সুভাষ বাবু যতই বলুন দেওয়ার মত খবর নাই। আমি কিন্তু আমার আগ্রহ দমাইতে পারিলাম না। তৎক্ষণাৎ ছুটিয়া গেলাম। মুখ-ভাবে কোন নৈরাশ্য ধরিতে পারিলাম না। আগের মতই হাসি মুখ। ও সুন্দর মুখে হাসি ছাড়া আর কিছু বড় একটা দেখি নাই তা
আমাকে চা-মিঠাই খাইতে দিয়া তিনি তাঁর জিন্না-মোলাকাতের বিস্তারিত বিবরণ দিলেন। জিন্না সাহেব তাঁর সাথে অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ ব্যবহার করিয়াছেন। লাহোর প্রস্তাবের যে ব্যাখ্যা সুতাষ বাবু করিয়াছেন জিন্না সাহেবের ধারণার সাথে তা হুবহু মিলিয়া গিয়াছে। বস্তুতঃ সুভাষ বাবু জিন্না সাহেবের ধারণা মত লাহোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যা করিতে পারায় জিন্না সাহেব বিস্মিত হইয়াছিলেন। এইখানে সুভাষ বাবু হাসিয়া বলিলেন : ‘জিন্না সাহেব পুনঃপুনঃ জিগ্গাস করা সত্ত্বেও আমি তাঁকে বলেছি এটা আমার নিজেরই ব্যাখ্যা; অন্য কেউ আমাকে এ ব্যাখ্যা দেননি। আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না। নিজের বাহাদুরির জন্য একাজ করিনি। অপরের ধার-করা বুদ্ধি নিয়ে তাঁর কাছে গিয়েছি, এটা স্বীকার করলে জিন্ন সাহেবের কাছে আমার দাম কমে যেত না? কি বলেন আপনি?’
আমি স্বীকার করিলাম। বলিলাম, তিনি ঠিক কাজই করিয়াছেন। তারপর সুভাষ বাবু বলিলেন, লাহোর প্রস্তাবের এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই হিন্দু-মুসলিম সমস্যার সমাধান করিতে জিন্না সাহেব খুবই আগ্রহী। কিন্তু তাঁর দৃঢ় মত এই যে আপোস কোনও ব্যক্তির মধ্যে হইবে না। সে ব্যক্তিরা যতই প্রভাবশালী হউন। আপোস হইতে হইবে কংগ্রেস ও লীগ এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে। জিন্না সাহেব সুভাষ বাবুকে স্পষ্টই বছর। বলিয়াছেন, সুভাষ বাবু যতই জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী নেতা হউন, কংগ্রেসকে সাথে আনিতে না পারিলে জিন্না সাহেব তাঁর সাথে জাপোস করিতে পারেন না। এমন কি তাঁর ফরওয়ার্ড ব্লকের সাথেও না। তিনি সুভাষ বাবুকে খোলাখুলি উপদেশ দিলেন, সুভাষ বাবু কংগ্রেস ছাড়িয়া বুদ্ধির কাজ করেন নাই। তাঁর আবার কংগ্রেসে ফিরিয়া যাওয়া উচিৎ। এই ব্যাপারে জিন্না সাহেবের মধ্যে এতটা ব্যাকুল আগ্রহ ফুটিয়া উঠিয়াছিল যে শেষ বিদায়ের দিন জিন্ন সাহেব বাড়ির গেট পর্যন্ত সুভাষ বাবুকে আগাইয়া দিয়া এই শেষ কথাটা বলিয়াছিলেন : ‘কলিকাতা ফিরার আগে তুমি এলাহাবাদে জওয়াহের লালের কাছে যাও। তাঁকে তোমার মতে আন। তারপর তোমাদের যুক্ত শক্তিতে তোমার ব্যাখ্যা মত লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে কংগ্রেস-লীগে যেদিন আপোস করিতে পারিবে সেটা হইবে ভারতের জন্য ‘লাল হরফের দিন।‘ ‘প্রিয় সুভাষ, আমায় বিশ্বাস কর, আমি পরম আগ্রহে সেদিনের অপেক্ষা করিতে থাকিলাম।‘
জিন্না সাহেবের ইংরাজী কথাগুলি হুবহু উদ্ধৃত করিবার সময় সুভাষ বাবুর মুখে যে আন্তরিকতা ফাটিয়া পড়িতেছিল, তাঁর মধ্যে জিন্না সাহেবের আন্তরিকতাও প্রতিবিম্বিত হইয়াছিল। উপসংহারে সুভাষ বাবু বলিলেন : ‘জওয়াহের লাল আমার মত গ্রহণ করবেন এ বিশ্বাস আমার আদৌ ছিল না। তবু শুধু জিন্ন সাহেবের অনুরোধ রক্ষার্থে আমি তাঁর কাছে গেলাম। একদিন এক রাত উভয়ে মত বিনিময় করলাম। আমি দেখে বিস্মিত ও আনন্দিত হলাম যে জওয়াহের লাল লাহোর প্রস্তাবের আমার ব্যাখ্যা মেনে নিলেন এবং তাতে কংগ্রেস-লীগে আপোস হতে পারে তাও স্বীকার করলেন। কিন্তু গান্ধীজীর মতের বিরুদ্ধে কোনও কাজ করতে তিনি রাজি নন। তাই নিরাশ হয়ে ফিরে এলাম।’
প্রফুল্লতা ও মনোবল নিয়াই কথা শুরু করিয়াছিলেন। কিন্তু স্পষ্ট দেখিলাম, শেষ পর্যন্ত নৈরাশ্য গোপন করিবার চেষ্টায় ব্যর্থ হইলেন। অবশেষে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন : ‘নিখিল ভারতীয় ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলিম মিলনবোধ হয় আর সম্ভব হল না। বাংলা-ভিত্তিতে এ আপোস করার চেষ্টা করা যায় নাকি?’
