আমি বিরক্ত ও নিরাশ হইয়া এ ব্যাপারে খোঁজ করা ছাড়িয়া দিলাম। ভাবিলাম সুভাষ বাবুর নিজেরই মনের পরিবর্তন হইয়াছে। এমন সময় তিনি নিজেই একদিন ফোন করিয়া বলিলেন, তিনি জিন্ন সাহেবের নিকট পত্র লিখিয়াছেন, এবং নিশ্চিত ডেলিভারির আশায় ডাকে না দিয়া মেয়র সিদ্দিকীর হাতে হাতে দিয়াছেন। আমি সেইদিনই সকালের কাগযে পড়িয়াছিলাম, কলিকাতা কর্পোরেশনের মেয়র মিঃ আবদুর রহমান সিদ্দিকী বোম্বাই কর্পোরেশনের কর্তৃপক্ষের সংগে কি বিষয়ে আলোচনার জন্য বোম্বাই রওয়ানা হইলেন।
আমি নিরুৎসাহ হইলাম সে কথা সুভাষ বাবুকে বলিলাম। ব্যাপারটা ভণ্ডুল হইয়া গেল। কারণ সিদ্দিকী জিন্ন সাহেবের সূন্যরে নাই। সুভাষ বাবুও একটু আতংকিত হইলেন। আগে জানিলে তিনি এটা করিতেন না। কিন্তু এক্ষণে আর তার কোনও প্রতিকার নাই। দেখা যাক কি হয়। আমিও তার সাথে একমত হইলাম।
পাকিস্তান আন্দোলন কাগযে পড়িলাম, সিদ্দিকী সাহেবের জিন্ন সাহেবের সহিত মোলাকাত করিলেন। পরে কলিকাতায় ফিরিয়া আসিলেন। কিন্তু সুভাষ বাবু জিন্না সাহেবের কোনও পত্র পাইলেন না। আমার জিজ্ঞাসার উত্তরে সুভাষ বাবু জানাইলেন, মিঃ সিদ্দিকীর মতে তিনি যে-কোনও দিন মিঃ জিন্নার পত্র পাইবেন। কিন্তু পনর দিনের বেশি সময় চলিয়া গেল। সুভাষ বাবু জিন্ন সাহেবের পত্র পাইলেন না। ইতিমধ্যে জিন্না সাহেব যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সাহায্য-সহযোগিতা করা হইতে বিরত থাকার জন্য মুসলিম লীগারদের উপর নির্দেশ জারি করিলেন। সুভাষ বাবু এ কাজের জন্য জিন্না সাহেবকে কংগ্রেচুলেট করিলেন। সুভাষ বাবুই একরকফানে হাসিয়া বলিলাম : করিয়া খবরের কাগযে বিবৃতি দিলেন। আমি সুভাষ বাবুকে ফোনে হাসিয়া বলিলাম। ‘এবার জিন্না সাহেবের পত্র না আইসা পারে না।’ তিনিও হাসিলেন, বলিলেন : কিন্তু কোন মতলবে তাঁকে কংগ্রেচুলেট করিনি। তাঁর কাজটি সত্যই প্রশংসার যোগ্য।
এরও বোধ হয় সপ্তাহখানেক পরে সুভাষ বাবু জিন্না সাহেবের পত্র পান। আমাকে ডাকিয়া পাঠান। লাহোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যায় যা-যা আগে আলোচনা করিয়াছিলাম, তাই আবার দুহরাইলাম। তিনি এবার সম্পূর্ণ প্রস্তুত। নির্ধারিত দিনে সুভাষ বাবুকে সি-অফ। করিবার জন্য শত-শত কর্মীর সাথে আমিও হাওড়া স্টেশনে গেলাম। সুভাষ বাবু বোম্বাই যাইতেছেন সত্য, কিন্তু তাঁর আসল উদ্দেশ্যের কথা আমি ছাড়া বোধ হয় আর কেউ জানিত না। গাড়ি ছাড়িবার প্রাক্কালে আমি সুভাষ বাবুর কাছ ঘেষিয়া কানে কানে বলিলাম : ওয়ার্ধায় নাইমা বুড়ার দোওয়া নিয়া যাবেন।
সুভাষ বাবু চমকিয়া উঠিলেন, মুখ বিষণ করিলেন। বোধ হয় বিরক্ত হইলেন। বুড়া মানে মহাত্মাজী। তাঁর সাথে সুভাষ বাবুর সম্পর্ক ভাল নয়। মাত্র সম্প্রতি তাঁর সমর্থক বলিয়া কথিত লোকেরা মহাত্মাজীকে হাওড়া বলে ও লিলুয়া স্টেশনে অপমান করিয়াছে। আমি সুভাষ বাবুর মনের কথা বুঝিলাম। আমার শক্ত হাতে সুভাষ বাবুর নরম হাতটি চাপিয়া ধরিলাম। আমার অনুরোধ রাখবেন। শুধু এই কথাটি বলিলাম। তাঁর হাত ছাড়িলাম না। গাড়ি ছাড়িয়া দেয় দেখিয়া তিনি শুধু বলিলেন : ‘আচ্ছা ভেবে দেখব।’
তাই যথেষ্ট। আমি দৌড়িয়া লাফাইয়া ট্রেন হইতে নামিলাম। অন্যান্যের সাথে হাত নাড়িলাম। তিনিও জানালায় মুখ বাড়াইয়া হাত ও রুমাল নাড়িতে থাকিলেন। যতক্ষণ দেখা গেল চাহিয়া থাকিলাম। তিনি দৃষ্টির বাহিরে গেলে আমার মন বলিল : ভারতের ভবিষ্যৎ, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, এ সবেরই ক্ষীণ সূতাটি ঐ ট্রেনে ঝুলিতেছে।
