কিন্তু মুসলিম লীগাররাও হক সাহেবের মত জনপ্রিয় প্রভাবশালী নেতাকে হাতছাড়া করিতে রাজি ছিলেন না। তাঁরাও জিন্না-হক আপোসের জন্য তাঁদের সমস্ত শক্তি ও প্রতিপত্তি খাটাইতে লাগিলেন। আপাততঃ তাঁরাই জয়ী হইলেন। হক সাহেবকে দিয়া তাঁর বিবৃতির ব্যাখ্যা করাইলেন। সেই ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ১৬ই নবেম্বর (১৯৪১) মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির দিল্লী বৈঠকে হক সাহেবের সহিত লীগের বিরোধের অবসান ঘটিল। এতে বাংলার লীগ মহল খুব উল্লসিত হইল। কিন্তু আমাদের কলিজা ও মুখ শুকাইয়া গেল। প্রাদেশিক আইন পরিষদের অধিবেশন তখন চলিতে ছিল। কাজেই হক সাহেবের দলীয় মেম্বরদের মধ্যে এবং হক সাহেবের সাথে আমাদের দেন-দরবার চলিতে থাকিল। মুসলিম লীগের সাথে তাঁর মিটমাট হইয়া যাওয়ার কথা তুলিলেই তিনি জবাবে মিচকি হাসিয়া আমাদেরে বলিতেন : ‘ওয়েট এণ্ড সী’।
১১. প্রগ্রেসিভ কোয়েলিশন
এর কয়দিন পরেই হক সাহেব আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন এবং ‘নবযুগে’ প্রচারের নূতন ধারা সম্পর্কে আমাকে নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশ দিতে গিয়াই তিনি সর্বপ্রথম আমাকে জানান যে শুধু কৃষক-প্রজা ও কংগ্রেসের সাথেই তিনি আপোস করিতেছেন না। হিন্দু সভানেতা ডাঃ শ্যামাপ্রসাদের সাথেও তাঁর আপোস হইতেছে। ডাঃ শ্যামা প্রসাদকেও তিনি তাঁর নয়া মন্ত্রিসভায় নিতেছেন। আমি শুধু আকাশ হইতে পড়িলাম না। আস্তা আসমানটাই আমার মাথায় পড়িল। আমি জানিতাম হক সাহেব সময়-সময় খুবই বেপরোয়া হইতে পারেন। কিন্তু এতটা হইতে পারেন, এতকাল তাঁর শাগরেদি করিয়াও আমি তা জানিতাম না। কথাটা শুনিয়া আমি এমন স্তম্ভিত হইলাম যে সে-ভাব কাটিতে বোধ হয় আমার পুরা মিনিট খানেকই লাগিয়াছিল। তিনি আমার মনোভাব বুঝিলেন। গম্ভীর মুখে বলিলেন : ‘শোন আবুল মনসুর, তুমি শ্যামা প্রসাদকে চিন না। আমি চিনি। সে সার আশুতোষের বেটা। করুক সে হিন্দুস। কিন্তু সাম্প্রদায়িক ব্যাপারে তার মত উদার ও মুসলমানদের হিতকামী হিন্দু কংগ্রেসেও একজনও পাবা না। আমার কথা বিশ্বাস কর। আমি সবদিক ভাইবা-চিন্তাই তারে নিতেছি। আমারে যদি বিশ্বাস কর, তারেও বিশ্বাস করতে হবে।‘
আমি খুবই চিন্তায় পড়িলাম। কিন্তু মনে-মনে হাসিলাম ভাবিলাম, শ্যামাপ্রসাদকে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্নই উঠে না। কারণ স্বয়ং হক সাহেবকেই বিশ্বাস করা যায় না। শ্যামাপ্রসাদকে বিচার করিবার কি অমূল্য মাপকাঠিই না হক সাহেব আমাকে দিয়াছেন। সব অবস্থায়ই হক সাহেব রসিক লোক ছিলেন। হক সাহেবের কথায় বুঝিলাম, পরদিনই মিঃ জে সি গুপ্তের বাড়িতে অপযিশন পার্টি সমূহের নেতাদের সংগে হক সাহেবের বৈঠক বসিতেছে। চাঁদ উঠিলে সবাই দেখিবে। আগামী কালই সবাই জানিয়া ফেলিবে। কাজেই এই অশুভ সংবাদটা আমি কারও কাছে বলিলাম না। কিন্তু বিকালেই দেখিলাম সবাই ব্যাপারটা জানেন। ভাবী মন্ত্রীরাই হাসিমুখে এই খবরটা আমাকে দিলেন।
