৬. দৈনিক কৃষক
‘কৃষকে’র সম্পাদক গ্রহণ করিয়াছিলাম আমি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। সুতরাং ‘কৃষকের কথাটাও আমার দেখা-রাজনীতির এলাকায় পড়ে। কাজেই এ সম্বন্ধে দুচার কথা বলা এখানে অবান্তর হইবে না।
সমিতির সেক্রেটারি শামসুদ্দিন সাহেবের মন্ত্রিত্বের আমলেই দৈনিক কৃষক বাহির করা স্থির হয়। আমারই উপর উহার সম্পাদকতার ভার চাপান হয়। কোম্পানি রেজিস্টারি করা হয়। মৌঃ শামসুদ্দিন সাহেব, মৌঃ সৈয়দ নওশের আলি, অধ্যাপক হুমায়ুন কবির, নবাবযাদা সৈয়দ হাসান আলী, খান বাহাদুর মোহাম্মদ জান ও ডাঃ আর, আহমদ সাহেবান লইয়া বোর্ড-অব-ডিরেক্টর গঠিত হয়। অধ্যাপক হুমায়ুন কবির হন ম্যানেজিং ডিরেক্টর। ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরে দৈনিক ‘কৃষক’ বাহির হয়। কিন্তু কাগযের বয়স দুইমাস পুরা হইবার আগেই মৌঃ শামসুদ্দিন মন্ত্রিসভা হইতে পদত্যাগ করেন। ফলে মন্ত্রিত্বের জোরে বিজ্ঞাপনাদি জোগাড় করিয়া কাগয চালাইবার আশা দূর হইল। অধ্যাপক কবির অতি কষ্টে বছর খানেক কাগয় চালাইয়া খান বাহাদুর মোহাম্মদ জানের কাঁধে এ ভার চাপাইলেন। খান বাহাদুর দাতা-দয়া কংগ্রেস সমর্থক ব্যবসায়ী পশ্চিমা লোক ছিলেন। বাংলার কৃষক-প্রজার সমস্যা তিনি বুঝিতেন না। কাজেই কংগ্রেসী মুসলমান হিসাবে যতটা পারেন ‘কৃষক’কে সাহায্য করিতেন। তিনিও বেশিদিন কৃষকের বিপুল ঘাটতি সইতে পারিলেন না। ডিরেক্টরদের সমবেত চেষ্টায় বিশেষতঃ অধ্যাপক কবিরের মধ্যস্থতায় কলিকাতার অন্যতম বিখ্যাত ব্যাংকার। শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী মিঃ হেমেন্দ্র নাথ দত্ত ‘কৃষকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর হইতে রাজি হইলেন। তিনি ময়মনসিংহ জেলার অধিবাসী এবং অধ্যাপক কবিরের বিশেষ বন্ধু। কাজেই তিনি আমাদের দ্বারা অভিনন্দিত হইলেন। তাঁর পরিচালনায় ‘কৃষক’ বেশ সচ্ছন্দে চলিতে লাগিল। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে ১৯৪১ সালের জুলাই মাসে কৃষক ছাড়িয়া দিতে আমি বাধ্য হইলাম। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বুঝার সুবিধার জন্য সে কারণটাও এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করিতেছি।
এই সময় হক মন্ত্রিসভা বেংগল সেকেণ্ডারি এডুকেশন বিল আইন পরিষদে পেশ করেন। এই বিলের মর্ম এই যে মাধ্যমিক শিক্ষা (ম্যাট্রিক পরীক্ষা) কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত হইতে নিয়া সরকার গঠিত একটি মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের হাতে দেওয়া হইবে। উদ্দেশ্যটি মহৎ এবং তৎকালে সভ্য-জগতের সর্বত্র শিক্ষা-ব্যবস্থায় এই পন্থাই চালু ছিল। স্বাধীনতা লাভের পরে ভারতে ও পাকিস্তানে এই ব্যবস্থাই চালু হইয়াছে। বর্তমানে পশ্চিম বাংলাতেও তথাকার মাধ্যমিক শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে নাই। একটি মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের হাতেই আছে।