পরদিন খবরের কাগয়ে পড়িলাম বোম্বাই যাওয়ার পথে সুভাষ বাবু ওয়াধায় নামিয়া মহাত্মাজীর সাথে দেখা করিয়াছেন। তাঁদের মধ্যে আধঘন্টা কথা হইয়াছে। তারপর পর-পর কয়েক দিনের কাগযে পড়িলাম। তিনি বোম্বাই পৌঁছিয়া জিন্না সাহেবের সাথে দেখা করিয়াছেন। কয়েক দিন কয়েকবার দেখা হইয়াছে। প্রতিবার দুই-তিন ঘন্টা আলাপ হইয়াছে। এক রাত্রে সুভাষ বাবু জিন্না সাহেবের বাড়িতে ডিনার খাইয়াছেন। ইতিমধ্যে কয়েক বার সুভাষ বাবু সর্দার প্যাটেল ও মিঃ ভুলাভাই দেশাইর সাথে দেখা করিয়াছেন।
সাফল্যের সম্ভাবনায় পুলকে আমার রোমাঞ্চ হইল। শীঘ্রই একটা ঘোষণা শুনিবার জন্য কান খাড়া করিয়া রহিলাম। এতদিনের হিন্দু-মুসলিম সমস্যা আজ চূড়ান্তরূপে মীমাংসা হইয়া যাইতেছে। ভারতের স্বাধীনতা ইংরাজ আর ঠেকাইয়া রাখিতে পারিল না। দেশবাসী জানে না এত বড় একটা শুভ ঘটনার মূলে রহিয়াছে আমার মত একজন নগণ্য ব্যক্তি। আল্লাহ কত ছোট বস্তু দিয়া কত বড় কাজ করাইতে পারেন। সত্যই তিনি কাঁদেরে-কুদরত। অপূর্ব তাঁর মহিমা!
সোনায় আবার সুহাগা! খবরের উপর যবর খবর! গান্ধীজী ও জিন্ন সাহেব উভয়কেই বড়লাট সিমলায় দাওয়াত করিয়াছেন। ব্যস, আর কি? কাম ফতে! সুভাষ বাবুর সাথে আলাপ হওয়ার পরই এ সব ঠিক হইয়াছে নিশ্চয়ই।
কয়দিন হাওয়ায় উড়িয়া বেড়াইলাম। একটা ঘোষণা প্রতিদিন আশা করিতে থাকিলাম। লটারির টিকিট কাটিয়া যেভাবে মানুষ পায়ের আঙ্গুলে দাঁড়াইয়া থাকে।
গান্ধীজী ও জিন্ন সাহেব সিমলা গেলেন। কোন ঘোষণা বাহির হইল না। সুভাষ বাবুও ফিরিয়া আসিলেন না।
আমি পরম আগ্রহে সুভাষ বাবুর প্রত্যাগমনের প্রতীক্ষা করিতে থাকিলাম। তিনি এত দেরি করিতেছেন কেন? তবে তিনিও গান্ধীজিন্নার সাথে সিমলায় গেলেন নাকি? শেষ খবরে পড়িয়াছিলাম জিন্না সাহেবের নিকট হইতে বিদায় লইয়া তিনি দিল্লীর পথে বোম্বাই ত্যাগ করিয়াছেন। কিন্তু তাঁর সিমলা যাওয়ার খবর বাহির হইল না। তার বদলে খবরের কাগযে পড়িলাম, সুভাষ বাবু এলাহাবাদে জওয়াহের লালের মেহমান হইয়াছে। তারপর বেশ কয়েকদিন আর কোনও খবর নাই। ইতিমধ্যে গান্ধীজী ও জিন্না সাহেব সিমলা হইতে ফিরিয়া আসিলেন, সে খবরও কাগযে পড়িলাম। হায়! ঘোষণাটা হইতে-হইতে হইল না বুঝি। আমি ব্যাকুলভাবে রোয সুভাষ বাবুর বাড়ি টেলিফোন করি। জবাব পাই, কোন খবর নাই। রোয টেলিফোন করায় তার বাড়ির কোনও লোক বোধ হয় ত্যক্ত হইয়াই বলিলেন: ‘আপনি খবরের কাগযের এডিটর। তিনি কোলকাতা ফিরলে আপনি আমাদের আগেই জানতে পারবেন।‘ সত্যই ত! লজ্জায় আর ফোন না করিয়া খবরের কাগযেই পড়িতে লাগিলাম। বেশ কিছুদিন কাটিয়া গেল। বাঞ্ছিত খবর আর বাহির হইল না। ইতিমধ্যে সুভাষ বাবু সম্পাদিত ‘ফরওয়ার্ড’ নামক ইংরাজী সাপ্তাহিকের যামিন তলব হইল। এই দিন জানিতে পারিলাম বেশ কয়েক দিন আগেই তিনি ফিরিয়া আসিয়াছেন। এবার সাহস করিয়া টেলিফোন করিলাম। ফোন ধরিলেন সুভাষ বাবু নিজে। স্বীকার করিলেন দুই দিন আগেই ফিরিয়াছেন। ইচ্ছা করিয়াই খবরের কাগযে খবরটা যাইতে দেন নাই। অন্ততঃ আমাকে খবরটা না-দেওয়ায় অভিমান করিলাম। তিনি হাসিয়া বলিলেন : ‘খবর দেবার মত কিছু নেই বলেই দেইনি। আচ্ছা আসুন, এক কাপ চা খেয়ে যান।‘