পরদিন ২৮শে নবেম্বর সত্য-সত্যই মিঃ গুপ্তের বাড়িতে ঐ বৈঠক বসিল। দীর্ঘ আলোচনার পর প্রগেসিত কোয়েলিশন পার্টি নামে নয়া কোয়েলিশন গঠিত হইল। হক সাহেব তার লিডার ও শরৎ বাবু ডিপুটি লিডার নির্বাচিত হইলেন। হাসি-খুশির মধ্যে অনেক রাতে সভা ভংগ হইল। রাত্রেই সারা কলিকাতা, বিশেষতঃ খবরের কাগ আফিসগুলি, গরম হইয়া উঠিল। পরদিন সকালে লীগ সমর্থক মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিল। বিকালেই আইন পরিষদের বৈঠকে (২৯শে নবেম্বর) লীগ মেম্বরদের মধ্য হইতে এ ব্যাপারে সোজাসুজি প্রশ্ন উত্থাপিত হইল। হক সাহেব খুব জোরের সাথে সোজাসুজি ও-কথা অস্বীকার করিলেন।
লীগ মন্ত্রী ও মেম্বাররা স্বভাবতঃই হক সাহেবের কথায় আস্থা স্থাপন করিতে পারিলেন না। তাঁরা হক সাহেবের সহিত দেন-দরবার চালাইলেন। শোনা গেল, ইউরোপীয় দলের সঙ্গেও তারা যোগাযোগ রক্ষা করিতে লাগিলেন। পর্দার আড়ালে কি হইল, আমরা পথের মানুষেরা তার খবর রাখিলাম না। দেখা গেল, ১লা ডিসেম্বর তারিখে মুসলিম লীগ মন্ত্রীরা সকলে এক সাথে হক মন্ত্রিসভা হইতে পদত্যাগ করিলেন। মুসলিম লীগ পার্টিও আর হক মন্ত্রিসভাকে সমর্থন করে না বলিয়া ঘোষণা করিল। অগত্যা হক সাহেবও পদত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। পরদিন ৩রা ডিসেম্বর হক সাহেব খবরের কাগয়ে বিবৃতি দিয়া নব-গঠিত প্রগেসিভ কোয়েলিশন পার্টির নেতৃত্ব ‘কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদের সহিত’ গ্রহণ করিলেন।
লীগ মন্ত্রীরা যে সাত তাড়াতাড়িতে হক মন্ত্রিসভা হইতে পদত্যাগ করিয়াছিলেন, তার আসল কারণ এতদিনে বোঝা গেল। তা এই যে ইউরোপীয় দল ও কোন কোন শ্বেতাংগ আই.সি.এস, সেক্রেটারির পরামর্শে লাট সাহেব সার নাযিমুদ্দিনকে ভরসা দিয়াছিলেন, হক মন্ত্রিসভার অবসানে লীগ দলকেই মন্ত্রিসভা গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হইবে। লাট সাহেবের কাজ-কর্মেও তা বোঝা গেল। হক সাহেব প্রগেসিভ কোয়েলিশন পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়া বিবৃতি ও লাট সাহেবকে তা জানাইয়া দেওয়া সত্ত্বেও এবং এই দলের সুস্পষ্ট মেজরিটি থাকা সত্ত্বেও লাট সাহেব হক সাহেবকে নয়া মন্ত্রিসভা গঠনের দায়িত্ব দিতে গড়িমসি করিতে থাকিলেন। মুসলিম মেম্বরদের অধিকাংশের রাজনৈতিক চরিত্র সম্বন্ধে সকলের তখন এই ধারণা হইয়া গিয়াছে যে, যে-দল মন্ত্রিসভা গঠন করিবে, শেষ পর্যন্ত তাঁদের বেশির ভাগ সেই দলেই যোগ দিবেন। অতএব আপাতঃদৃষ্টিতে মুসলিম লীগ পার্টিতে মুসলমান মেম্বরদের মেজরিটি না থাকা সত্ত্বেও এই পার্টিকে মন্ত্রিসভা গঠনে আহবান করা হইবে, এমন গুজবে কলিকাতা শহর, বিশেষতঃ সংবাদপত্র আফিস, প্রতিমুহূর্তে মুখরিত হইয়া উঠিতে লাগিল। আমাদের বুকও আশংকায় দূর-দূর করিতে থাকিল।
