ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ ইচ্ছা করিলে তা পারেন সে বিশ্বাস আমার হইয়াছিল। প্রথমতঃ তিনি অসাধারণ সুবক্তা ছিলেন। দ্বিতীয়তঃ আমি তাঁর সাথে কয়েকদিন মিশিয়াই বুঝিয়াছিলাম, তাঁর সম্বন্ধে হক সাহেব যা বলিয়াছেন, তা ঠিক। সাম্প্রদায়িক ব্যাপারে সত্য-সত্যই তিনি অনেক কংগ্রেসী নেতার চেয়েও উদার। হিন্দু সভার নেতা হইয়াও কোনও হিন্দু নেতার পক্ষে মুসলমানদের প্রতি এমন উদার মনোভাব পোষণ করা সম্ভব, আমার এ অভিজ্ঞতা হইল প্রথমে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদকে দেখিয়া! অবশ্য পরবর্তী কালে তেমন মনোভাবের লোক আরও দেখিয়াছিলাম। আমার নিজের জিলাতেই এমন কয়জন হিন্দু-সভা নেতা দেখিয়াছি, যাঁরা পাকিস্তান হওয়া মাত্র অনেক কংগ্রেস নেতার মত দৌড় মারিয়া সীমান্ত পার হন নাই। বরঞ্চ পাকিস্তানের অনুগত উৎসাহী নাগরিক হিসাবে সকল কাজে মুসলমানদের সহিত সহযোগিতায় ও বন্ধুভাবে পাকিস্তান আন্দোলন সপরিবারে বসবাস করিতেছেন। তবে এটা ঠিক যে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদের বেলা কিছুদিন পরেই বুঝিয়াছিলাম তাঁর উদারতা প্রধানতঃ ব্যক্তিগত মহত্ব, রাজনৈতিক সমস্যা ঘটিত দূরদৃষ্টি নয়।
যা হোক, আমার প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত রহিত হইল না। যতদূর বোঝা গেল, তাতে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদের চেয়ে হক সাহেবের দোষই এতে বেশি ছিল। এক দিকে হক সাহেব আমাকে বলিলেন : তোমার প্রস্তাব শুনিতে ভাল; কিন্তু ওটা কাজে কতদূর সফল করিতে পারি তা চিন্তা করিয়া দেখ। অপর দিকে ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ বলিতে থাকিলেন : আপনার প্রস্তাবে আমি এখনি রাযী। প্রধান মন্ত্রীকে রাযী করান।
শেষ পর্যন্ত হক সাহেব চলিলেন নোয়াখালি। ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ সফরে বাহির হইয়া গেলেন মেদিনীপুর। আমার উৎসাহের জোয়ারে ভাটা পড়িল। শেষ পর্যন্ত প্রবোধ মানিলাম, বোধ হয় হক সাহেবের কথাই ঠিক। কিন্তু হিন্দু সভার সাথে হক সাহেবের মিলনের মত একটা অদ্ভুত ও অচিন্তনীয় ব্যাপারের ফলো-আপ’ বা সম্পূরক হিসাবে তেমন কোনও অভিনব চমকপ্রদ কর্মপন্থা অথবা সফর-সূচি গৃহীত না হওয়ায় মুসলিম জনগণের মধ্যে কোথাও কোনও অনুকূল প্রতিক্রিয়া দেখা দিল না। পক্ষান্তরে শহীদ সাহেবের মত মস্তিষ্কবান সংগঠক ও অক্লান্ত পরিশ্রমী নেতা সারা পূর্ব বাংলার দীঘলি-পাথালি সকল শহর-নগরে সভা-সমিতি করিয়া বেড়ানোতে এবং অধিকাংশ মুসলিম ছাত্র মিঃ ওয়াসেকের নেতৃত্বে মুসলিম লীগকে সক্রিয় সমর্থন দেওয়ায় নয়া হক মন্ত্রিসভা এবং ব্যক্তিগতভাবে হক সাহেব পূর্ব বাংলার মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয়তা হারাইয়া ফেলিলেন। নাটোর ও বালুর ঘাটে পরপর দুইটা উপ নির্বাচনে হক সাহেবের মনোনীত প্রার্থীদ্বয়কে পরাজিত করিয়া মুসলিম লীগ প্রার্থী জয়যুক্ত হইলেন।
১৩. নয়া হক মন্ত্রিসভার স্বরূপ
মুসলিম বাংলার রাজনীতিতে এই পরিবর্তন আসিল এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে। হক সাহেব যখন মুসলিম লীগকে বাদ দিয়া কৃষক-প্রজা পার্টি সুভাষ-পন্থী কংগ্রেস ও হিন্দু-সভার সহিত প্রগেসিভ কোয়েলিশন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। (১৯৪১ সালের ১১ই ডিসেম্বর) তখন আইন পরিষদের মোট ২৫০ জন ও মুসলিম ১২৩ জন মেম্বরের মধ্যে মাত্র ৩৫ জন ও আইন সভার (লেজিসলেটিভ কাউন্সিল) মুসলিম সদস্য ৩৭ জনের মধ্যে মাত্র ৮ জন মুসলিম লীগ দলে থাকেন। বাকী সকলেই হক সাহেবের পক্ষে থাকেন। অথচ বছর না ঘুরিতেই অনেক মেম্বর ছাত্র-জনতার চাপে অনিচ্ছা সত্ত্বেও হক সাহেবের পক্ষ ছাড়িয়া মুসলিম লীগ পক্ষে চলিয়া যান। অবশ্য রাজনীতির পাশবর তাতে হক মন্ত্রিসভার মুসলিম সমর্থকরা কোনদিনই আইন পরিষদে বা উচ্চ পরিষদে কোথাও মাইনরিটি হন নাই।
