আন্দোলনকে জাতীয় রূপ দিবার জন্য সুভাষ বাবু ৩রা জুলাইকে (১৯৪০) ‘সিরাজ-স্মৃতি দিবস’ রূপে দেশব্যাপী পালন করা স্থির করিলেন। ১লা জুলাই আলবার্ট হলে জন-সভা হইল। লাল মিয়া এতে সভাপতিত্ব করিলেন। ওয়াসেক ও নূরুল হুদা এতে তেজঃদৃপ্ত বক্তৃতা করিলেন। সুভাষ বাবু ঐ সভায় ৩রা জুলাই দেশব্যাপী ‘সিরাজ-স্মৃতি দিবস’ পালনের আবেদন করিলেন। আরও ঘোষণা করিলেন যে ঐ দিন তিনি স্বয়ং কুড়াল,হাতে হলওয়েল মনুমেন্ট ভাংগার সত্যাগ্রহীদের নেতৃত্ব করিবেন। সুভাষ বাবুর এই ঘোষণার জবাবে প্রধানমন্ত্রী হক সাহেব ঐদিনের আইন পরিষদের সান্ধ্য অধিবেশনে ঘোষণা করেন যে বাংলা সরকার শীঘ্রই হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ করিবেন। অতএব সত্যাগ্রহ বন্ধ হওয়া উচিৎ। পরদিন ২রা জুলাই সংবাদপত্রে এক বিবৃতি দিয়া সুভাষ বাবু বলেন যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অস্পষ্ট। অতএব এ ঘোষণা সত্ত্বেও সত্যাগ্রহ অব্যাহত থাকিবে এবং তিনি পরদিন (৩রা জুলাই) কুড়াল হতে সত্যাগ্রহে নেতৃত্ব করিবেন। কিন্তু ২রা জুলাই রাত্রিতেই সুভাষ বাবু ভারতরক্ষা আইনে গ্রেফতার হইয়া প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দী হইলেন।
সুভাষ বাবুর গ্রেফতারেও আন্দোলন দমিল না। মেয়র আবদুর রহমান সিদ্দিকী সুভাষ বাবুর গ্রেফতারের প্রতিবাদে বিবৃতি দিলেন। কলিকাতা কর্পোরেশন মুলতবী হইয়া গেল। ইসলামিয়া কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের ছাত্ররা মিছিল করিতে লাগিল। সত্যাগ্রহ পূর্ণোদ্যমে চলিল। প্রধানমন্ত্রী হক সাহেব ৮ই জুলাই আবার ঘোষণা করিলেন যে বাংলা সরকার হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের সিদ্ধান্তে অটল আছেন। ইউরোপীয় মেম্বাররা হক মন্ত্রিসভাকে সমর্থন না করিলেও সরকার তাঁদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করিবেন না। এর আগের দিন ইউরোপীয় দলের নেতা মিঃ পি. জে. গ্রিফিথ সত্যসত্যই ঘোষণা করিয়াছিলেন যে হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ করিলে ইউরোপীয় দল মন্ত্রিসভার প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করিবে।
কিন্তু সপ্তাহ কাল চলিয়া গেল সরকার মনুমেন্ট অপসারণ করিলেন না। কাজেই সত্যাগ্রহ খুব জোরেই চলিতে থাকিল। ওদিকে সরকার ১৭ই জুলাই হইতে সত্যাগ্রহ সম্পর্কিত সমস্ত খবরের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিলেন। প্রচারের অভাবে সত্যাগ্রহ স্তিমিত হইয়া পড়িল। মিঃ ওয়াসেক ও মিঃ নূরুল হুদা প্রভৃতি ছাত্রনেতা তখন মিছিল বাহির করিলেন। এই মিছিল উপলক্ষে ইসলামিয়া কলেজে পুলিশ-মিলিটারি হামলা হইল। গুৰ্গা সৈন্যরা ছাত্রদের বেদম মারপিট করিয়াছে বলিয়া খবর রটিল। ছাত্রনেতা মিঃ ওয়াসেক ও মিঃ. আনওয়ার হোসেন আহত হইয়া হাসপাতালে গেলেন। মিঃ নূরুল হুদার নেতৃত্বে বহু ছাত্র প্রধানমন্ত্রী হক সাহেবের ঝাউতলার বাড়ি ঘেরাও করিল। হক সাহেব তাঁর স্বাভাবিক মিষ্টি কথায় ভরশা দিয়া ছাত্রদের ফিরাইয়া দিলেন।
