সুভাষ বাবুর অন্তধানে আমি সত্যই খুব দুঃখিত হইয়াছিলাম। কারণ এর পরে হিন্দু নেতৃত্বের অখণ্ড ভারতীয় মনোবৃত্তির বন্যা রোধ করিবার মত শক্তিশালী নেতা হি-বাংলায় আর কেউ থাকিলেন না। একথা শরৎ বাবুর কাছেও আমি বলিয়াছি। তিনি আমার সাথে একমত ছিলেন। কিন্তু তার সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠ হইয়া আমার আশা হইয়াছিল সুভাষ বাবুর রাষ্ট্র-দর্শনের নিশান বহন করিতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আমার বিশ্বসও হইয়াছিল। নিষ্ঠাবান সাত্বিক হিন্দু হইয়াও যে রাজনীতিতে উদার। অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রী হওয়া যায় শরৎ বাবু ছিলেন তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ। তাঁর চরিত্রের এই দিকটা আমাকে এত মুগ্ধ করিয়াছিল যে সুভাষ বাবুর অন্তর্ধানের পর শরৎ বাবুর উডবর্ণ পার্কের বাড়ি আমার প্রায় প্রাত্যহিক আড্ডায় পরিণত হইয়াছিল।
সুভাষ বাবুর উত্তরাধিকারী হিসাবে পরবর্তীকালে শরৎ বাবুই নিখিল ভারতীয় কংগ্রেস-নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বাঙালীর স্বাতন্ত্রের সংগ্রাম চালাইয়া যান জীবনের শেষ পর্যন্ত। ১৯৪৭ সালে শহীদ সাহেব ও আবুল হাশিম সাহেবের সাথে মিলিয়া তিনি যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার পরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাতেও শরৎ বাবুর এই বাংগালীর স্বাতন্ত্রের মনোভাব সুস্পষ্ট ছিল। ১৯৪৮ সালে দক্ষিণ কলিকাতা নির্বাচক মণ্ডলীতে কংগ্রেসের সকল শক্তির বিরুদ্ধে একা লড়াই করিয়া তিনি কংগ্রেসকে পরাজিত করিয়াছিলেন। এসব ব্যাপারেই আমার প্রাণ ছিল শরৎ বাবুর সাথে। হিন্দু ভোটারদের উপর কোনও প্রভাব না থাকা সত্ত্বেও আমার সম্পাদিত ‘ইত্তেহাদ’ পুরাপুরি শরৎ বাবুর সমর্থক ছিল।
৫. কমরেড এম, এন, রায়ের প্রভাব
জিন্না-সুভাষ মোলকাত ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও তার একটা ছাপ আমার মনে স্থায়ী হইয়াছিল। আমি নয়া ধারায় চিন্তা করিতে শুরু করি। এই চিন্তায় কমরেড এম এন রায়ের সাহচর্য আমাকে অনেক দূর আগাইয়া নিয়া যায়। ১৯৩৮ সালে দিল্পী কংগ্রেস কাউন্সিল অধিবেশন উপলক্ষে কমরেড রায়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। তার আগে কমরেড রায়ের প্রতি আমার ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিল নিতান্তু রোমান্টিক। বিশ্ব কমিউনিয়মের অন্যতম নেতা স্ট্যালিনের সহকর্মী হিসাবে তিনি ছিলেন আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে এক মনীষী। তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর আমার ভক্তির রোমান্টিক দিকটার অবসান হইলেও শ্রদ্ধা-ভক্তি এতটুকু কমে নাই। বরঞ্চ বাড়িয়াছে। বাস্তব রাজনীতিতে অবশ্য তাঁর মতবাদ ও উপদেশ নির্ভরযোগ্য মনে করিতাম না। সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যাপারে তাঁর মত ধৈর্য ছিল না। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় প্রথম দিকে তিনি আমাকে কৃষক-প্রজা পার্টি ভাংগিয়া সমস্ত কর্মীদের লইয়া সদলবলে কংগ্রেসে যোগ দিবার পরামর্শ দেন। তাঁর উপদেশ অগ্রায় করার পর তিনি নিজেই কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং আমরা কৃষক-প্রজা কর্মীর কংগ্রেসে যাওয়ায় আমাদের প্রশংসা করেন। কলিকাতার মুসলিম ছাত্রদের উদ্যোগে আহত মুসলিম ইনষ্টিটিউটের এক সভায় তিনি কংগ্রেসকে ‘নিমজ্জমান নৌকা বলেন এবং উহা হইতে সাঁতরাইয়া পার হওয়ার জন্য দেশ-প্রেমিকদের অনুরোধ করেন। কিন্তু আদর্শগত দিক হইতে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্বন্ধে তাঁর বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত আমাকে বিস্মিত ও মোহিত করিয়াছিল। কংগ্রেস-মুসলিম লীগ-কমিউনিস্ট পার্টি কৃষক এজা-পার্টির প্রভাবে ভারতের সকল গণ-প্রতিষ্ঠান যখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বলিতেছিলেন, তখন কমরেড রায় একাই ফ্যাসি-নাযিবাদকে মানবতার শত্রু ও সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে বড় দুশমন প্রমাণ করেন এবং এই যুদ্ধকে গণযুদ্ধ বা পিপলস ওয়ার’ আখ্যা দেন। বিশ্বের একমাত্র সমাজবাদী রাষ্ট্র রাশিয়া হিটলারের সমর্থন করায় আমরা কমরেড রায়ের কথায় তখন বিশ্বাস করি নাই। তাঁর উপদেশ মানি নাই। পরে ১৯৪১ সালের জুন মাসে যখন হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করেন এবং রাশিয়া জার্মানির বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়ায়, তখন কমরেড রায়ের কথার সত্যতায় এবং তাঁর জ্ঞানের গভীরতায় আমার শ্রদ্ধা আকাশচুনী হইয়া গেল।
১৯৩৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষক-প্রজা সমিতির সেক্রেটারি ও আইন পরিষদে কৃষক-প্রজা পার্টির লীডার বন্ধুবর শামসুদ্দিন পদত্যাগ করার পর হক মন্ত্রিসভার সহিত কৃষক-প্রজা সমিতির সম্পর্ক আগের চেয়েও তিক্ত হইয়া পড়িল। ফলে আমার পক্ষে হক সাহেবের সহিত ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও যাতায়াত রক্ষা করাও আর সম্ভব রহিল না।
১৯৩৯ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর ইউরোপে মহাযুদ্ধ বাধিয়া গেল। ভারতবাসীর বিনা-অনুমতিতে ভারতবর্ষকে ইউরোপীয় যুদ্ধে জড়ানোর প্রতিবাদে সাতটি কংগ্রেসী প্রদেশ হইতেই কংগ্রেসী মন্ত্রীসভারা ২২শে ডিসেম্বর পদত্যাগ করিলেন। ইতিপূর্বে ১৯৩৮ সালে মুসলিম লীগ পীরপুর রিপোর্ট নামে একটি রিপোর্টে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা সমূহের মুসলমানদের উপর যুলুমের ফিরিস্তি প্রচার করিয়াছিল। কংগ্রেসী মন্ত্রীদের পদত্যাগকে মুসলিম লীগ কংগ্রেসী যুলুম হইতে মুসলমানদের নাজাত ঘোষণা করিয়া ২৩শে ডিসেম্বর সারা ভারতে ‘নাজাত দিবস’ পালন করে। এতে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে এবং হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক আরও তিক্ত হইয়া পড়ে। এমন সাম্প্রদায়িক তিক্ততার মধ্যে কৃষক-প্রজা সমিতির অসাম্প্রদায়িক অর্থনীতিক রাজনীতি পরিচালন মুসলমান জনসাধারণ্যে খুবই কঠিন হইয়া পড়িল। তার উপর ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায় এবং স্বয়ং হক সাহেবই সেই প্রস্তাব উত্থাপন ও তার সমর্থনে মর্মস্পর্শী বক্তৃতা করায় বাংলার মুসলমানদের মধ্যেও পাকিস্তান দাবির ও মুসলিম লীগের শক্তি শতগুণে বাড়িয়া গেল। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সভা-সমিতি ও প্রচার-প্রচারণা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়সাধ্য হইয়া পড়ায় কৃষক-প্রজা সমিতির মত গরিব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সভা সম্মিলন করা অসম্ভব হইয়া পড়িল। ফলে কৃষক-প্রজা সমিতির দাবিদাওয়া এবং হক মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা কেবল মাত্র সমিতির দৈনিক মুখপত্র ‘কৃষকে’র পৃষ্ঠাতেই সীমাবদ্ধ হইল।