কিন্তু তৎকালে দল-মতনির্বিশেষে সমস্ত হিন্দু হক মন্ত্রিসভার এই বিলের প্রতিবাদ করেন। এমন কি, বিল আসিতেছে শুনিয়াই প্রায় বছর দিন ধরিয়া বিভিন্ন সংবাদপত্রে এই বিলের আগাম প্রতিবাদ চলিতেছে। কয়েক মাস আগে (২৫শে জানুয়ারি) কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করা হইয়াছে এবং সরকারী সাহায্য ব্যতিরেকেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার হুমকি দিয়াছে।
এমন সময়ে এই বিলের সমর্থনে কৃষকে আমি পরপর কয়েকটা সম্পাদকীয় লিখি। মিঃ দত্তের নযরে পড়ে তা। তিনি আমার সাথে দেখা করিয়া প্রতিবাদ করেন। বলেন : আপনি একটা সাম্প্রদায়িক বিল সমর্থন করিয়া ‘কৃষকের অসাম্প্রদায়িক নীতির’ খেলাফ কাজ করিয়াছেন। আমি জবাবে তাঁকে বুঝাইবার চেষ্টা করি : ‘বিলটা সাম্প্রদায়িক নয়।‘ হিন্দুদের প্রতিবাদটাই সাম্প্রদায়িক সম্পাদকীয় গুলিতে উল্লেখিত বিভিন্ন সভ্য দেশের শিক্ষা-ব্যবস্থার নযিরের দিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করি। কিন্তু তিনি মানেন না। ঐ বিলের সমর্থনে আর লেখা হইলে তিনি ম্যানেজিং ডিরেক্টর থাকিবেন না বলিয়া আমাকে হুশিয়ার করিয়া দিলেন। অন্যান্য ডিরেক্টরদেরও জানাইলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তাঁরা সবাই আমার সমর্থক ছিলেন। তাঁরা আমাকে কিছু বলিলেন না। আমি এ বিষয়ে আরও দু’একটা সম্পাদকীয় লিখিলাম।
ফলে এ দাঁড়াইল যে আমি নীতি না বদলাইলে অথবা ‘কৃষক’ ত্যাগ না করিলে মিঃ দত্ত আর কৃষক’ চালাইবেন না বলিয়া দিলেন। মিঃ দত্ত সরিয়া পড়িলে কৃষক বন্ধ হইবে, এটা নিশ্চিত। অতএব ‘কৃষক বাঁচাইয়া রাখিবার উদ্দেশ্যে আমিই কৃষক ত্যাগ করিলাম। অন্যান্য ডিরেক্টররাও সকলেই পদত্যাগ করিলেন। স্টাফেরই একজন মুসলমানের নাম সম্পাদকরূপে ছাপিয়া ‘কৃষক’ চলিতে লাগিল।
কিন্তু আমি আর্থিক বিপদে পড়িলাম। ময়মনসিংহে ওকালতি গুটাইয়া বাসা ছাড়িয়া টেবিল-চেয়ার বিলি করিয়া সপরিবারে ময়মনসিংহ ছাড়িয়া ছিলাম। যাকে বলে ‘নদী পার হইয়া একেবারে নৌকা পোড়ানো’ আর কি?
এমন অবস্থায় বিপদের বন্ধুরূপে দেখা দিলেন আমার সহোদর-তুল্য ছোট ভাই খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলাম। তিনি তখন বাংলা সরকারের সহকারী জুডিশিয়াল সেক্রেটারি। তার পরামর্শে আলিপুর কোর্টে এবং কলিকাতা স্মলক কোর্টে প্র্যাকটিস করা সাব্যস্ত করিলাম। তৎকালে উকিল (প্লিডারদের ওকালতি ছাড়া অন্য কাজ করিতে হাইকোর্টে দরখাস্ত দিয়া ওকালতি সসপেণ্ড করিতে হইত। আমি কৃষকের সম্পাদক নিবার সময় তাই করিয়াছিলাম। এবার পুনরায় ওকালতি শুরু করিবার দরখাস্ত দিয়া তার জবাবের অপেক্ষা করিতে লাগিলাম।