এই নব পর্যায়ের হক মন্ত্রিসভা ১৯৪১ সালের ১১ ডিসেম্বর হইতে ১৯৯৩ সালের ২৯ মার্চ পর্যন্ত এক বছর চার মাসের অধিক কাল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। এই মুদতে হক সাহেব মুসলিম বাংলার জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু করিতে না পারিলেও ইচ্ছাকৃতভাবে কোনও অনিষ্টও করেন নাই। তথাপি মুসলিম লীগ তরফের প্রচার ফলে এবং অবস্থাগতিকে মুসলিম গণ-মনে এবং তার চেয়ে বেশি মুখে-মুখে এই মন্ত্রিসভার মুদ্দতটা মুসলিম বাংলার অন্ধকার যুগ ও হক সাহেবের জীবনের কলংকময় অধ্যায়স্বরূপ চিত্রিত হইয়াছে। প্রথমে নামটার কথাই ধরা যাক। মুসলিম লীগাররা এটাকে ‘শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা’ নামে আখ্যায়িত করিয়াছেন। শাসনতন্ত্রের দিক দিয়া। এই বিশেষণ যেমন অসৌজন্যমূলক ছিল; বাস্তব ব্যাপারেও এটা তেমনই ভিত্তিহীন ছিল। হক সাহেব শ্যামাপ্রসাদ বা হিন্দু সভার সাথে কথায় কি কাজে প্রধান মন্ত্রিত্ব বাটোয়ারা করেন নাই। ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ ছাড়া ঐ মন্ত্রিসভায় হিন্দু সভার আর কোনও মন্ত্রী ছিলেন না। তিনি যদিও অর্থ দফতরের মন্ত্রী ছিলেন, তবু অন্যান্য মন্ত্রীদের চেয়ে তাঁর কোন বিশেষ অধিকারও ছিল না। হক সাহেবের উপর তাঁর প্রভাবও কংগ্রেসী মন্ত্রীদের চেয়ে বেশি ছিল না। তথাপি হক সাহেবের রাজনৈতিক দুশমনেরা বিশেষতঃ লীগ নেতারা এই মন্ত্রিসভাকে ‘শ্যামা-হক-মন্ত্রিসভা’ নাম দিয়াছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম জনসাধারণের চোখে প্রথম দৃষ্টিতেই মন্ত্রিসভাকে অপ্রিয় করা। কিন্তু এ কাজ অমন সোজা হইত না যদি নয়া মন্ত্রিসভা পর-পর কতকগুলি তুল না করিতেন। এই সব ভুল করিবার মূলে রহিয়াছে অবশ্য বাংলার হিন্দু নেতৃবৃন্দের অদূরদশী সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। হক সাহেব জিন্না সাহেবের সাথে ব্যক্তিগতভাবে ও মুসলিম লীগের সাথে প্রতিষ্ঠান হিসাবে যুদ্ধে নামিয়া দুর্জয় সাহসের কাজ করিয়াছিলেন সারা বাংলার বিশেষতঃ মুসলিম বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির উদ্দেশ্যে। তাঁর গুরু সার প্রফুল্ল চন্দ্রের মত হক সাহেবও মনে করিতেন, পশ্চিমা নেতৃত্ব শুধু বাংলার রাজনীতিতেই অনধিকারচর্চা ও অন্যায় প্রভাব বিস্তার করে নাই, হিন্দু-মুসলিম মাড়ওয়ারীরা বাংলার অর্থনৈতিক জীবনেও চাপিয়া বসিয়াছে। এই উভয় রাহুর কবল হইতে বাংলাকে মুক্ত করাই ছিল হক সাহেবের প্রগেসিত কোয়েলিশন গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য। অবশ্য এ কথা সহজেই বলা যায় যে এত মহৎ উদ্দেশ্যের কথা ভাবিয়া-চিন্তিয়া হক সাহেব ও-কাজ করেন নাই। অমন গঠনমূলক চিন্তা-ধারা হক সাহেবের স্বভাবের মধ্যেই ছিল না। তিনি প্রায় সব কাজই করিতেন ভাব-প্রবণতা বশে এবং সাময়িক প্রয়োজনের তাকিদে। কিন্তু এটা হক-মনীষার বিরাটত্বের নিদর্শন যে তিনি ভাব-প্রবণতা-বশে যা করিতেন বা বলিতেন তার প্রায় সবগুলিই গুরুতর জাতীয় তাৎপর্য বহন কৃরিত। আপাতঃদৃষ্টিতে অনেকগুলি খারাপ লাগিত, আপাতঃশ্রবণে অনেকগুলি অশালীন ও শ্রুতিকটু শুনাইত বটে, কিন্তু পরিণাম বিচারে সেগুলি বাস্তব সত্য বলিয়া বুঝা যাইত। মুসলিম লীগের পাটনা অধিবেশনে তিনি ‘সেতানা’র অর্থাৎ হিন্দু-প্রধান প্রদেশে মুসলিম-পীড়ন হইলে প্রতিশোধ স্বরূপ বাংলায় তিনি হিন্দু-পীড়ন করিবেন বলিয়া যে উক্তি করেন, যতই শ্রুতিকটু হউক, এটা ছিল এই ধরনের উক্তি। এর মধ্যে তাঁর সাধু উদ্দেশ্য ছাড়া আর কিছু ছিল না। ছিল না বলিয়াই এমন বেয়াড়া অশোভন উক্তি তিনি করিয়াছিলেন এমন এক সময়ে যখন তাঁর মন্ত্রিসভার অর্ধেকই হিন্দু এবং তাঁর সমর্থক কোয়েলিশন পার্টির এক-তৃতীয়াংশ মেম্বরও হিন্দু। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমন বহু দৃষ্টান্ত আছে।