সুভাষ বাবুর অবর্তমানে হলওয়েলে মনুমেন্ট সত্যাগ্রহ আস্তে-আস্তে ধিমাইয়া পড়িল। ছাত্র-নেতৃবৃন্দ বুঝিলেন সুভাষ বাবুকে খালাস করাই সত্যাগ্রহ তাজা করিবার একমাত্র উপায়। তখন ছাত্র-তরুণরা ইসলামিয়া কলেজ পুলিশী যুলুমের তদন্তের এবং সুভাষ বাবুর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু করিল। মুসলিম লীগ নেতারা ও কর্পোরেশনের মেয়র খবরের কাগযে বিবৃতি দিয়া সুভাষ বাবুর মুক্তি দাবি করিলেন। হক সাহেব ইসলামিয়া কলেজে পুলিশী হামলার তদন্তের জন্য হাই কোর্টের বিচারপতি মিঃ তরিক আমির আলির পরিচালনায় একটি তদন্ত কমিশন গঠন করিয়া এবং সুভাষ বাবুর মুক্তির আশ্বাস দিয়া ছাত্রদেরে শান্ত করিলেন। কিন্তু সুভাষ বাবু ভারতরক্ষা আইনে গ্রেফতার হওয়ায় প্রাদেশিক সরকারের এতে কোন হাত ছিল না। তাই ভারত সরকারের সাথে দরবার করিয়া অবশেষে ডিসেম্বর মাসে সুভাষ বাবুকে মুক্তি দিলেন। কিন্তু সুভাষ বাবু স্বগৃহে অন্তরীণ থাকিলেন। তাঁর উপর একটি ফৌজদারী মামলাও ঝুলাইয়া রাখা হইল।
অন্তরীণ থাকিলেও সুভাষ বাবুর সাথে দেখা-সাক্ষাতের খুব কড়াকড়ি ছিল না। মুক্তির দুই-তিন-দিন পরেই তাঁর সাথে দেখা করিলাম। দেখিয়া তাজ্জব হইলাম। মনে হইল সপ্তাহ কাল শেভ করেন নাই। সুভাষ বাবুর দাড়ি-গোঁফ ও তাঁর সুন্দর মুখ শীর উপযোগী চাপ দাড়ি শেভ না করার কারণ জিগ্গাসা করিলে তাঁর স্বাভাবিক মধুর হাসি হাসিয়া বলিলেন : শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের সাথেই পলিটিকস্ করব যখন ঠিক করেছি, তখন তাদের একজন হতে দোষ কি? ঐ একবারের বেশি তার দেখা পাই নাই। শুনিলাম তিনি মৌন-ব্রত গ্রহণ করিয়াছেন।
এটা ছিল বোধ হয় ১৯৪১ সালের জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ। পরে জানা গিয়াছিল ১৬ই জানুয়ারি হইতে তিনি নিজেও ঘর হইতে বাহির হইতেন না। কাউকে তাঁর ঘরে ঢুকিতেও দেওয়া হইত না। নির্ধারিত সময়ে তাঁর খানা দরজার সামনে রাখিয়া কপাটে টুকা দিয়া ঠাকুর সরিয়া আসিত। সুভাষ বাবু তীর সুবিধা মত খাবার ভিতরে নিতেন এবং খাওয়া শেষে বুটা বাসনপত্র দরজার বাহিরে নির্ধারিত স্থানে রাখিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিনে। এইভাবে কিছুকাল চলার পর ২৫শে জানুয়ারি দেখা গেল ২৪শে তারিখের-দেওয়া খাবার অছোওয়া অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। ঠাকুরের মূখে এটা জানিয়া বাড়ির সবাই সুষ বাবুর ঘরের সামনে সমবেত হইলেন। দরজা খুলিয়া দেখিলেন ঘর শূন্য। মুহূর্তে সারা কলিকাতা ফাটিয়া পড়িল। যথাসময়ে দেশবাসী জানিতে পারিল তিনি ছদ্মবেশে দেশ ত্যাগ করিয়াছেন।
