কোয়েলিশনের সাফল্যের সম্ভাবনা ক্রমেই তিরোহিত হইতেছে।
এইভাবে হক সাহেবের প্রগ্রেসিভ কোয়েলিশন মুসলিম সমাজে চরম অপ্রিয়তার পাত্র হইয়া উঠিল। ওদিকে কংগ্রেসের ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন জোরদার হওয়ার সাথে-সাথে ভারত সরকারের দমন-নীতিও কঠোরতর হইয়া উঠিতে লাগিল। নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের নেতৃত্বে ‘আযাদ হিন্দ ফৌজ’ বর্মা ছাড়াইয়া মনিপুরের কোহিমা শহর ধরে-ধরে। কাজেই বাংলার জনগণ সাধারণভাবে, এবং হিন্দুরা বিশেষভাবে, ইংরেজ-বিরোধী মনোভাবে উদ্দীপ্ত। প্রাদেশিক সরকার ভারত সরকারের হুকুম-বরদার মাত্র। শাসনতন্ত্রে যা কিছু স্বায়ত্তশাসনাধিকারের বিধান ছিল, যুদ্ধের বিশেষ অবস্থায় তার সবই আপাততঃ বাতিল। সুতরাং হক মন্ত্রিসভা কেন, কোনও মন্ত্রিসভার পক্ষেই তখন জনপ্রিয়তা রক্ষা সম্ভব ছিল না। এই সময় মেদিনীপুরে কংগ্রেস আন্দোলনকারীদের উপর অমানুষিক পুলিশী যুলুম হইল। প্রধান মন্ত্রী হক সাহেব গভর্ণর জন হার্বার্টকে দুঃসাহসী কড়া চিঠি লিখিলেন। কিন্তু কিছু হইল না। ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ এই ফাঁকে পদত্যাগ করিয়া হিন্দু সমাজে খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করিলেন। কিন্তু কংগ্রেসী মন্ত্রীরা বা আর কেউ পদত্যাগ করিলেন না।
এর পর আরও মাস ছয়েক হক সাহেবের মন্ত্রিত্ব টিকিয়া থাকিল। কিন্তু ওটা শুধু গদিতে টিকিয়া থাকা মাত্র। যুদ্ধাবস্থায় রাজনৈতিক ক্ষমতা খাটাইবার বিশেষ সুযোগ ছিল না ধরিয়া নিলেও প্রগ্রেসিভ কোয়েলিশনের আসল যে মহৎ উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করিয়া বাংলার হিন্দু-মুসলিমে একটা স্থায়ী ঐক্য বন্ধন সৃষ্টি করা, সে দিকেও নেতারা কিছু করিলেন না। মন্ত্রিত্ব রক্ষার কাজে সবাই এত ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন যে দেশের বৃহত্তর সমস্যার কথা ভাবিবার বোধ হয় তাঁদের সময়ই ছিল না।
