কিন্তু এই অবস্থায় বেশিদিন গেল না। ৭ই ডিসেম্বর জাপান জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে অবতরণ করিল এবং ঝটিকা আক্রমণে পার্ল হার্বার নামে বিখ্যাত মার্কিন বন্দর বোমা-বিধ্বস্ত করিল। পরদিন ৮ই ডিসেম্বর বৃটিশ ও মার্কিন সরকার জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিলেন। ইউরোপীয় যুদ্ধ এতদিনে সত্য-সত্যই বিশ্বযুদ্ধে রূপান্তরিত হইল। বোধহয় বড় লাটের নির্দেশে বাংলার লাটের নীতির পরিবর্তন হইল। তিনি ১০ই ডিসেম্বর হক সাহেবকে নয়া মন্ত্রিসভা গঠনে কমিশন করিলেন। আমাদের মধ্যে বিপুল উল্লাস দেখা দিল। লীগ মহলে বিষাদ! কিন্তু হরিষে-বিষাদ হইল আমাদের। লাট সাহেব ইচ্ছার বিরুদ্ধে হক সাহেবকে মন্ত্রিত্ব দিলেন বটে, কিন্তু তাঁর ডান হাতটি ভাংগিয়া দিলেন। প্রগেসিভ কোয়েলিশনকে সত্য-সত্যই প্রগতিবাদী জাতীয় পার্টি হিসাবে রূপ দিতে পারিতেন যিনি তিনি ছিলেন মিঃ শরৎ চন্দ্র বসু। হক সাহেবের পরেই তাঁর দ্বিতীয় স্থান। নয়া মন্ত্রিসভার তালিকাও সেই ভাবেই করা হইয়াছিল। শরৎ বাবুকে দেওয়া হইয়াছিল স্বরাষ্ট্র দফতর। কিন্তু ১১ই ডিসেম্বর বেলা ১০টায় মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ করিবার মাত্র কয়েক ঘন্টা আগে শরৎ বাবুকে ভারত রক্ষা আইনে গ্রেফতার করিয়া প্রেসিডেন্সী জেলে নেওয়া হইল। আমরা যারা মন্ত্রী হইতেছিলাম না, তারা সবাই রাগে উন্মত্ত হইয়া উঠিলাম এবং হক সাহেবকে এই গ্রেফতারির প্রতিবাদে মন্ত্রিসভা গঠন করিতে অস্বীকার করিতে উপদেশ দিতে লাগিলাম। কিন্তু যারা মন্ত্রী হইতে যাইতেছিলেন তাঁরা সকলেই আমাদের চেয়ে অনেক বিদ্ধান জ্ঞানী অভিজ্ঞ দূরদশী ধীর চিত্তের লোক ছিলেন। তাঁরা উপদেশ দিলেন যে শরৎ বাবুর পোর্টফলিও খালি রাখিয়া অবশিষ্ট মন্ত্রীদের শপথ নেওয়া হইয়া যাক। শপথ নেওয়ার পর পরই প্রধানমন্ত্রী হক সাহেব লাট সাহেবের সহিত দরবার করিয়া শরৎ বাবুর মুক্তির বন্দোবস্ত করুন। হক সাহেব মন্ত্রিসভা গঠনে অস্বীকার করিলে শীগকেই মন্ত্রিত্ব দেওয়া হইবে, এ বিষয়ে সকলেই একমত হইলেন। তাই হইল। নয়া হক মন্ত্রিসভার শপথ যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হইল। শপথ শেষে প্রধানমন্ত্রী লাট সাহেবের সহিত দেখাও করিলেন। লাট সাহেব বলিয়া দিলেন, ভারত রক্ষা আইনে কেন্দ্রীয় সরকারের হুকুমেই শরৎ বাবুকে গ্রেফতার করা হইয়াছে। প্রাদেশিক লাটের বা সরকারের এ ব্যাপারে কিছুই করণীয় নাই। সত্যই তাঁদের কিছু করণীয় থাকিল না। অতএব শরৎ বাবুকে জেলে রাখিয়াই মন্ত্রিসভার কাজ চলিতে থাকিল। শেষ পর্যন্ত শরৎ বাবুকে বাদ দিয়াই এগার জনের পূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠিত হইল। হক সাহেব ছাড়া মুসলিম মন্ত্রী থাকিলেন পাঁচ জন। যথা : (১) নবাব হবিবুল্লা (2) মৌঃ শামসুদ্দিন (৩) খান বাহাদুর আবদুল করিম (৪) খান বাহাদুর হাশেম আলী (৫) খান বাহাদুর জালালুদ্দিন। হিন্দু মন্ত্রী থাকিলেন পাঁচ জন। যথা : (১) সন্তোষ কুমার বসু (2) ডাঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী (৩) প্রমথ নাথ ব্যানাজী (৪) হেম চন্দ্র লস্কর ও (৫) উপেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ।
১২. মন্ত্রীদের প্রতি অযাচিত উপদেশ