৪. সুভাষ বাবুর অন্তর্ধান
এরপর বাংলা ভিত্তিতে মুসলমানদের সাথে কাজ করিবার বড় রকমের একটা চেষ্টা তিনি সত্য-সত্যই করিয়াছিলেন। সেটা সিরাজুদ্দৌলাকে বাংগালী জাতীয়তার প্রতীকরূপে জীবন্ত করা এবং তার প্রথম পদক্ষেপরূপে হলওয়েল মনুমেন্ট ভাংগার অভিযান চালান। আমার বিবেচনায় এইবার সুভাষ বাবু দেশবন্ধু ও আচার্য রায়ের রাজনীতিক দর্শনে পুনরায় বিশ্বাসী হন।
সিরাজুদ্দৌলার প্রতি আমার মমত্ববোধ ছিল অনেক দিনের। ছেলেবেলা ছিল এটা বাংলার মুসলিম শাসনের শেষ প্রতীক হিসাবে। পরবর্তীকালে কংগ্রেস কর্মী-হিসাবে বাংগালী জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হওয়ার পর সিরাজুদ্দৌলাকে বাংগালী জাতীয়তার প্রতীকরূপে গ্রহণ করার জন্য অনেক কংগ্রেসী সহকর্মীকে ক্যানভাস করিয়াছি। বাংলার নাট্যগুরু গিরিশ ঘোষ ও খ্যাতনামা ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রের সিরাজুদ্দৌলাকে এই হিসাবেই বিচার করিয়াছেন বলিয়াও বহু মনগড়া যুক্তি খাড়া করিয়াছি। কিন্তু হিন্দু কংগ্রেসকর্মীদের কেউ এদিকে মন দেন নাই। কাজেই সূতাষ বাবুর মত জনপ্রিয় তরুণ হিন্দু নেতা এই মতবাদের উদ্যোক্তা হওয়ায় আমার আনন্দ আর ধরে না। ‘দৈনিক কৃষকে’র সম্পাদকীয়তে এই মতবাদের সমর্থনে প্রচুর যুক্তি দিতে লাগিলাম।
সুভাষ বাবু হলওয়েল মনুমেন্ট ভাংগার আন্দোলনে তাঁর পরিচালিত প্রাদেশিক কংগ্রেস ও ফরওয়ার্ড ব্লকের কমিগণসহ যোগ দিলেন। মুসলিম ছাত্র সমাজের তৎকালীন জনপ্রিয় নেতা মিঃ আবদুল ওয়াসেক, মিঃ নূরুল হুদা ও মিঃ আনওয়ার হোসেনের নেতৃত্বে এই আন্দোলন আগেই শুরু হইয়াছিল। সুভাষ বাবু এতে যোগ দেওয়ায় সত্যাগ্রহের আকারে এই আন্দোলন খুব জোরদার হইল। জনপ্রিয় তরুণ মুসলিম নেতা চৌধুরী মোওয়ায্যম হোসেন (লাল মিয়া) অছাত্র মুসলিম তরুণদেরও এ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করিয়া তুলিলেন। প্রতি দিন দলে-দলে সত্যাগ্রহী গ্রেফতার হইতে লাগিল। আমার ‘কৃষক’–আফিস ৫নং ম্যাংগো লেন ডালহৌসি স্কোয়ারের খুব কাছে। সময় পাইলেই সত্যাগ্রহ দেখার জন্য হাজার হাজার দর্শকের শামিল হইতাম। সম্পাদকতার দায়িত্ব না থাকিলে হয়ত আন্দোলনে জড়াইয়াই পড়িতাম।