মন্ত্রিসভার সাফল্য-নিষ্ফলতা সম্বন্ধে নিরাসক্ত থাব্বিার যে সিদ্ধান্ত গোড়াতে করিয়াছিলাম, শরৎ বাবুর গ্রেফতারে সে সংকল্প আর ঠিক রাখতে পারিলাম না। মেম্বর-মন্ত্রী না হওয়ায় স্বভাবতঃই আমার পার্লামেন্টারি কোনও দাম ছিল না। কিন্তু হক সাহেবের কাগ ‘নবযুগের সম্পাদকের দায়িত্বের জোরে এবং হক সাহেবের দেওয়া গুরুত্বের বলে মন্ত্রীদিগকে চাওয়া-না-চাওয়া, বাঞ্ছিত-অবাঞ্ছিত উপদেশ দিতে লাগিলাম। আমার মনে হইল প্রগেসিত কোয়েলিশনকে সফল করার উপর শুধু হক সাহেবের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভবিষ্যত নয়, সারা বাংলার, বিশেষতঃ মুসলিম বাংলার, ভবিষ্যৎ নির্ভর করিতেছে। এটাকে সফল করার দায়িত্ব শরৎ বাবুর অভাবে যেন আমারই একার ঘাড়ে পড়িয়াছে। একদিকে দিনের পর দিন সম্পাদকীয় লিখিয়া প্রগেসিভ কোয়েলিশনের গুরুত্ব বুঝাইতে লাগিলাম। অপর দিকে তাকে সফল করিবার ফন্দি-ফিকির মন্ত্রীদের সমঝাইতে লাগিলাম। সম্পাদকীয়গুলি যে খুবই যুক্তিপূর্ণ প্রাণস্পর্শী ও হৃদয়গ্রাহী হইতেছিল তার প্রমাণ পাইলাম শ্রদ্ধেয় সৈয়দ নওশের আলী ও বন্ধুবর সৈয়দ বদরুজার মুখে। এরা দুইজনেই প্রগেসিভ কোয়েলিশন গঠনে এবং ‘নবযুগ’ প্রতিষ্ঠায় আপ্রাণ খাঁটিয়েছেন। কিন্তু এঁরা কেউই মন্ত্রী হন নাই। নওশের আলী সাহেবকে পরে আইন পরিষদের স্পিকার করা হইয়াছিল এবং সৈয়দ বদরুজাকে কর্পোরেশনের মেয়র করা হইয়াছিল। এই দুই বন্ধুই আমার সম্পাদকীয়গুলি পড়িয়া পড়িয়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন যুক্তিতে যাঁর-তাঁর ভাষায় প্রায় একই কথা বলিয়াছিলেন : প্রগেসিত কোয়েলিশনটা যে দেশের জন্য এমন প্রয়োজনীয় ছিল, এটার প্রতিষ্ঠা করিয়া আমরা সে সত্যই একটা মহৎ কাজ করিয়াছি, আপনার সম্পাদকীয় পড়িবার আগে আমরা নিজেরাই তা জানিতাম না। আমি এই প্রশংসার জন্য তাঁদেরে ধন্যবাদ দিয়াছিলাম। কিন্তু মনে মনে হাসিয়া বলিয়াছিলাম : ‘লিখিবার আগে আমিই কি জানিতাম?’
কিন্তু মন্ত্রীদের প্রতি আমার উপদেশ কার্যকরী হইল না। হক সাহেব হইতেই শুরু করা যাক। তিনি একটি বিবৃতিতে বলিলেন : শ্যামাপ্রসাদ মুসলিম বাংলার স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব নিয়াছেন। আর আমি নিয়াছি হিন্দু-বাংলার স্বার্থরক্ষার দায়িত্ব। রাজনৈতিক স্ট্যান্টের রাজা হক সাহেব। তাঁর জন্যও ছিল এটা একটি অসাধারণ স্ট্যান্ট। সত্য সত্যই এটা ঘটাইতে পারিলে বাংলার সার্বিক মুক্তি ছিল অবধারিত। তাতে শুধু বাংলার নয় ভারতের হিন্দু-মুসলিম সমস্যাও সম্পূর্ণ মিটিয়া যাইত। কাজেই ভাব-প্রবণতা হেতু আমি হক সাহেবের এই স্ট্যান্টে সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত হইয়া উঠিলাম। হক সাহেব ও শ্যামাপ্রসাদ বাবুকে মুখে বলিলাম এবং বহু যুক্তি দিয়া ‘নবযুগে’ লম্বা সম্পাদকীয় লিখিলাম। হক সাহেবের পশ্চিম বাংলা ও ডাঃ শ্যামাপ্রসাদের পূর্ব বাংলা সফরে বাহির হওয়া উচিৎ এবং কালবিলম্ব না করিয়াই এ সফর শুরু করা আবশ্যক। ডাঃ শ্যামাপ্রসাদকে আমি আমার নিজের জিলা ময়মনসিংহ হইতেই সফর শুরু করিবার প্রস্তাব দিলাম। আমি বলিলাম : আমি আগেই সেখানে চলিয়া যাইব এবং সমস্ত জনসভা ও নেতৃ-সম্মিলনীর ব্যবস্থা আমিই করিব। জনসভায় কোনও গণ্ডগোল না হওয়ার দায়িত্ব আমার। কিন্তু মুসলিম-জনতার মনে আস্থা সৃষ্টি করিবার দায়িত্ব ডাঃ শ্যামাপ্রসাদের।
